কিম
জং-নামই উত্তর কোরিয়ার প্রথম নেতা নন, যিনি দেশটির ক্ষমতার জের ধরে
হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন। দক্ষিণ কোরিয়া বলছে, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম
জং-আনের নির্দেশেই এই হত্যাকাণ্ড। কিন্তু কেন তিনি নিজের ভাইকে হত্যা করতে
চাইবেন? উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের সৎভাই কিম জং-নামকে মালয়েশিয়ার
কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি হত্যা করা হয়। ওই
হত্যাকাণ্ডের পর এ বিষয়ে নিশ্চুপ রয়েছে উত্তর কোরিয়া। এ নিয়ে বিশ্লেষণ
করেছেন বিবিসির সংবাদদাতা রুপার্ট উইং-ফিল্ড। উত্তর কোরিয়ার ঘটনাবলী বুঝতে
হলে, প্রথমেই এটা মেনে নিতে হবে যে, উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্সি আসলে
একটি রাজতন্ত্র, যার নাম কিম পরিবার।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই কিম
পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা করেন কিম ইল-সাঙ। তিনি যখন ১৯৯৪ সালে মারা যান, তার
পুত্র কিম জং-ইল দেশের ক্ষমতায় আসেন। পাঁচবছর আগে তিনি মারা যান। এরপরই
তার ছেলে কিম জং-উন দেশের ক্ষমতায় বসেন। তবে কিম জং-উন একজন তরুণ, অনভিজ্ঞ
নেতা আর তিনি নিরাপত্তাহীনতায়ও ভোগেন। আর তাই ক্ষমতায় বসার পর থেকেই
তিনি অনেককে হত্যার আদেশ দিয়েছেন। কিম জং-নামের একজন বন্ধু অ্যালেক্স
হাওয়াঙ বলছেন, তিনি কেন এরকম হত্যা করছেন? কারণ তার ক্ষমতা এখনো পাকাপোক্ত
হয়নি। তার বাবা কখনো এভাবে মানুষ হত্যা করেননি। কিন্তু এখন তিনি সবাইকে
হত্যা করতে চান। কারণ তিনি তাদের বিশ্বাস করতে পারছেন না। ঘটনাপ্রবাহ দেখে
ধারণা করা যায় যে, নিজের পরিবারের সদস্যদেরই সবচেয়ে বেশি হুমকি বলে মনে
করেন নতুন নেতা কিম জং-উন। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর ক্ষমতাশালী
ছিলেন তার খালু জ্যাঙ সঙ-টেক। জং-উন যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন জ্যাঙই ছিলেন
দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি। দেশের ভেতর আর আঞ্চলিকভাবে নেটওয়ার্ক ও
বন্ধুদের দিক থেকে তার অনেক যোগাযোগ ছিল। এদের একজন ছিলেন তার ভাগ্নে
মালয়েশিয়ায় উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত জ্যাঙ ইয়াঙ-ছল। তার মাধ্যমে অন্য
আত্মীয়দের সঙ্গেও তিনি যোগাযোগ রাখতেন, যাদের একজন ছিলেন কিম জং-নাম।
কিন্তু ২০১৩ সালে কিম জং-উন ৫০ বছরের মধ্যে উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড়
আলোচনার জন্ম দেন তার চাচা জ্যাঙ সঙ-টেককে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড
কার্যকরের মাধ্যমে। পরের একমাসের মধ্যে পরিবারের সদস্যদের জড়ো করা হয় এবং
রাষ্ট্রদূত জ্যাঙ ইয়াঙ-ছলকে দেশে ডেকে পাঠিয়ে তারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
করা হয়। তার একজন খালা এবং তার মেয়ে এখন প্রবাসে লুকিয়ে রয়েছে। এর ফলে
কিম জং-নাম নিঃসঙ্গ আর সহায়হীন হয়ে পড়েন। তিনি চরম অর্থসংকটেও ভুগছিলেন।
ছোটবেলায় কিম জং-নাম ছিলেন তার বাবার বড় আর সবচেয়ে প্রিয় সন্তান এবং
ক্ষমতার উত্তরাধিকারী।
তার মা ছিলেন উত্তর কোরিয়ার চলচ্চিত্রাভিনেত্রী সঙ
হে-রিম। জং-নাম রাশিয়া এবং সুইজারল্যান্ডে পড়াশোনা করেছেন। ফলে পশ্চিমা
দেশগুলোয় তার ভ্রমণ উত্তর কোরিয়ার সামাজিক রীতিনীতি আর শাসন পদ্ধতি নিয়ে
প্রশ্নের জন্ম দেয়। বলা হয় যে, তার বক্তব্যে তার বাবা মাঝে মাঝে এতটাই
বিরক্ত হয়েছিলেন যে, তাকে রাজনৈতিক বন্দী শিবিরে পাঠানোর হুমকি দিতেন।
কুড়ি দশকের শুরুর দিক থেকে তিনি উত্তর কোরিয়ার বাইরে থাকতে শুরু করেন।
সত্তরের দশকে একজন নৃত্যশিল্পীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তার বাবা কিম
জং-ইল। সেই ঘরেই তিনটি সন্তানের জন্ম হয়, যাদের মধ্যম বর্তমান নেতা কিম
জং-উন। যদিও উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতার প্রতি কিম জঙ-নামের কোনো আগ্রহ কখনো
দেখা যায়নি, কিন্তু সাবেক নেতা কিম ইল-সাঙের একজন নাতি হিসেবে হয়তো কখনো
তিনি হুমকি হিসাবে দেখা দিতে পারেন উত্তর কোরিয়ার অনেকের মধ্যে ধারণা আছে।
তাছাড়া জং-নাম চীনের শীর্ষ কর্তাদের প্রশ্রয়ে ছিলেন, যা ছিল উত্তর
কোরিয়ার নতুন নেতার জন্য চিন্তার বিষয়। উত্তর কোরিয়ায় শীর্ষ ক্ষমতাধর
এই পরিবারের বংশ পরম্পরার দিকে তাকালে এটা পরিষ্কার বুঝতে পারা যাবে, এই
পরিবারের সদস্যদের লম্বা আর সুখী জীবনের কোনো নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না।
সূত্র: বিবিসি
সূত্র: বিবিসি

No comments:
Post a Comment