
মহাত্মা
গান্ধীকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘পশ্চিমা সভ্যতা সম্পর্কে আপনার
ভাবনা কী?’ উত্তরে গান্ধী যে বুদ্ধিদীপ্ত সরস মন্তব্য করেন, তা স্মরণীয়।
তিনি বলেছিলেন, ‘এটা ভাবনার একটা ভালো বিষয় হতে পারে।’ তিনি মূলত বোঝাতে
চেয়েছিলেন, ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীদের পশ্চিমা সভ্যতা বৃহত্তর অ-পশ্চিমা জগতের
সঙ্গে যে আচরণ করেছে, তা থেকে পশ্চিমা সভ্যতাকে আর যা-ই হোক, সভ্য বলা যায়
না। ইতিহাসে পরিহাসের অভাব নেই। গান্ধী যদি জীবিত থাকতেন, তাহলে তাঁর মতো
মহান মানুষ সাদা মানুষদের পশ্চিমা সভ্যতার তুলনায় আমাদের এশীয় সভ্যতার
শ্রেষ্ঠত্ব বোধ করতেন কি না, এ নিয়ে আমি নিঃসন্দেহ নই। মিয়ানমার
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গমস্থল। দেশটি আজ সমগ্র রোহিঙ্গা
জনগোষ্ঠীর ওপর বর্বর আক্রমণ চালাচ্ছে, সে তাদের আইনি নাম যা-ই হোক না কেন,
আর এই নিধনযজ্ঞকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যা বা সাংবাদিকতার পরিভাষায়
‘জাতিগত নিধন’ বা যা-ই বলুন না কেন। ব্যতিক্রমহীনভাবে আসিয়ান বা সার্কের
কোনো রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান মিয়ানমারের উত্তর আরাকান বা রাখাইন প্রদেশের
বধ্যভূমি সফর করেননি, সেটা করার মতো উদ্বিগ্ন তাঁরা নন। অথবা তাঁরা কেউই
আমার দেশের বৌদ্ধদের পরিচালিত এই গণহত্যা বন্ধ করতে ব্যাপক প্রচেষ্টা হাতে
নেননি। খেয়াল করুন পাঠক, আমি এখানে উদ্ধৃতি চিহ্ন ব্যবহার করিনি। তবে
আক্রান্ত রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানকারী দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা
তাদের শিবির পরিদর্শন করেছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
মিয়ানমারের গণহত্যা থেকে পালিয়ে বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গাদের আকুতিতে দৃশ্যত
আবেগপ্রবণ হলেও মিয়ানমারের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রাজনীতিক অং সান সু চি নিজ
দেশের আন্তর্জাতিক অপরাধের কথা স্বীকার করেননি বা এই জনগোষ্ঠীর প্রতি
সহমর্মিতা দেখাননি। বাস্তবতা হলো একদল সুপরিচিত দলবাজ ও জেনারেল দ্বারা
পরিবেষ্টিত হয়ে সু চি যেভাবে রাখাইন সফর করলেন তাতে মনে হলো, তিনি বনভোজন
করতে গেছেন। আর যে রোহিঙ্গারা এখনো সেখানে টিকে আছে, তাদের বললেন, বৌদ্ধ
প্রতিবেশীদের সঙ্গে ‘ঝগড়া করবেন না’। সু চি অক্সফোর্ড থেকে শিক্ষালাভ করে
এসেছেন। একসময় তাঁকে ভুলভাবে নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ও
গান্ধীর কাতারে ফেলা হতো। তাঁর মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রতি দৃশ্যমান
সহানুভূতি দেখা যায়নি। আবার তাঁর মধ্যে সেই বুদ্ধিবৃত্তিক ঝলকও দেখা যায়নি
যাতে মনে হতে পারে তিনি বুঝতে পেরেছেন, এই গণহত্যা সুনির্দিষ্টভাবে
পূর্বপরিকল্পিত ও রাষ্ট্রনির্দেশিত। এটা প্রতিবেশীদের মধ্যকার বিবাদ নয়,
সাম্প্রদায়িক ও উপদলীয় কোন্দল নয়।
মিয়ানমারের সাবেক বৈশ্বিক আইকন, বৌদ্ধদের
প্রতি সহানুভূতিশীল ও স্বাধীনতার পরাকাষ্ঠা সন্দেহাতীতভাবেই আরেকজন
রাজবংশীয় শাসক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি রাজনীতিক হিসেবে
গড়পড়তা। ব্যক্তিগত অভিলাষ পূরণে তিনি যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত, এবং তাঁর
উচ্চাভিলাষ আমাদের বোধগম্য। অন্যদিকে সু চির মতো অতটা উজ্জ্বল না হলেও
আসিয়ান ও দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর নেতারা রোহিঙ্গাদের দুর্দশার ব্যাপারে তাঁর
চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন নন। এটা যেমন চপস্টিক সভ্যতার জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও
চীনের বেলায় সত্য, তেমনি এই অঞ্চলের ভারতীয় সভ্যতার সংস্পর্শে থাকা
দেশগুলোর বেলায়ও সত্য। আমি ও আমার সহগবেষক অ্যালিস কাউলি এই প্রক্রিয়াকে
‘মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের মন্থর গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করি। ব্যাপারটা
হলো মিয়ানমার রাষ্ট্র কর্তৃক রোহিঙ্গাদের এই নিপীড়ন বা যাদের বলির পাঁঠা
বানানো হচ্ছে, এই জনগোষ্ঠীকে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার
লক্ষ্যে তারা এসব করেছে—আমরা এটার নাম দিয়েছি তিলে তিলে গণহত্যা (স্লো
বার্নিং জেনোসাইড)। এই গণহত্যার যথেষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও এশীয় দেশগুলোর
নেতারা নৈতিক ঐকমত্য পর্যন্ত গড়ে তুলতে পারেননি। কিন্তু ব্যাপারটা তো এমন
নয় যে এশীয় সভ্যতা ও রাজনীতিকেরা এই বর্বরতা সম্পর্কে অবগত নন। বস্তুত,
দূরপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে কিছু জঘন্য রকমের বড়
গণহত্যা হয়েছে, জাতিসংঘ তাকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিক বা না দিক।
উদাহরণ আমাদের চারপাশেই আছে। জাপান চীনে ‘নানকিং ধর্ষণ’ হিসেবে কুখ্যাত
গণহত্যা চালিয়েছে। ১৯৬০-এর দশকে ইন্দোনেশিয়ায় কমিউনিস্টবিরোধী কর্মসূচি
হিসেবে চীনা বংশোদ্ভূত নাগরিকদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়েছে। ১৯৭১ সালে
পাকিস্তান আজকের বাংলাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে গণহত্যা চালিয়েছে,
কম্বোডিয়ায় কমিউনিস্ট খেমাররুজরা গণহত্যা চালিয়ে চার বছরের মধ্যে দেশের
এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মেরেছে; আর শ্রীলঙ্কায় তামিল জনগণের বিরুদ্ধে
যুদ্ধাপরাধসহ গণহত্যা চালানো হয়েছে। মিয়ানমারের অবস্থান সেই দীর্ঘ তালিকার
একদম শেষে, যেখানে সমাজ সামগ্রিকভাবে যুদ্ধ, গণহত্যা ও বর্বরতার মতো সবচেয়ে
ঘৃণ্য অপরাধে যুক্ত হয়েছে। আর এসব করতে গিয়ে তারা সবাই নৈতিক জায়গা ও
মানবতা হারিয়েছে। সমাজের সবচেয়ে অরক্ষিত মানুষদের প্রতি সহানুভূতি
হারিয়েছে, যাদের ভুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠদের জন্য হুমকি মনে করা হয়েছে, সে
তারা বৌদ্ধ, মুসলমান বা হিন্দু যা-ই হোক না কেন। আমাদের মধ্যে যে কজন
ব্যক্তি এশীয় সভ্যতার ভ্রম থেকে বেরোতে পেরেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তাঁদের অন্যতম। অনেক এশীয় মানুষই এই এশীয় সভ্যতার মুখোশ পরে থাকেন। সন্দেহ
নেই, আমাদের অনেক এশীয় ভাইবোন এই মহাদেশের গৌরবজনক অতীতের কল্পনা করেন, যে
এশিয়া বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্ম ও বৃহত্তর সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র
ছিল। এই এশিয়ায় গৌতম বুদ্ধ ও কনফুসিয়াসের জন্ম হয়েছে, উদ্ভব হয়েছে কাগজ ও
গান পাউডারের। তা সত্ত্বেও এই মহাদেশের সবচেয়ে পরিচিত চিন্তক-কবি
রবীন্দ্রনাথ এই সভ্যতার পর্দা খুলে দেখিয়ে দিয়েছেন, এটা কী। তিনি খুব
সঠিকভাবেই লিখেছেন, মানুষের মৃতদেহের ওপর সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে। বস্তুত এই
সভ্যতা লাখ লাখ মানুষের মৃতদেহের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আজ ভারত তার ‘লুক ইস্ট’
(পূর্ব দিকে নজর দাও) এবং চীন ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ প্রকল্প বানিয়ে ১০
লাখের বেশি রোহিঙ্গার বিনিময়ে গুটিকয়েক অভিজাত মানুষের সমৃদ্ধি নিশ্চিত
করতে চাইছে। তারা আজ উভয়েই বড় দেশ, তাদের জনসংখ্যা সম্মিলিতভাবে ৩০০ কোটি।
অন্যদিকে মিয়ানমারের নেতা অং সান সু চি সংখ্যাগরিষ্ঠের উন্নতিকল্পে বিকৃত
প্রায়োগিক যুক্তি প্রয়োগ করছেন। সে জন্য তিনি দুর্বল রোহিঙ্গাদের
জান-মালের বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠিত নন। এই রোহিঙ্গারা বিশ্বের সবচেয়ে বড়
রাষ্ট্রবিহীন জাতি, যাদের জাতি-রাষ্ট্র নেই। বর্মি হিসেবে আমার নাড়ি এশীয়
সভ্যতার অনেক গভীরে পোঁতা, আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করি, ‘এশীয় সভ্যতা সম্পর্কে
আমি কী মনে করি?’ হ্যাঁ, সেটা একটা ভালো চিন্তা হতে পারে।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন।
মং জার্নি: পাশ্চাত্যে বসবাসরত মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মী ও গণহত্যা বিশেষজ্ঞ।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন।
মং জার্নি: পাশ্চাত্যে বসবাসরত মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মী ও গণহত্যা বিশেষজ্ঞ।
No comments:
Post a Comment