
শিক্ষায়
বাংলাদেশ অগ্রগতির পথেই আছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অর্জনগুলো হচ্ছে
প্রাথমিক স্তরে শতভাগ শিশুকে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসা, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে
ছেলে ও মেয়ের সমতা অর্জন। এর পাশাপাশি সাধারণ, পেশাগত শিক্ষা থেকে শুরু করে
কারিগরি দক্ষতা—সব ক্ষেত্রেই আজ মেয়েদের অংশগ্রহণ ও অগ্রগতি বেশ দৃশ্যমান।
এ অর্জনের পেছনে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন শিক্ষকেরা। নানান
প্রতিকূলতার মধ্যে তাঁদের পাঠদান চালাতে হয়। তারপরও তাঁরা কাজ চালিয়ে
যাচ্ছেন। কিন্তু সেই শিক্ষকদের একটা অংশকে পেছনে রেখে এগোনো যাবে না।
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে একধরনের জটিলতা আছে। সেটা হলো মোটাদাগে
তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা—বাংলা, ইংরেজি ও মাদ্রাসাশিক্ষা। তার মধ্যে আবার
অনেকগুলো উপধারাও আছে।
আরও কিছু জটিলতা আছে। প্রাথমিকে যদিও বেশির ভাগ
বিদ্যালয় সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত। মাধ্যমিকে ঠিক তার উল্টোটা। সরকারি নয়,
কিন্তু পরিচালনায় সরকার মোটা অঙ্কের অনুদান দিয়ে থাকে। তাদেরই আমরা
এমপিওভুক্ত বিদ্যালয় হিসেবে জানি। সেখানে পাঁচ হাজারের বেশি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলো এমপিওভুক্ত নয়। কোনো বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তি,
কারও আগ্রহ বা বিশেষ অনুদানে এ প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি হয়েছে। পরে এগুলো
এমপিওভুক্ত হয়। কিন্তু যেগুলো হয়নি, তার সংখ্যাও কম নয়। সেখানে শিক্ষার্থীর
সংখ্যাও কম নয়। বেসরকারি পর্যায়ে এই দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একধরনের
বৈষম্য সৃষ্টি হয়ে আছে এবং সেটা ক্রমবর্ধমান। সরকার শিক্ষকদের বেতন-ভাতাসহ
অন্য সুবিধাদি বাড়ানোর ব্যবস্থা করছে। কিন্তু নন-এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক
বিদ্যালয়গুলো সুযোগ-সুবিধা কিছুই পাচ্ছে না। তারা মোটাদাগে একই পাঠক্রম
অনুসরণ করে। নিয়মিত পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে অংশ নেয়। গবেষণা করলে হয়তো দেখা
যাবে, কোথাও কোথাও মানের সমস্যা আছে। হয়তো শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া বা
শিক্ষকের দক্ষতার পার্থক্য আছে। কিন্তু মোটাদাগে মূলধারার সরকারি বা
সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ের সঙ্গে দক্ষতার সমস্যা
বেশি নয়। প্রশ্ন থাকতে পারে। তার মানে এই নয়, এই প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি
অনুদান থেকে বাদ যাবে। সব নাগরিকের জন্য ন্যূনতম শিক্ষা নিশ্চিত করা
সরকারের দায়িত্ব। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় জাতিসংঘের ঘোষণায় বাংলাদেশ
স্বাক্ষর করেছে, সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে, ১২ বছরের শিক্ষাকালের ৯
বছর পর্যন্ত শিক্ষা সরকারি অর্থায়নে হতে হবে। তার মানে সরকারের দায়িত্ব
অর্থায়নের ব্যবস্থা করা। দেখা যায়, আমরা বিশ্বসভায় অঙ্গীকার করি।
কিন্তু
সেই অঙ্গীকার পালন করতে অনেক সময় নিই বা করি না। আরেকটি বিষয়, টেকসই উন্নয়ন
লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাউকে পেছনে রাখা যাবে না। শিক্ষকদের একটি অংশকে
পেছনে রেখে এগোনো যাবে না। আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতিতে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা,
মর্যাদা বিবেচনার জন্য একটি পৃথক বেতনকাঠামো করার কথা বলা আছে। কিন্তু সাত
বছর পার হলেও আমরা এই পদক্ষেপও নিতে পারিনি। শিক্ষানীতিতে যে দিকনির্দেশনা
আছে, সেগুলো যদি পালন করি, তাহলে কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থায় যে বৈষম্যগুলো
বিরাজমান, সেগুলো দূর করার ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে যেতে পারি। শিক্ষানীতি তো
একটা নীতি, এর কোনো আইনি কাঠামো নেই। সে জন্য শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য
সমন্বিত শিক্ষা আইন প্রয়োজন। যেটা ভারতে আছে। যেটা শিক্ষাক্ষেত্র থেকে
বৈষম্য দূরীকরণের পাশাপাশি শিক্ষাকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
আমরাও একটি সমন্বিত শিক্ষা আইন চাই, যার মধ্য দিয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০
বাস্তবায়িত হবে, শিক্ষকেরা যাঁরা আন্দোলন করছেন, তাঁদের সমস্যাও সুরাহা
হবে। এটা যত তাড়াতাড়ি হবে, ততই মঙ্গল। আর নীতি বা আইন যা-ই হোক না কেন, এর
বাস্তবায়নে দরকার কৌশল, বিনিয়োগ ও এর যথাযথ ব্যবহার।
No comments:
Post a Comment