Saturday, May 27, 2017

সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য অপসারণ, প্রতিবাদে বিক্ষোভ- অ্যাকশনে পুলিশ

সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে গ্রিক দেবীর ভাস্কর্য সরানোর প্রতিবাদে ডাকা কর্মসূচিতে জলকামান ব্যবহার করেছে পুলিশ। একইসঙ্গে কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। আটক করা হয় চারজনকে। কর্মসূচিতে পুলিশের হামলার অভিযোগ তুলে আজ সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ছাত্র ইউনিয়ন। এদিকে ভাস্কর্য অপসারণের প্রতিবাদে দিনভর বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। ভাস্কর্য অপসারণের নিন্দা জানিয়েছে গণজাগরণমঞ্চ। সংগঠনটির মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার এক বিবৃতিতে  বলেন, মৌলবাদীদের তুষ্ট করতেই সরকার ভাস্কর্য অপসারণের মতো নোংরা খেলায় মেতেছে। এদিকে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে গ্রিক দেবীর মূর্তি অপসারণ হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে হেফাজতে ইসলামসহ বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন। তারা এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়েছে। দেশের সব ভাস্কর্য অপসারণেরও দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম।
গত ডিসেম্বরে স্থাপন করা গ্রিক দেবীর ভাস্কর্যটি নিয়ে শুরু থেকে বিতর্ক চলে আসছে। এটি স্থাপনের পর থেকে হেফাজতে ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন তা অপসারণের দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে।
গত ১১ই এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে হেফাজতের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে আলেম ওলামাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ভাস্কর্যটির বিপক্ষে তাঁর অবস্থান তুলে ধরেন। যুক্তি হিসেবে ভাস্কর্যটির নান্দনিক ত্রুটি ও জাতীয় ঈদগাহের কাছে এর অবস্থানের বিষয়টি উল্লেখ করে গ্রিক দেবীর আদলে নির্মিত এই ভাস্কর্যকে শাড়ি পরানোরও সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা। ভাস্কর্য সরানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতির পর রোজার আগেই তা সরানোর দাবি জানিয়ে হরতালসহ আন্দোলনের হুমকি দিয়েছিল কয়েকটি ইসলামী সংগঠন। বৃহস্পতিবার দিবাগত মধ্যরাতে সুপ্রিম কোর্টের ভাস্কর্য সরানোর তদারকিতে ছিলেন ভাস্কর মৃণাল হক। তিনি দাবি করেছেন চাপের মুখে এটি সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। তবে, কার চাপে- এটি তিনি খোলাসা করে বলেননি। অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষই ভাস্কর্যটি অপসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গাজীপুরে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মূর্তি অপসারণ সরকারের বিষয় নয়। এটি সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত।
বিক্ষোভ, জলকামান, কাঁদানে গ্যাস, আহত ২৫, আটক ৪
এদিকে ভাস্কর্য সরানোকে কেন্দ্র করে শুক্রবার সকাল থেকে উত্তাল হয়ে উঠে শাহবাগ, সুপ্রিম কোর্ট সংলগ্ন দোয়েল চত্বর, মৎস্য ভবন এলাকা। প্রতিবাদে দফায় দফায় বিক্ষোভ করেছে প্রগতিশীল বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে প্রগতিশীল ছাত্রজোটের ব্যানারে টিএসসির রাজু ভাস্কর্য থেকে মিছিল নিয়ে হাইকোর্টের মাজার গেটের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশি বাধার মুখে পড়ে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তি হয় বিক্ষোভকারীদের। বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভাঙ্গার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে মিছিলকারীদের ওপর জলকামান, রাবার  বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করলে বিক্ষোভকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দীসহ চারজনকে আটক করে। আটককৃত অন্যরা হলেন- ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা কলেজ সংসদের সভাপতি মোর্শেদ হালিম এবং লালবাগ থানার ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী জয় এবং উদীচী নেতা আরিফ নুর। এ ঘটনায় আহত হয়েছে অন্তত ২০ জন। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বেলা ১১টার পর রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু করেন বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এই বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, উদীচী, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট, ছাত্রঐক্য ফোরামসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। পরে সেখান থেকে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে যাওয়ার পথে মাজার গেটের কাছে পুলিশি বাধার মুখে পড়েন বিক্ষোভকারীরা। পুলিশের বাধা পেয়ে প্রগতিশীল ছাত্রজোট ক্যাম্পাসে ফিরে এসে দফায় দফায় মিছিল করে। মিছিল থেকে সরকারের ‘মৌলবাদ তোষণনীতির’ বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়া হয়। মিছিলে পুলিশের বাধার প্রতিবাদে আজ শনিবার সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা করে প্রগতিশীল ছাত্রজোট। দুপুরে এক প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে ছাত্রফ্রন্টের একাংশের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স বলেন, শনিবার সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জেলায় জেলায় বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করছি। দেশের সকল জেলা, উপজেলায় এই বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকায় বিকালে বিক্ষোভ কর্মসূচি সমাবেশ হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি তুহিন কান্তি দাস বলেন, ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দীসহ চারজনকে পুলিশ আটক করেছে। এ ঘটনায় ২০ থেকে ২৫ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্ট একটি সংরক্ষিত এলাকা। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এখানে সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ। তারা হাইকোর্টের ভেতরে প্রবেশ করতে চাইছিল। আমরা তাদের সকাল থেকে ঠেকানোর চেষ্টা করছি। দফায় দফায় কথা বলেছি। তারা (মিছিলকারীরা) রাজু ভাস্কর্য থেকে মিছিল নিয়ে মাজার গেটের প্রধান সড়কের ব্যারিকেড ভেঙে ফেলে। তখন তাদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। এদিকে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় সংসদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদী মিছিলে পুলিশি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে গ্রেপ্তারকৃত ছাত্রনেতা লিটন নন্দী, মোর্শেদ হালিম ও জয় এবং আরিফ নুরের অবিলম্বে মুক্তির দাবিতে গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে মশাল মিছিল হয়। আজ বিকাল ৪টায় সারা দেশে প্রতিবাদী মিছিল ও সমাবেশের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। গতকাল দুপুরে এক বিবৃতিতে এ কর্মসূচি ঘোষণা করে সংগঠনটি। বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন মনে করে হেফাজত ইসলামের দাবির প্রেক্ষিতে স্কুলের পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রগতিশীল ও অমুসলিম লেখকদের লেখা বাদ দেয়া হয়েছে এবং কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রিকে মাস্টার্সের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় হাইকোর্টের সামনে থেকে ন্যায় বিচারের নিদর্শন ভাস্কর্য অপসারণ। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আপসের যে পথ সরকার বেছে নিয়েছে, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন তার তীব্র নিন্দা জানায়। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন মনে করে মৌলবাদীদের সঙ্গে এই আঁতাত রাষ্ট্রীয় ৪ মূলনীতির পরিপন্থি এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে বড় বাধা। সরকার ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এদিকে সুপ্রিম কোর্টের সামনের ভাস্কর্যটি সরানোর প্রতিবাদে গতকাল সন্ধ্যায় শাহবাগে মশাল মিছিল কর্মসূচি পালন করে গণজাগরণ মঞ্চ। গতকাল গণজাগরণ মঞ্চের বিবৃতিতে বলা হয়, প্রতিদিন খুন, ধর্ষণ, অবিচার বেড়েই চলছে, তার কোনোটিরই বিচার করা হচ্ছে না। জনগণের সম্পদ লুটে খাচ্ছে দুর্নীতিবাজ কর্তৃপক্ষ। বিদেশে পাচার হচ্ছে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ। এসব থেকে জনগণের চোখ ফিরিয়ে রাখতেই মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পূঁজি করে ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে আত্মরক্ষার ঢাল হিসাবে ব্যবহার করছে সরকার। ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। জনগণকে প্রতারণা করে অপশাসন আড়াল করতে ধর্মের এই ব্যবহার একইসঙ্গে রাজনীতি ও ধর্ম- দুটিকেই কলুষিত করছে।

No comments:

Post a Comment