Thursday, March 2, 2017

খুনি চালকের জন্য ধর্মঘট কেন

সারাদেশে পরিবহন ধর্মঘট নিয়ে ক্ষোভের সঙ্গে হতাশা প্রকাশ করেছেন সাভারে ট্রাকচাপায় নিহত গৃহবধূ খোদেজা বেগমের স্বামী ও সন্তানেরা। তার স্বামী নুরুল গাজী বলেন, 'খোদেজা কোনো সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়নি। তাকে ঠাণ্ডা মাথায় ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যা করেছিলেন চালক মীর হোসেন মিরু।' দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০০৩ সালের এ ঘটনায় মিরুর হত্যা বিষয়টি আদালতে প্রমাণিত হয়। গত সোমবার ঢাকার পাঁচ নম্বর জজ আদালত মিরুকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে ঠাণ্ডা মাথার এ খুনকে 'সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু' আখ্যা দিয়ে মঙ্গলবার ধর্মঘটের ডাক দেয় সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। এদেশে সারাদেশে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। বৃহস্পতিবার সকালে সাভার হেমায়েতপুরের ঝাওচর এলকায় নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের খোদেজার স্বামী জানান, হত্যা মামলার একজন আসামিকে বাঁচাতে সারাদেশে ধর্মঘট ডাকায় তিনি হতভম্ব হয়ে পড়েছেন। তিনি জানান, এ ধর্মঘটের কারণে তাদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। আসামিপক্ষ তাকে ও তার ছেলেদের হত্যার হুমকি দিচ্ছে। এ অবস্থায় নিরাপত্তাহীনতায় তারা ভুগছেন। এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে নুরুল গাজী বলেন, ২০০৩ সালের ২০ জুন খোদেজাকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। এর কয়েক দিন আগে ট্রাকযোগে খোদেজা বেগমের বাড়ির পাশের একটি জমি ভরাটের কাজ করছিল ট্রাকচালক মির হোসেন মিরু। বিনা অনুমতিতে ধুলাবালি ছড়িয়ে ট্রাক আনা নেয়ার বিরোধিতা করেন খোদেজা ও তার স্বামী। ২০ জুন ফের মাটি নিয়ে ট্রাক আসলে তার সামনে দাঁড়িয়ে বাধা দেন খোদেজা, তার স্বামী এবং প্রতিবেশীরা। এ সময় সবাইকে রাস্তা থেকে সরে যেতে বলে অন্যথায় সবার ওপর ট্রাক চালিয়ে দেয়ার হুমকি দেন মিরু। কিন্তু খোদেজারা রাস্তা না ছাড়লে মিরু ও তার ভাই ইমতিয়াজ প্রথমে গাড়ি পিছিয়ে নিয়ে ফের দ্রুত বেগে রাস্তায় অবস্থানকারীদের ওপর ট্রাক চালিয়ে দেয়। এ সময় অন্যরা রাস্তা থেকে সরে যেতে পারলেও খোদেজা ট্রাকের সামনের চাকা এবং পেছনের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। এ ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন মিরুকে আটক করে।
খবর পেয়ে সাভার থানার পুলিশ ট্রাকসহ (রাজশাহী ট-৫৮৮১) মিরুকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনায় ওই বছরই সাভার মডেল থানায় ৩০২/৩৪ দণ্ডবিধিতে মামলা দায়ের করা হয়। পরে ২০০৪ সালে ট্রাকচালক মিরু এবং তার ভাই ইমতিয়াজ আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। দীর্ঘ ১৩ বছর বিচার চলাকালে এ মামলায় ১০ জন সাক্ষ্য দেন। গত সোমবার এ মামলার রায় দেন আদালত। খোদেজার স্বামী নুরুল গাজী বলেন, আমার স্ত্রীকে গায়ের জোরে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৪ বছর পর আল্লাহর রহমতে আমি স্ত্রী হত্যার বিচার পেয়েছি।  এখন দ্রুত বিচার কার্যকর হলে অন্য কোনো ট্রাকচালক ভবিষ্যতে এমন অপরাধ করার সাহস পাবে না। বিচারে আরেক আসামি ইমতিয়াজ খালাস পাওয়ায় উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলে জানান খোদেজার স্বামী। এদিকে নিহত খোদেজার মেয়ে স্বাধীনা সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ট্রাকচালক মিরু তার মাকে হত্যা করার আগে একই গ্রামের নার্গিস নামের একটি মেয়েকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছিল। ওই ঘটনায় মিরুর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হলেও পরে সে আইনের মারপ্যাঁচে রেহাই পেয়ে যায়। নিহত খোদেজার ছেলে বিল্লাল বলেন, যখন তার মাকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যা করা হয় তখন তিনি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। মাকে হত্যার ঘটনা তিনি নিজ চোখে দেখেছেন। তিনি বলেন, আমাদের বাড়ির সামনের নিজস্ব রাস্তায় ট্রাক চালাতে বাধা দেয়ায় আসামি মিরু আমার মায়ের ওপর দিয়ে ট্রাক চালিয়ে দেয়। মায়ের কাপড় ট্রাকের সামনে পেঁচিয়ে যায়। তারপরেও তাকে চাকার নিচে পিষ্ট করে ট্রাক চালিয়ে নেয় মিরু। এতে ছটফট করতে করতে মা মারা যান। বিল্লাল বলেন, আমার মা দুর্ঘটনায় মারা গেলে কোনো আফসোস ছিল না। কিন্তু চোখের সামনে মাকে ট্রাকচাপা দিয়ে মারা হয়েছে। যেই খুনি এমন ঘটনা ঘটিয়েছে তার জন্য কিভাবে সারাদেশে ধর্মঘট পালন করা হল, জানতে চান খোদেজার ছেলে।

No comments:

Post a Comment