
মুমলমানদের
পবিত্র নগরী জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে দেয়া এক ভাষণে তিনি আরো ঘোষণা
করেছেন যে, আমেরিকান দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুসালেমে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া
হবে। এ ঘোষণায় ক্ষোভে ফেটে পড়ছে মুসলিম বিশ্ব। ট্রাম্পের এই ঘোষণা
মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়াকে কিভাবে প্রভাবিত করবে? ট্রাম্পের ভাষণের
বিশ্লেষণ করেছেন বিবিসির প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা লিজ ডুসেট। তিনি
দেখার চেষ্টা করেছেন, তার এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির জন্য কী ইঙ্গিত
দিচ্ছে? সংবাদদাতা লিজ ডুসেট বলছেন, যে ভাষায় ট্রাম্প এই ঘোষণা দিয়েছেন,
তা ফিলিস্তিনি বা আরব বিশ্ব একভাবে নেবে, ইসরাইলিরা নেবে অন্যভাবে। ট্রাম্প
বলছেন, এর আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টরা একই চেষ্টা করেছেন (মধ্যপ্রাচ্যে
শান্তি আনার, কিন্তু সেগুলো ফল দেয়নি। তাই আমি এখন সেটাই করছি। লিজ ডুসেট
মনে বলছেন, এটা একার্থে সত্যি যে এর আগের অনেক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তা
পুরোপুরি সফল হয়নি। তাই হয়তো এখন নতুন চিন্তাধারার দরকার। কিন্তু আমি মনে
করি, এ ধরণের প্রচেষ্টাও এক্ষেত্রে কোনো সফলতা দেবে না। তিনি বলেছেন,
দীর্ঘ দিনের ইসরাইল ফিলিস্তিনি সঙ্ঘাতের অবসান ঘটাতে আমেরিকা দুই রাষ্ট্র
সমাধানকে সমর্থন জানাতে প্রস্তুত যদি উভয় পক্ষ সেটাই চায়। এ বছরের শুরুর
দিকে একটি বিবৃতিতে রাশিয়াও জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি
দিয়েছিল, কিন্তু তারা উল্লেখ করেছে পশ্চিম জেরুসালেম, পুরো জেরুসালেম
নয়।
তবে লক্ষণীয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুসালেম উল্লেখ করলেও, ইসরাইলিদের
ভাষায় "অভিন্ন জেরুসালেম তাদের চিরদিনের রাজধানী" বলে বর্ণনা করেননি। লিজ
ডুসেট বলছেন, এখানে লক্ষণীয় যে ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন, যদি উভয় পক্ষই
চায়। এর মানে হচ্ছে, এতদিন ধরে যে দুই রাষ্ট্র নীতিতে সমর্থন দিয়ে আসছে
যুক্তরাষ্ট্র, তা থেকে ট্রাম্প পিছু হটলেন। ভাষণে ট্রাম্প বলেছেন, অবশ্যই
এই ঘোষণাকে ঘিরে মতভিন্নতার তৈরি হবে। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস, শেষপর্যন্ত
আমরা একটি শান্তির দিকেই যাবো। কিন্তু বিবিসির সংবাদদাতা লিজ ডুসেট বলছেন,
উভয়পক্ষকে নিয়েই শান্তি নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু আজকের ঘোষণায় একপক্ষ
খুবই রাগান্বিত বা ক্ষুব্ধ হয়েছে, আর আরেকপক্ষ আনন্দিত, এরকম পরিস্থিতিতে
সামনে এগিয়ে যাওয়া আসলে সহজ নয়। জেরুসালেমকে রাজধানী ঘোষণা ভয়াবহ পরিণতি
ডেকে আনবে পবিত্র ভূমি জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি ও
তেলআবিব থেকে জেরুসালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার খবরে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে
বিশ্ব সম্প্রদায়। ফিলিস্তিনের ঘোরতর আপত্তি ও আরব বিশ্বে টানটান উত্তেজনার
মধ্যেই মঙ্গলবার ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এবং অন্য আরব
নেতাদের টেলিফোন করে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ইচ্ছার কথা জানিয়ে দিয়েছেন। এই
ঘোষণা না দিতে ট্রাম্পকে অনেকে সতর্ক করে দিয়েছেন। তাদের মতে, এই পদপে
ফিলিস্তিন-ইসরাইলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রক্রিয়ায় ‘ভয়ঙ্কর পরিণতি’
ঘটাবে। এত দিন পর্যন্ত জেরুসালেমে কোনো দেশের দূতাবাস ছিল না এবং
যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে
এবং তাদের একচ্ছত্র সার্বভৌম শহর হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে ১৯৬৭ সালে
সিরিয়া, জর্দান ও মিসর- এই তিন দেশের সাথে যুদ্ধ জয়ের পর পূর্ব জেরুসালেম
দখল করে নেয় ইসরাইল। ইসরাইলিরা মনে করে, জেরুসালেম হবে একটি ‘অখণ্ড’ শহর।
কিন্তু ফিলিস্তিনিরা চায় তাদের ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হবে
পূর্ব জেরুসালেম। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন বলে খবর প্রচারের
পর তার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ কড়া প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন।
মঙ্গলবার ট্রাম্প টেলিফোন করে কথা বলার পর মাহমুদ আব্বাসের মুখপাত্র নাবিল
আবু রুদেইনা এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট আব্বাস সতর্ক করে দিয়েছেন, এ
ধরনের পদেেপ শান্তি প্রক্রিয়া এবং এ অঞ্চল ও বিশ্বের শান্তি, নিরাপত্তা ও
স্থিতিশীলতার জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। এ ছাড়া শান্তি, নিরাপত্তা,
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বিশ্বের জন্যও তা হুমকির কারণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জর্দানের বাদশা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ ট্রাম্পকে যেভাবে সতর্ক করেছেন, তাতে
মাহমুদ আব্বাসের উদ্বেগেরই প্রতিফলন ঘটেছে। বাদশার প্রাসাদ থেকে এক
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘তিনি ট্রাম্পকে বলেছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত এই অঞ্চলের
স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তায় ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে।’ ট্রাম্পকে হুঁশিয়ার করে
বাদশা আরো বলেছেন, এ ধরনের পদেেপ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র সৃষ্টির পথ
বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যে রাষ্ট্রের রাজধানী হওয়ার কথা পূর্ব জেরুসালেম।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ‘এই অঞ্চল ও বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জনের
েেত্র জেরুসালেমই কেন্দ্রবিন্দু।’ এক বিবৃতিতে ট্রাম্পকে সতর্ক করে দিয়ে
মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল-সিসি বলেছেন, ‘এ ধরনের পদপে নিলে
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ ভূলুণ্ঠিত হবে।’ বিবৃতিতে আরো বলা
হয়েছে, ‘আন্তর্জাতিক ফ্রেমওয়ার্কের মতামতের ভিত্তিতে ও জাতিসঙ্ঘের
প্রাসঙ্গিক প্রস্তাবের মধ্য থেকে জেরুসালেমের বৈধ মর্যাদা সংরণের বিষয়ে
মিসরের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছেন মিসরীয় প্রেসিডেন্ট।’ পৃথক টেলিফোন আলাপে
সৌদি বাদশা সালমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে বলেছেন, ‘জেরুসালেম
পরিস্থিতি নিয়ে স্থায়ী সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়ে আমেরিকার যেকোনো ঘোষণা
শান্তি আলোচনাকে তিগ্রস্ত করবে এবং এই অঞ্চলে অশান্তি বাড়াবে।’ ইরানের
সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, ‘অযোগ্যতা ও
ব্যর্থতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের কাজ করছে।’ সিরিয়ার পররাষ্ট্র
মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘ফিলিস্তিন দখল ও ফিলিস্তিনিদের উদ্বাস্তু করার ক্ষেত্রে
এই পদক্ষেপ চূড়ান্ত রকমের অপরাধ।’ রোমান ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস
তার সাপ্তাহিক ভাষণে বলেছেন, যেভাবে আল-আকসা মসজিদ পরিচালিত হয়, তার প্রতি
সম্মান দেখানো উচিত। - আল-জাজিরা
No comments:
Post a Comment