
আমাদের অভিশপ্ত জীবন। রাস্তাঘাটে, গাড়িতে, দোকানে চাঁদাবাজি করতাম। বস্তিতে পানির মধ্যে বাস করতাম। অভাব-অনটনে, খেয়ে না খেয়ে দিন পার করেছি। সবাই আমাদের খারাপ ভাবতো। কোনো মূল্যায়ন করতো না। আমাদের জন্য নাকি সমাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হিজড়া বলে কেউ মিশতো না আমাদের সঙ্গে। অনেক খারাপ লাগতো এমন অমানবিক ব্যবহারে। কষ্ট পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাসে আজ আমরা সাবলম্বী। অভিশপ্ত জীবন থেকে পেয়েছি মুক্তি। সমাজের মানুষ এখন আর আমাদের অবহেলার চোখে দেখে না। কথাগুলো বলছিলেন জামালপুরের রূপসী আর রুমা হিজড়া। বাংলা একাডেমিতে বৈশাখী মেলার সিরি সমাজ কল্যাণ সংস্থার, সিরি হেন্ডি ক্রাফটের স্টলে ক্রেতার সঙ্গে দরকষাকষি করে তারা তাদের নিজের বুননের তৈরি পোশাক বিক্রি করছিলেন। কথাবলে জানা যায় তাদের জীবনের সেই অতীতের ফেলে আসা দিনগুলোর বর্ণনা। রূপসী ও রুমা হিজড়া বলেন, আমরাও অন্য হিজড়াদের মতো চাঁদাবাজি করতাম। সারাদিন বাউন্ডেলের মতো ঘুরে বেড়াতাম। খেয়ে না খেয়ে থাকতে হতো। বেঁচে থাকা আর না থাকার মধ্যে কোন মানে খুঁজে পেতাম না। একটা গন্ডির ভেতরে আমাদের জীবন আটকে ছিল। সমাজের অন্য মানুষের সঙ্গে আমরা মিশতে পারতাম না। অথচ হিজড়াদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাদের জন্ম ভালো ঘরে হয়েছে। শিক্ষক থেকে শুরু করে ডাক্তার, ব্যবসায়ী, পুলিশসহ সকল পেশার মানুষের পরিবারেই হিজড়াদের জন্ম হয়েছে। আমরা চিন্তা করলাম পরনির্ভরশীল হয়ে এভাবে আর কতদিন। এই অভিশপ্ত জীবন নিয়ে আর বেশি দূর যাওয়া যাবে না। তাই আমরা অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে থাকি। কিছু একটা করতে হবে। সময়টা ছিল ২০০৪ সাল। প্রথমে হিজড়ারা মিলে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেই। ছোটবেলা থেকেই সবাই মেয়েলি স্বভাবের ছিলাম। কম বেশি সবাই সেলাইয়ের কাজ জানতাম। তাই আমরা হ্যান্ডি ক্রাফট (হাতের বুনন) ব্যবসাটাকে বেছে নিই। আমাদের কোন প্রশিক্ষণ নিতে হয়নি। আমাদের সংগঠনের সভাপতি এবং অন্যান্য হিজড়ারা টুকটাক বুননের কাজ জানতাম। সেটাকেই পুঁজি করে কাজ শুরু করে দেই। প্রথমদিকে আমাদের এই ব্যবসাটা করতে অনেক বেগ পেতে হয়। ১২ জন মিলে শুরু করলেও এখন ৮৭ জন হিজড়া মিলে আমরা এই কাজ করছি। চাঁদাবাজি করা হিজড়াদের রাস্তা থেকে ধরে এনে বুঝিয়ে এই কাজে যুক্ত করি। এখন আমাদের ব্যবসাটা অনেক বড় হয়েছে। আড়ং, জয়ীতাসহ আরো অনেক ব্যান্ডের দোকানে আমাদের কাপড় বিক্রি হয়। কোন রকম প্রশিক্ষণ ছাড়াই শুধু নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়েই আমরা বিভিন্ন ধরনের ত্রিপিস, শাড়ি, ব্যাগ, বালিশের কাভার, বিছানা চাদরসহ অনেক কিছু তৈরি করে বাজারজাত করছি। কিছু হিজড়া কাপড় বুনন করে দেয়। আর আমরা তাদের কাজের মূল্য দিয়ে দেই। পরে আমরা বিভিন্ন শো-রুমে নিয়ে বিক্রি করি। এছাড়া আমাদের বাসায় এসে পরিচিত ব্যবসায়ীরা কাপড় নিয়ে যায়। পরিচিত অনেকে আছে তারা আমাদের কাছ থেকে এসে পছন্দের কাপড় নেয়। আমরা এখন নিজেদের উপর নির্ভরশীল। আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে গত বছর বন্যার সময় ৮০ হাজার টাকার ত্রাণ বিতরণ করেছি। এছাড়া বন্যাদুর্গতদের জন্য আমরা নিজেরাই আটার রুটিসহ অন্যান্য খাবার তৈরি করে দিয়েছি। স্বপ্ন আছে ঢাকায় বড় একটি কাপড়ের শোরুম করবো। এ বিষয়ে সিঁড়ি সমাজ কল্যাণ সংস্থার (সিঁড়ি হস্তশিল্প) সভাপতি জানান, আমরা ৮৭ জন হিজড়া সংগ্রাম করছি সাবলম্বী হওয়ার। আমাদের তৈরি বিভিন্ন আইটেম নিয়ে আমরা মেলায় অংশগ্রহণ করি। ঢাকায় এখন এসএমই ও বাংলা একাডেমিতে বৈশাখী মেলায় আমাদের স্টল আছে। বিক্রিও অনেক ভালো হয়েছে।
No comments:
Post a Comment