
ভারতের
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আরও একবার তুলাধোনা করলেন কংগ্রেসের
সভাপতি রাহুল গান্ধী। বললেন, ‘আপনার নীরবতা এটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে আপনি কাদের
রক্ষাকর্তা। রাহুল এই আক্রমণ শাণালেন সেই দিন, যেদিন ভারতের আরও এক
শিল্পপতি ‘রোটোম্যাক’ কলম কোম্পানির মালিক বিক্রম কোঠারিকে একাধিক
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রায় ৪ হাজার কোটি রুপি হাতানোর অভিযোগে সিবিআই
গ্রেপ্তার করল। ভারতে অভূতপূর্ব ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনা হঠাৎই নজরে আসা শুরু
হয়েছে। পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের সাড়ে ১১ হাজার কোটি রুপি তছরুপ করে
সপরিবারে দেশ ছেড়েছেন হীরা ব্যবসায়ী নীরব মোদি ও তাঁর মামা মেহুল চোকসি।
এই তছরুপ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজশের
চাপানউতর অব্যাহত থাকলেও নরেন্দ্র মোদি এখনো চুপ। চুপ তাঁর অর্থমন্ত্রী
অরুণ জেটলিও। দুদিন আগে এই কারণেই মোদির উদ্দেশে রাহুল বলেছিলেন, ‘দুই
ঘণ্টা ধরে ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষায় পাস করা নিয়ে জ্ঞান বিতরণ করতে পারেন,
অথচ এত বড় ব্যাংক জালিয়াতি নিয়ে দুই মিনিটও কথা বলতে পারেন না। মাননীয়
প্রধানমন্ত্রী, অপরাধীর মতো আচরণ না করে বরং মুখ খুলুন।’ গতকাল সোমবার
আবার টুইট করে রাহুল লেখেন, ‘প্রথমে ললিত, তারপর মালিয়া, এবার নীরবও ফেরার।
কোথায় দেশের চৌকিদার? যিনি বলেছিলেন, না খাউঙ্গা না খানে দুঙ্গা?’
নির্বাচনে জেতার পর প্রধানমন্ত্রী হয়ে নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন,
প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি দেশের চৌকিদার। প্রধান সেবক। বলেছিলেন, নিজে ঘুষ
খাবেন না, কাউকে ঘুষ খেতেও দেবেন না। গতকাল রাহুল কটাক্ষ করলেন সেই
চৌকিদারকেই। হীরা ব্যবসায়ী নীরব মোদি ও তাঁর মামা দেশ ছাড়ার পর একাধিক
প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। প্রথম প্রশ্ন, মামা-ভাগনের কারসাজিতে রাষ্ট্রায়ত্ত
ব্যাংকগুলোর মোট ক্ষতির পরিমাণ কত। শুধু পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকেরই
ক্ষতি সাড়ে ১১ হাজার কোটি রুপি। অন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ধরলে ক্ষতির
পরিমাণ ২২ হাজার কোটি রুপি ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। দ্বিতীয় প্রশ্ন,
সোনা-হীরার ব্যবসায় এই জালিয়াতি ধরা পড়ার পর এই শিল্পে ব্যাংকের ঋণ পাওয়া
কতখানি অসুবিধাজনক হয়ে দাঁড়াবে। সে ক্ষেত্রে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত
মানুষদের হাল কী হবে। তৃতীয় প্রশ্ন, দায়ভার কেন ব্যাংকের চেয়ারম্যানদের ওপর
বর্তাবে না? সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতারই বা কী হবে? যেহেতু
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যানদের নিযুক্তি সব সময় রাজনৈতিকভাবে হয়ে
থাকে। চতুর্থ প্রশ্ন, এত দিন ধরে চলা জালিয়াতির কুশীলবেরা কী করে সবার নজর
এড়িয়ে দেশ ছেড়ে চলে গেলেন, যদি না রাজনৈতিক মদদ থাকে? কংগ্রেস এই
প্রশ্নগুলোই বড় করে তুলে ধরছে।
আইপিএল খ্যাত ললিত মোদি, ৯ হাজার কোটি
রুপি ব্যাংককে শোধ না করে পালিয়ে যাওয়া শিল্পপতি বিজয় মালিয়া এবং
নীরব-চোকসির দেশ ছাড়ার পেছনে বিজেপির নেতাদের ‘ষড়যন্ত্রের’ ইঙ্গিত পাচ্ছে
কংগ্রেস। প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীর হিরণ্ময় নীরবতা সেই প্রশ্নগুলো
অর্থবহ করে তুলছে। এই মুহূর্তের অন্য প্রশ্ন, আদৌ কি ওই ব্যক্তিদের দেশে
ফেরত আনা যাবে? পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে প্রস্তুত
নয়। মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলেছে, এই মুহূর্তে মোট ৪২টি দেশের সঙ্গে
ভারতের প্রত্যর্পণ (এক্সট্রাডিশন) চুক্তি রয়েছে। এ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে
অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, বেলজিয়াম, ব্রাজিল, কানাডা, মিসর, ফ্রান্স,
জার্মানি, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, স্পেন, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য,
যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি। এ ছাড়া প্রত্যর্পণ ব্যবস্থা রয়েছে ৯টি দেশের সঙ্গে। এ
দেশগুলোর মধ্যে ইতালি ও ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে প্রত্যর্পণ ব্যবস্থা রয়েছে
শুধু মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে। এতগুলো দেশের সঙ্গে প্রত্যর্পণ
চুক্তি থাকলেও অপরাধীদের ফেরত পাওয়া সহজ নয়। এর একটা কারণ, ভারতে
মৃত্যুদণ্ড এখনো বলবৎ রয়েছে। অন্য কারণ, যে অপরাধ করে কেউ পলাতক,
আশ্রয়দাতা দেশের আইনে তা অপরাধ বলে গণ্য হয় কি না। স্পেন থেকে সন্ত্রাসবাদী
আবু সালেমকে ভারত ফেরত পেয়েছিল মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে না, এই প্রতিশ্রুতি
দেওয়ার পর। তা ছাড়া সেখানে আন্তর্জাতিক চাপও ছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের
একটি সূত্রের কথায়, দেড় দশক ধরে যতজনকে ভারত ফেরত চেয়েছে, তার অধিকাংশ
আবেদনই নাকচ হয়েছে। বিশেষত যাঁদের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ
রয়েছে। যেমন ললিত মোদি। যেমন ক্রিকেট বেটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত সঞ্জীব চাওলা।
অথবা শিল্পপতি বিজয় মালিয়া। এই তিনজনই দেশ ছেড়ে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নিয়েছেন।
বিজয় মালিয়ার বিরুদ্ধে আবেদনের শুনানি যুক্তরাজ্যের যে বিচারপতির এজলাসে
চলছে, তিনি এর আগে ব্যাংক জালিয়াতির অভিযোগে পলাতক আশা আঙ্গুরালা ও
জিতেন্দ্র আঙ্গুরালার প্রত্যর্পণের আবেদন খারিজ করেছেন। মালিয়ার আইনজীবীদের
দাবি, ভারতের কারাগারগুলো অপরাধীদের রাখার পক্ষে উপযুক্ত নয়। প্রত্যর্পণের
ক্ষেত্রে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয় মানবাধিকার ও রাজনীতি। রাজনৈতিক
আশ্রয়প্রার্থীদের ফিরিয়ে আনা এক কথায় অসম্ভব। এই পরিস্থিতিতে নীরব মোদি,
মেহুল চোকসিদের জন্যও ভারত সরকারকে সেই কাঠখড় পোড়াতে হবে, যা এত দিন ধরে
করতে হচ্ছে ললিত মোদি, সঞ্জীব চাওলা বা বিজয় মালিয়াদের জন্য। সেই অবসরে
অব্যাহত থাকবে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতর।
No comments:
Post a Comment