Friday, May 19, 2017

বখাটের হিংস্র থাবা কেড়ে নিলো রেশমার জীবন by মাসুদ রানা

হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া রেশমার স্বপ্ন ছিল অনেক। লেখা-পড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হবে। পরিবারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনবে। আর তাই তো মামার বাড়ি থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে। ভর্তি হয় ডিগ্রিতে। স্বপ্ন বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে গিয়েও রেশমার জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। বখাটের হিংস্র থাবা রেশমার স্বপ্ন চুরমার করে দেয়। জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেয়। আর এর সঙ্গে রেশমার পরিবারেও নেমে আসে অন্ধকার। আশার আলো এক দমকা হাওয়ায় নিভে যায়। রেশমাদের বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার গোড়াইগাতী গ্রামে। তার পিতা রেজাউল করিম। সংসারে চরম অভাবের কারণে পঞ্চম শ্রেণী পাস করেই চলে যায় মামার বাড়ি।  ঠাঁই হয় পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার সারুটিয়া গ্রামের মামা রমজান আলীর সংসারে। ভর্তি হয় ভাঙ্গুড়া জরিনা রহিম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে। মামার বাড়ি থেকেই এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে ডিগ্রিতে ভর্তি হয় রেশমা। কলেজে আসা-যাওয়ার পথে তার ওপর কুনজর পড়ে উপজেলার চরভাঙ্গুড়া গ্রামের বাবু মিয়ার বখাটে ছেলে ভটভটি চালক নান্নু মিয়ার। বখাটে নান্নু প্রায়ই তাকে উত্যক্ত করতো। প্রেমের প্রস্তাব দিত এবং বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করতো। বিষয়টি পরিবারকে একাধিকবার জানিয়েছিল রেশমা।
৯ই মার্চ সকালে কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য ভাঙ্গুড়া-ঈশ্বরদী রেল লাইনের ওপর দিয়ে যাচ্ছিল রেশমা। আগে থেকেই ভটভটি নিয়ে পাশের রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল বখাটে নান্নু।  পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রেশমাকে ডাক দেয় নান্নু। সাড়া না দিয়ে হেঁটে চলে যায় রেশমা। এতে নান্নু ক্ষিপ্ত হয়ে ভটভটি দিয়ে রেশমাকে পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এ সময় রেশমার চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে নান্নু ভটভটি রেখে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা গুরুতর আহত অবস্থায় রেশমাকে উদ্ধার করে প্রথমে ভাঙ্গুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। সেখানে রেশমার অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বখাটে নান্নুর বিরুদ্ধে পুলিশ আইনগত কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় তিনদিন পর কলেজ কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীরা বিচারের দাবিতে ভাঙ্গুড়া বাজারে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। এতে বাধ্য হয়ে ভাঙ্গুড়া থানা পুলিশ ১২ই মার্চ নান্নুকে আসামি করে সড়ক দুর্ঘটনা হিসাবে একটি মামলা করে। দীর্ঘ ২১ দিন চিকিৎসার পর রেশমার সংজ্ঞা ফিরে এলেও শারীরিক অবস্থার তেমন উন্নতি না হওয়ায় চিন্তিত হয়ে পড়ে পরিবার। এরপর কলেজ কর্তৃপক্ষ ও দাতা ব্যক্তিদের আর্থিক সহযোগিতায় দেড় মাস চিকিৎসা চালায় রেশমার পরিবার। দেড় মাস চিকিৎসার পরে রেশমার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। তখনই রেশমা পরিবারের কাছে ওই দিনের ঘটনার  লোমহর্ষক বর্ণনা দেয়। কিন্তু এরই মধ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সত্তর হাজার টাকায় ঘটনার আপসের চেষ্টা করে । এদিকে পলাতক নান্নু কোর্ট থেকে জামিন নিয়ে এলাকায় ফিরে আসে। ধামাচাপা পড়ে যায় নান্নুর বিচারের দাবি। ওদিকে এপ্রিলের শেষের দিকে রাজশাহী হাসপাতাল থেকে অসুস্থ অবস্থায় ভাঙ্গুড়া মামার বাড়িতে নিয়ে আসা হয় রেশমাকে। গত ১৩ই মে দীর্ঘ দুই মাস মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে হেরে যান রেশমা। রোববার রেশমার দাফনের পর বিচারের জন্য সোচ্চার হয় পরিবার। কিন্তু আবারো স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল চাপ দেয় আপসের।  অতি গোপনে কয়েক দফা বৈঠক করে তারা। রেশমার এক আত্মীয় জানান, রেশমার মামা রমজান আলী লাশ নিয়ে ব্যবসা করেছেন। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই। ভাঙ্গুড়া মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল জলিল ঘাতক নান্নুর উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানিয়ে বলেন, ছাত্রী হত্যার বিচার পাওয়া নিয়ে তারা শংকিত। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই একরামুল হক জানান, দুর্ঘটনার শিকার কলেজছাত্রীর মৃত্যু হওয়ায় মামলার ধারা পরিবর্তন করে তদন্ত কাজ চালানো হবে। মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে ভাঙ্গুড়া থানার ওসি নজরুল ইসলাম জুয়েল বলেন, আপসের বিষয়টি নিয়ে আমাদের কিছু যায় আসে না। মামলা আইনের গতিতেই চলবে।

No comments:

Post a Comment