রাজশাহী-৩
(পবা-মোহনপুর) আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর স্থানীয় এক স্কুলের
পক্ষ থেকে আয়েন উদ্দিনকে সোনার কোর্টপিন উপহার দেয়া হয়েছিল। তিনি ওই উপহার
ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘যে স্কুলের শিক্ষকরা বেতন পান না, সেই স্কুলের
শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আমি কোনো উপহার নিতে পারি না। আমি
রাজনীতিতে এসেছি জনগণের সেবা করার জন্য। সেবা নেয়ার জন্য নয়।’ সেই আয়েন এখন
চাল-চলনে পুরোটাই বদলে গেছেন। ধীরে ধীরে অনিয়ম আর দুর্নীতিতে জড়িয়ে এখন
তিনি অজনপ্রিয় এক নেতা। প্রভাব বিস্তারে তার রয়েছে এলাকাভিত্তিক
ক্যাডারবাহিনী। দলে মূল্যায়ন না করায় ত্যাগী নেতাকর্মীরা দূরে সরে গেছেন।
দলে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। স্থানীয় ও জেলা শাখার নেতারা
তার এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের
কাছে অভিযোগ করেছেন। শুক্রবার ও শনিবার রাজশাহীতে অবস্থানকালে দলের এই
শীর্ষ নেতার কাছে অভিযোগ করেন তারা।
দলের একাধিক নেতাকর্মী জানান, এমপি
আয়েনের দাপটে এখন অস্থির খোদ আওয়ামী লীগেরই নেতাকর্মীরা। কোনো অনুষ্ঠানে
তাকে প্রধান অতিথি করা না হলে তার ক্যাডাররা অনুষ্ঠান হতে দেয় না। হামলা
চালিয়ে তা পণ্ড করে দেয়া হয়। গত ৩০ জানুয়ারি রাজশাহী জেলা পরিষদের
চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী সরকারের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে হামলা
চালায় এমপি আয়েনের ক্যাডাররা। গত বছরের জুনে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে আচরণ
বিধি ভেঙে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের হুমকি দেন এমপি আয়েন।
তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট না দিলে স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বন্ধ
করে দেয়ারও হুমকি দেন তিনি। গত বছর হত্যা মামলা পলাতক প্রধান আসামিকে
সঙ্গে নিয়ে স্টেডিয়ামে খেলা দেখে যুগান্তরে প্রধান শিরোনাম হয়েছিলেন এমপি
আয়েন। তার চাপাচাপিতে নিয়ম ভেঙে রাজশাহী চিনিকলের প্রায় দেড়শ’ টন চিনি দলের
নেতাকর্মীদের মাঝে নামেমাত্র দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এমপি
আয়েনের কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ নওহাটা পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল
মান্নান যুগান্তরকে বলেন, ‘এমপি আয়েনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে
মিছিল করায় আমাদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা এমপি লীগ করি না,
আওয়ামী লীগ করি। কেউ দলে থেকে দলের আরেক নেতাদের ওপর হামলার ইন্ধন দেবে-
এটা আমরা মেনে নেব না। আমাদের দাবি একটাই, এমপি আয়েনকে দল থেকে বহিষ্কার
করতে হবে। তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগ ডুবছে।’ নাম প্রকাশে
অনিচ্ছুক রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা জানান,
এমপি আয়েনের দাপটে জেলা
উপজেলা সবাই অস্থির। তিনি কাউকেই মানেন না। জেলার নেতাদেরও পাত্তা দেন না। ফলে প্রশ্ন উঠেছে তিনি দলের এমপি নাকি অন্য কিছু? তিনি বলেন, ‘আয়েনের নানা
অপকর্মের বিষয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে অভিযোগ দেয়া
হয়েছে। তিনি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।’ এ বিষেয়ে রাজশাহী
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, শনিবার
মাদ্রাসা মাঠের কর্মী সমাবেশে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যে
বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত। এমপিদের নানা অনিয়মের লাগাম
টেনে ধরার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। এতে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দলের প্রতি হাতাশা
কাটিয়ে আস্থা ফিরে পেয়েছেন। ওবায়দুল কাদেরের কাছে এমপি আয়েন উদ্দিন ও
রাজশাহী-৫ (দুর্গাপুর-পুঠিয়া) আসনের এমপি আবদুল ওয়াদুদ দারার বিরুদ্ধে
অভিযোগ গেছে বলে তিনি স্বীকার করেছেন। তবে কী অভিযোগ গেছে তা জানাতে
অস্বীকৃতি জানান তিনি। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এমপি আয়েন উদ্দিন
যুগান্তরকে বলেন, ওবায়দুল কাদেরকে রাজশাহী বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা থেকে শুরু
করে বিদায় দেয়া পর্যন্ত আমার নেতাকর্মীরা সফল শোডাউন দেখিয়েছে। তিনি দেখে
গেছে, একমাত্র এমপি আয়েনই কীভাবে দলকে সংগঠিত করে রেখেছে প্রমাণ ছাড়া এসব
অভিযোগ হাস্যকর। অভিযোগ থাকলে তিনি (ওবায়দুল কাদের) আমাকে বলতেন। কিছুই তো
বলেননি।

No comments:
Post a Comment