Monday, January 8, 2018

প্রশিক্ষণের পিঠে সওয়ার সাত ‘পর্যবেক্ষক’

বোয়িং ৭৮৭ উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত প্রকৌশলীদের সঙ্গে ‘পর্যবেক্ষক’ হিসেবে বিদেশে যাচ্ছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের আরও সাতজন। এঁদের কেউ প্রশিক্ষণ শেষে পরীক্ষা দিতে পারবেন না এবং সনদও পাবেন না। এমনকি পরে ওই উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণের কাজও করবেন না। তারপরও কেন তাঁদের বিদেশে পাঠিয়ে অর্থের অপচয় করা হচ্ছে, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিমানের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, এতে বিমানের কোনো লাভ না হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের লাভ হবে, তাঁরা ৪২ থেকে ৪৭ দিন বিদেশে থাকাকালে জনপ্রতি দৈনিক ২৬৩ মার্কিন ডলার (২১ হাজার ৮০৭ টাকা) করে ভাতা পাবেন। যে সাতজন কথিত পর্যবেক্ষক হয়ে বিদেশ যাচ্ছেন, তাঁরা হলেন প্রকৌশল শাখার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক গাজী মাহমুদ ইকবাল, ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী (কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স) কায়সার জামান, প্রধান প্রকৌশলী (প্রোডাকশন) মো. হানিফ, ভারপ্রাপ্ত উপপ্রধান প্রকৌশলী (লাইন মেইনটেন্যান্স) ওবায়দুর রহমান এবং বিএটিসির অধ্যক্ষ (জিএম পদমর্যদার) পার্থ কুমার পণ্ডিত, উপপ্রধান প্রশিক্ষক (ডিজিএম পদমর্যাদার) নাজমুল হুদা ও আলী নাসের। বিমানের প্রকৌশল শাখার কর্মকর্তাদের প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে প্রশিক্ষণের নামে বিদেশে সফরের অভিযোগ নতুন নয়। এ শাখার এখন প্রধান হলেন গাজী মাহমুদ ইকবাল। তিনি গত এপ্রিলে পদোন্নতি পেয়ে প্রধান প্রকৌশলী হন। একই সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের (প্রকৌশল) দায়িত্বও পান। এরপর মে মাস পর্যন্ত দেশে ছিলেন। জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসেই কমবেশি দেশে বা বিদেশে ভ্রমণে ছিলেন। এখন আবার ৪৭ দিনের জন্য তিনি সিঙ্গাপুরে যাবেন। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গাজী মাহমুদ ইকবালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে বিমানের মুখপাত্রের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। বিমান সূত্র জানায়, ‘ড্রিম লাইনার’ হিসেবে পরিচিত বোয়িং ৭৮৭ উড়োজাহাজ আরও চারটি যুক্ত হচ্ছে বিমানবহরে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাণ কোম্পানি বোয়িংয়ের সঙ্গে মোট ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়। এর সর্বশেষ চালান এই চারটি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে প্রথমটি আসবে আগামী আগস্টে, দ্বিতীয়টি আসবে নভেম্বরে। বাকি দুটি আসবে ২০১৯ সালে। ভবিষ্যতে এই চারটি উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিমানের প্রকৌশলী প্রশিক্ষণে (বি-১ ও বি-২) পাঠানো হচ্ছে সিঙ্গাপুরে। সেখানে বোয়িং কোম্পানির প্রকৌশল প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এ প্রশিক্ষণের জন্য সাতটি ব্যাচ (দল) যাবে। প্রতি ব্যাচে ১৬ জন করে মোট ১১২ জন যাওয়ার কথা। কিন্তু যাচ্ছেন ১১৯ জন। যাঁদের মধ্যে সাতজন ‘অবজারভার’ বা পর্যবেক্ষক নাম দিয়ে যাচ্ছেন। প্রতি ব্যাচে বা ক্লাসে ১৬ জনের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা রয়েছে, যাঁরা প্রশিক্ষণ উপাদান পাবেন এবং পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন। পাস করলে সনদ পাবেন এবং পরবর্তী সময়ে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করবেন। এখন প্রতি ব্যাচে পর্যবেক্ষকের নামে আরও একজনকে পাঠানো হচ্ছে, তাঁদের জন্য ক্লাসে অতিরিক্ত চেয়ার দেওয়া হলেও তাঁরা পরীক্ষা দিতে পারবেন না, সনদও পাবেন না। এর মধ্যে আজ সোমবার প্রথম ব্যাচ সিঙ্গাপুরে যাওয়ার কথা। বিমানের প্রশিক্ষণ নীতিমালা অনুযায়ী, বিদেশে এ ধরনের প্রশিক্ষণে যাঁরা যাবেন, তাঁদের চাকরি অন্তত পাঁচ বছর থাকতে হবে। প্রশিক্ষণের যাওয়ার আগে তাঁদের ২০ লাখ টাকার লিখিত অঙ্গীকারনামা দিতে হবে। পাঁচ বছর আগে চাকরি ছাড়লে সে টাকা ফেরত দিতে হবে। অথচ এবার প্রথম ব্যাচে যিনি পর্যবেক্ষক হিসেবে যাচ্ছেন, সেই প্রধান প্রকৌশলী (প্রোডাকশন) মো. হানিফের চাকরির মেয়দ আছে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত। জানা গেছে, হানিফসহ পর্যবেক্ষক হিসেবে যাঁরা যাচ্ছেন, তাঁদের কারও কাছ থেকে ২০ লাখ টাকার অঙ্গীকারনামা নেওয়া হচ্ছে না, যদিও বাকিদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে। তাহলে কেন বিমানের অর্থের অপচয় করে এসব ব্যক্তিকে ৪১ থেকে ৪৭ দিনের জন্য (প্রশিক্ষণ বি-১ ৪৭ দিনের ও বি-২ ৪১ দিন মেয়াদে) বিদেশে পাঠানো হচ্ছে—এ বিষয়ে বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া হলে বিমানের মুখপাত্র ও জনসংযোগ শাখার মহাব্যবস্থাপক (জিএম) শাকিল মেরাজ বলেন, পর্যবেক্ষক হিসেবে যাঁরা যাচ্ছেন, তাঁরা প্রতি ব্যাচে দলনেতা হবেন। তাঁরা প্রশিক্ষণে উপস্থিত থাকার সনদ পাবেন। কিন্তু তাঁরা পরীক্ষায় বসবেন না, কোর্স সমাপনী সনদ পাবেন না। তিনি বলেন, এই সাতজনের চারজন বিমান প্রকৌশল শাখার, তাঁরা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের। তাঁরা উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ করবেন না, এটা ঠিক। কিন্তু মেরামতের যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত তাঁরা দেবেন। এ জন্য তাঁদের কারিগরি জ্ঞান থাকা দরকার। তবে বিমানের প্রকৌশল শাখার গুরুত্বপূর্ণ একাধিক সূত্র বলছে, কর্তৃপক্ষের এই যুক্তি ঠিক নয়। এর আগে বিমান বোয়িং কোম্পানি থেকে বি-৭৩৭ ও বি-৭৭৭-এর মতো অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ কিনেছে। নিয়ম অনুযায়ী বোয়িং কোম্পানি শুরুতে নিজস্ব বৈমানিক ও প্রকৌশলী দিয়ে সেগুলো এ দেশে পরিচালনায় সহায়তা করে। হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ (অন জব ট্রেনিং) দেয়। এভাবে অন্তত এক বছর পর বিমানের নিজস্ব প্রকৌশলীরা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বুঝে পান। সামনে বোয়িং ৭৮৭-এর ক্ষেত্রেও তা-ই হবে। তত দিনে যাঁদের চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে বা যাঁদের চাকরির মেয়াদ ন্যূনতম পাঁচ বছর থাকবে না, তাঁদের এ প্রশিক্ষণে পাঠানো অপচয়। এ ছাড়া বিএটিসি (বিমান এয়ারলাইন ট্রেনিং সেন্টার) থেকে আটজন শিক্ষক বা প্রশিক্ষককে পাঠানো হচ্ছে। সেখান থেকে আরও তিনজনকে কেন পর্যবেক্ষক কোটায় বিদেশে পাঠানো হচ্ছে, সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এর বাইরে মূলত উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ করবেন লাইন মেইনটেন্যান্স ও বেইস মেইনটেন্যান্স শাখার প্রকৌশলীরা। কিন্তু এর বাইরেও অনেককে পাঠানো হচ্ছে। সেটা কেন, সেই জবাবও পাওয়া যায়নি।

No comments:

Post a Comment