Sunday, March 12, 2017

‘র’-আমেরিকান অ্যাম্বেসির লোক তো হাওয়া ভবনে বসেই থাকতো -প্রধানমন্ত্রী

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কথায় কথায় বিএনপির মুখে ভারত বিরোধিতার কথা শোনা যায়। কিন্তু তাদের চরিত্র বাস্তবে ঠিক উল্টো। ভারতের কাছে গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসেছিলেন। ৫০ বছরের রিজার্ভ না রেখে আমি গ্যাস বিক্রিতে রাজি হইনি বলে ক্ষমতায় যেতে পারিনি। ওই সময় ‘র’ এবং আমেরিকান অ্যাম্বেসির লোক হাওয়া ভবনেই বসে থাকতো। আর ভারতের দালালি করে কে তাও দেশের মানুষ ভালো করেই জানে। ভারতে গিয়ে খালেদা জিয়া গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে কথা বলতেই ভুলে গিয়েছিলেন। আমরা ক্ষমতায় এসে ঐতিহাসিক গঙ্গা চুক্তি করেছি। গতকাল রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে যুব মহিলা লীগের ত্রিবার্ষিক জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বিকালে দ্বিতীয় অধিবেশনে আগামী তিন বছরের জন্য কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। সকালে জাতীয় সংগীতের সুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় পতাকা এবং যুব মহিলা লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন। এরপর শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধন করেন। যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আখতারের সভাপতিত্বে সম্মেলনে সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল। শুরুতেই গীতিনাট্যের তালে তালে নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পীরা। এরপর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত রাজপথে যুব মহিলা লীগের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রমাণ্যচিত্র পরিবেশন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে ব্যাজ, উত্তরীয় ও ক্রেস্ট তুলে দেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। শোক প্রস্তাব পাঠ করেন ইসরাত জাহান নাসরিন। বক্তব্য রাখেন  আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ফজিলাতুন্নেছা ইন্দিরা ও সহ-সভাপতি জাকিয়া পারভীন মনি।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে যখন আমেরিকান কোম্পানি আমাদের গ্যাস বিক্রি করতে চাইলো ভারতের কাছে। ভারতের কাছে গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়েছিল খালেদা জিয়া। মুচলেকা দিয়েই তো ক্ষমতায় এসেছিল। আমি তো দেইনি। আমি চেয়েছিলাম দেশের মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী ৫০ বছরের রিজার্ভ থাকবে। তারপর আমরা ভেবে দেখবো বিক্রি করবো কি করবো না।
তিনি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে এত কথা বলে, এখানে সেই ‘র’ (ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা)-এর প্রতিনিধি তো হাওয়া ভবনে বসেই থাকতো। আমেরিকান অ্যাম্বাসির লোক হাওয়া ভবনে বসেই থাকতো। ২০০১ সালের নির্বাচন আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণভাবে হারাবে এবং এখান থেকে গ্যাস নেবে।
তিনি বলেন, আমি বলেছিলাম গ্যাস বিক্রি করবো না। কিন্তু মুচলেকা তো দিয়েছিল খালেদা জিয়া। তাদের মুখে আবার এত ভারতবিরোধী কথা।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়ারা ভারতের সঙ্গে সীমানা নির্ধারণ করার বিষয়ে কথা বলতেই ভয় পেয়েছে। আমরা সেই সীমানা নির্ধারণও করেছি। তারা ভারত ও মিয়ানমারের কাছে সমুদ্রসীমার দাবি বা মামলা করতে ভয় করেছে। আমরা মামলা করে ভারত ও মিয়ানমার থেকে সমুদ্রসীমার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছি। এমনকি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির সময়ও খালেদা জিয়া বিরোধিতা করে বলেছিলেন ফেনী পর্যন্ত নাকি ভারত হয়ে যাবে। তখন আমি বলেছিলাম, ফেনী পর্যন্ত ভারত হয়ে গেলে খালেদা জিয়াকে তো পশ্চিমবঙ্গ কিংবা ত্রিপুরা সংসদে যেতে হবে, দেশে নয়। তিনি বলেন, আসলে এরা ক্ষমতায় আসে দেশপ্রেম নিয়ে নয়, ক্ষমতাকে ভোগ করার জন্য। এরা ক্ষমতায় থেকে নিজেরা বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছে, আর একটি এলিট শ্রেণি তৈরি করেছে। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর ৪০ দিন ধরে মিথ্যাচারের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর ৪০ দিন ধরে টেলিভিশনে প্রচার করা হয় ভাঙা স্যুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জি ছাড়া নাকি আর কিছুই রেখে যাননি। জিয়াউর রহমানের প্যান্ট কেটে নাকি তারেক-কোকোর প্যান্ট বানিয়ে পরানো হয়েছে। পরে সেই ভাঙা স্যুটকেস আলাউদ্দিনের চেরাগ হয়ে গেছে। জিয়া পরিবারের বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদের চিত্র দেশবাসী দেখেছে। আসলে দ্বিমুখিতা, দুর্নীতি, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসই হচ্ছে বিএনপি নেত্রীর নীতি। হাওয়া ভবনের পাওনা না মিটিয়ে ওই সময়ে কেউ কোনো কাজ করতে পারেনি। মা-ছেলেকে দু’ভাগ দিয়েই কাজ করতে হয়েছে। মায়ের ভাগ নিয়েছে ফালু আর ছেলের ভাগ নিয়েছে মামুন। এটাই ছিল ওই সময়ের দেশের বাস্তবতা। দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি ও সাফল্যের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসা মানেই দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি। আর বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসা মানেই সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি-অর্থপাচার আর দুঃশাসন। এরা দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না বলেই দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি হোক তা চায় না। দেশের মানুষ সুন্দর, উন্নত ও সমৃদ্ধ জীবন নিয়ে এগিয়ে যাবে এটা খালেদা জিয়া ও জামাতিদের সহ্য হয় না। এ বিষয়গুলো দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরে তাদের মন জয় করার জন্য দলের নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার মাত্র ৮ বছরেই দেশের যে পরিমাণ উন্নয়ন করেছে, ২১ বছর ক্ষমতায় থেকে তারা পারেনি কেন? তার একমাত্র কারণই হচ্ছে এরা দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। এদের দিলে পেয়ারে পাকিস্তান। এদের (বিএনপি-জামায়াত) ব্যাপারে দেশের মানুষকে সচেতন থাকতে হবে। দেশের উন্নয়নের এই অগ্রযাত্রায় কেউ যেন বাধা দিতে না পারে সেজন্য সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলে দেশব্যাপী অত্যাচার-নির্যাতন, হত্যার বিবরণ তুলে ধরে বলেন, একাত্তরের পাকিস্তানি হানাদাররা বাংলাদেশে যেভাবে গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও অত্যাচার করেছে, ঠিক একই কায়দায় বিএনপি-জামায়াত জোট দেশে অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে। নৌকায় ভোট দেয়ার অপরাধে ৬ বছরের শিশু রাজুফাকে গণধর্ষণ করেছে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসীরা। অন্তঃসত্ত্বা মা রেহাই পায়নি, মা-মেয়েকে একসঙ্গে ধর্ষণ করেছে। তিনি বলেন, ক্ষমতায় থাকতে তারা রাজপথে আমাদের মেয়েদের ওপর যে অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছে, আমরা ক্ষমতায় থাকতে তো তা করিনি। তারা বলে ভয়ে নাকি তারা রাস্তায় নামে না। আমার প্রশ্ন- এত ভয় থাকলে রাজনীতি করা কেন? ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর ৫ বছরে বিএনপি-জামায়াত জোট দেশে যে অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে, তা দেশের মানুষ কখনো ভুলবে না, ভুলতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, খুনখারাবি, অত্যাচার-নির্যাতন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার পুরনো অভ্যাস। ৯২ দিন এয়ারকন্ডিশন অফিসে বসে থেকে হুকুম দিয়ে তিনি সারা দেশে খুনখারাবি করিয়েছেন। শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করিয়েছেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন সরকারের পতন না ঘটিয়ে ঘরে ফিরে যাবেন না। আমার প্রশ্ন- ওই সময় উনি ঘরে ছিলেন নাকি রাস্তায় ছিলেন? ঘরে বসে হুকুম দিয়ে উনি সারা দেশে জ্বালাও-পোড়াও করিয়েছেন। শিশু, কিশোর, অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিক্ষক থেকে সাধারণ মানুষ- কেউ-ই তার অগ্নিসন্ত্রাসের হাত থেকে রেহাই পাননি। তার আন্দোলনের ডাকে দেশের জনগণ কোনো সাড়া দেয়নি, বরং উল্টো সারা দেশে বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলন প্রতিহত করতে শুরু করলে তারা এসব বন্ধ করতে বাধ্য হয়। নির্বাচন নিয়ে বিএনপির মুখে কথা শোভা পায় না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন দেখি তারা (বিএনপি) নির্বাচন নিয়ে কথা বলে। সংবিধান লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীর হাতে সৃষ্ট দল হচ্ছে বিএনপি। জিয়াউর রহমানের সময় নির্বাচনের নামে প্রহসন, হ্যাঁ-না ভোট, খালেদা জিয়ার আমলের ১৫ই ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচন, মাগুরা ও ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনের কথা কি তারা ভুলে গেছে? তারা ক্ষমতায় থাকতে ভোট কারচুপির ইতিহাস ছাড়া কখনো কী অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে পেরেছে? তাই তাদের মুখে আর যাই হোক নির্বাচনের কথা শোভা পায় না। নারীর ক্ষমতায়নে আওয়ামী লীগের বিশাল অর্জনগুলো সারা দেশের মা-বোনদের সামনে ব্যাপকভাবে প্রচারের জন্য দলের নারী নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আগে দেশে কোনো সচিব, জেলা প্রশাসক, এসপি, জজ, বিচারপতি নারী ছিল না। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীতে কোনো নারী কর্মকর্তা ছিল না। আমরা ক্ষমতায় এসে সর্বক্ষেত্রে নারীদের পদায়ন করেছি। সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করেছি।

No comments:

Post a Comment