Tuesday, April 15, 2014

সংস্কৃতির অনতিক্রমনীয় দেয়াল ভাঙতে হবে by ফজলুল আলম

বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ও পার্থক্য নিয়ে আমরা সবাই কম বেশি সচেতন। আমরা মনে করি অনাদিকাল থেকেই এই বৈশিষ্ট্যগুলো চলে আসছে, সুতরাং এসব থাকবেই। আমরা আরো মনে করি সংস্কৃতি বিশুদ্ধ একটা কিছু যা অপরিবর্তিত রাখা প্রয়োজন। এই ধারণা আংশিক সত্য- পুরো সত্য নয়। পুরো সত্য হচ্ছে যে সংস্কৃতির উপাদানে নৃ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য কিছু থাকে, কিন্তু একটি জাতিগোষ্ঠীর মূল সংস্কৃতির ধারা গড়ে ওঠে সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক উপাদান থেকে। 
নৃ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা বেশি, কিন্তু বাকি উপাদান সময়ের  সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে যায়। এই কারণে নৃ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এবং সংস্কৃতি এক পাত্রে স্থায়ীভাবে রাখা যায় কি না সে বিষয়ে সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে ভাবিত বিদ্বজ্জনেরা যথেষ্ট সন্দিহান।
আধুনিক ও সমসাময়িক বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল। দেশে দেশে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। আমাদের এই দরিদ্র লাঙ্গল-হাল-বলদের ও গরুর গাড়ির দেশে এই সব আদি প্রযুক্তির চলন প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকলেও সর্বত্র আর নেই। নদী-মাতৃক দেশ আর নদী-মাতৃক নেই। বাঙালিত্ব আর মাছ আর দুধে-ভাতে বিকশিত হয় না। এমন কি আমাদের ভাষাও আর নির্ভেজাল নেই- ইংরেজি হিন্দির আগ্রাসনে মুখের ভাষাও পর্যদুস্ত। আমরা যাদের ‘আদিবাসী‘ বলি সেসব সাংস্কৃতিক নৃ-গোষ্ঠী পর্যন্ত বাঙালি প্রাধান্যে তাদের অনেক বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। এই সব নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে ‘অগ্রসর’ কয়েকটি নৃ-গোষ্ঠী দেশের সর্বত্র বাঙালিদের সঙ্গে শিক্ষা, বুরোক্রেসি, পেশাগত কর্ম (যেমন ডাক্তারি, নার্সিং) ও আরো অনেক ক্ষেত্রে পদচারণ করছে। তাদের তুলনায় অনেক নৃ-গোষ্ঠী পিছিয়ে আছে, তারা এখনও প্রায় আদিম অবস্থায় আছে এবং তাদের দুর্বলতার সুযোগে তাদের যৎসামান্য সম্পত্তিও ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে। এই গোষ্ঠীর অনেকে ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে শহরে চলে এসে আরো বিপর্যয়ের মধ্যে সামান্য মজুরিতে কায়িক শ্রমে নিয়োজিত হতে বাধ্য হয়েছে। মনে হয় ধীরে ধীরে এরা বিলীন হয়ে যাবে।
এ অবস্থায় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কি করণীয়? অথবা কিছু করণীয় আছে কি? সাধারণত ধারণা করা হয় যে বাঙালিত্ব বজায় রাখতে হবেই, সেই সঙ্গে সাংস্কৃতিক নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যও রক্ষা করতে হবে। এই সদিচ্ছা শুনতে খুবই ভালো লাগে, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় দুটোই দারিদ্র্য-নির্ভর। বাঙালিত্বের আদি পরিচয় এখন দরিদ্র আর্থ-সামাজিক ও প্রযুক্তিহীনতার পরিচয়। শিক্ষাদীক্ষা ও প্রযুক্তিতে অগ্রসর বাঙালি ‘আধুনিক’ হয়েছে, এবং অতীতের দারিদ্র্যবিজড়িত কিন্তু মোহাচ্ছন্ন চিত্র তারা অবশ্যই বিসর্জন দিয়েছে। শুধু শহরে নগরে নয়, সেলফোন ও আকাশ সংস্কৃতি নামের কেব্‌ল টেলিভিশান গ্রামেগঞ্জে বাঙালিত্বের কিছুই আর রাখছে না। বিলাপের মতো করে বললেও আমি মানছি যে চলমান যুগের ব্যবসা-বাণিজ্যের আন্তর্জাতিকতার সঙ্গে এসব ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এই অবস্থার জন্য জনগণের চাওয়া ও প্রত্যাশা কাজ করে না, কাজ করে তাদের মধ্যে ‘চাওয়া ও প্রত্যাশা’ সুচতুরভাবে সৃষ্টি করার কলকবজা। এমন কি ইনটারনেটের মতো একটা শক্তিশালী শিক্ষা মাধ্যম এখন সামাজিক আলাপচারিতা ও সংগীত-ভিডিও ইত্যাদিতেই বেশি অবদান রাখছে। অতীতের বাঙালিত্ব বজায় রাখা এ অবস্থায় কঠিন বটে। অনুরূপভাবে বাঙালি ছাড়া অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর আর অতীত নিয়ে পড়ে থাকার অবকাশ নেই। তাদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে তাদেরও নতুন সময়ের দিকে অগ্রসর হতে হবে, অনেকে অগ্রসর হয়েছেও।
রাষ্ট্রীয়ভাবে এ অবস্থায় নীতিমালা গ্রহণ করা আছে অনেকটা পাশ্চাত্যের ‘মাল্টি-কালচারালিজম’ অর্থাৎ ‘বিবিধ সংস্কৃতির স্বীকৃতি প্রদান ব্যবস্থা’র আদলে। এ নীতিমালায় যে যার সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে থাকবে; ধারণা করে নিতে হবে বিভিন্ন সংস্কৃতি প্রতিটিই মূল্যবান এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে তুলনা করা যায় না। শুনতে খুবই ভাল লাগে, কিন্তু এর মধ্যে অনেক ফাঁকফোঁকর আছে। এই নীতি প্রথমে তৈরি হয়েছিল কানাডায় দুটি বিবদমান ইউরোপিয়ান জাতির সমস্যা মিটাতে; তারা ছিল ফ্রেঞ্চ কানাডিয়ান ও ব্রিটিশ (মূলত ইংলিশ) কানাডিয়ান। এর সঙ্গে কানাডার আদিবাসীদের অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে কানাডা যাদের দেশ, তাদের ম্বার্থ দেখা উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু পরে দেখা গেল এই নীতিমালায় কানাডিয়ান আদিবাসীদের তাদের অতীতের সংস্কৃতির মোহের মধ্যে রাখতে পারলে জাতীয় জীবনের মূলধারায় তাদের উপস্থিতি কমবেই। এই দ্বিতীয় কারণেই ইউরোপে বিগত শতকের সত্তর দশকে মহাসমারোহে ‘মাল্টি-কালচারালিজম’ নীতিমালা গৃহীত হয়। ফলে এসব দেশে বহিরাগত যারা ইউরোপিয়ান নয় তারা এই নীতিমালার আওতায় নিজেদের সংস্কৃতি সংরক্ষণে সরকারি সহায়তা পায়, যেমন স্কুলে তাদের ভাষা শেখা, স্বীয় দেশের পালা-পার্বণ উদযাপন করার আর্থিক সুবিধা, ইত্যাদি। ইংল্যান্ডে বাঙালিদের উদাহরণ নিয়ে বলা যায় যে এই নীতিমালার কারণে সেখানে স্কুলে বাংলা পড়ানো শুরু হয়, সরকারি আর্থিক অনুদানে বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় ‘একুশে‘ও ‘বাংলা নববর্ষ’ পালিত হয়। বাংলা রেডিওতে সরকারি অনুদান আগেই ছিল, এখন বাংলা টেলিভিশান চ্যানেলেও সরকার আর্থিক ও কাঠামোগত সহায়তা দেয়। এর ফলে শিক্ষিত বাঙালিরা এবং সেদেশে বড় হওয়া নতুন প্রজন্ম নিজের দেশীয় গ-ির মধ্যে থাকতে উৎসাহিত হওয়ার কথা। প্রথম পর্যায়ে তাই হচ্ছিল, কিন্তু এক থেকে দুই দশকের মধ্যেই বাঙালি নতুন প্রজন্ম উপলব্ধি করলো পাশ্চাত্যের শিক্ষাদীক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ও অন্যান্য ক্ষেত্রে তারা মূলধারায় যেতে পারছে না এই ‘মাল্টি-কালচারালিজম‘ নীতিমালার জন্যই। এই নীতিমালার সুবিধা নিয়ে ‘কমিউনিটি’ সেবায় অনেক শিক্ষিত বাঙালির কর্মসংস্থান হচ্ছিল ও ষাটদশকে কর্মহীন হয়ে পড়া প্রথম অভিবাসী বাঙালিরাও এতে উপকৃত হয় ঠিকই, কিন্তু নতুন প্রজন্ম সেসবের ওপর স্থবির হয়ে বসে থাকতে চায়নি। তারা এখন মুল ধারায় যেতে চায়, ‘এথনিক মাইনোরিটি’ হিসেবে নয়, নিজেদের বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞানের জোরে। অনেক বাধা বিপত্তি বিশেষ করে বর্ণবাদের মতো শত্রুকে মোকাবেলা করে তারা ঠিকই এগিয়ে যাচ্ছে। এদের অনেকে পারিবারিক অভ্যাস ও গোষ্ঠীর আচার-ব্যবহারে বাঙালি থাকলেও বাইরের জগতে তারা ‘ব্রিটিশ’; এমন কি ‘ব্রিটিশ বাঙালি’ অভিব্যক্তিও তারা পছন্দ করে না।
এসব কথা বলার পরে আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় আবার ফিরে যাই। সত্যি বলতে কি আমাদের দেশের সংখ্যালঘু  সাংস্কৃতিক নৃ-গোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্রীয় নীতিমালা অত্যন্ত দুর্বল। নামে যাই হোক সেটা প্রকৃতপক্ষে পৃষ্ঠপোষকতা বা পিঠ চাপড়ানোর মতো, যেমন চাকরির ক্ষেত্রে ‘আদিবাসী কোটা’ ইত্যাদি। এখানে উপরোল্লিখিত ‘মাল্টি-কালচারালিজমে‘র ছায়া। রাষ্ট্র এই সাংস্কৃতিক নৃ-গোষ্ঠীগুলোকে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতেই এই নীতিমালা নিয়েছে। রাষ্ট্র ঠিকই জানে যে এদের সংস্কৃতি বজায় রাখার নামে এদেরকে মূল ধারায় না আনলে প্রধান নৃ-গোষ্ঠীর (অর্থাৎ বাঙালি) প্রতাপশীল ব্যক্তিরা ফায়দা লুটতে পারবে। পার্বত্য এলাকার যে কয়েকটা সাংস্কৃতিক নৃ-গোষ্ঠীর নাম আমরা জানি তাদের মধ্যে  থেকে অনেক ব্যক্তি আমাদের মূলধারায় প্রবেশ করেছে, কিন্তু আরো চল্লিশটির বেশি সাংস্কৃতিক নৃ-গোষ্ঠীর হদিস আমাদের জানা নেই (যারা এ বিষয়ে গবেষণা করেন, তাদের নথিপত্রে ছাড়া), এবং তাদের অনেককে বাঙালিরা অচ্ছুৎ মনে করে। সংস্কৃতি সর্বদা এক থাকে না, বর্তমান পৃথিবীতে অতীতের পরিচয় ধরে বসে থাকা আর সম্ভব নয়। কিন্তু বিশ্বের রাজনৈতিক কারণেই আমাদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রক্ষার তাগিদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এই সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বজায় থাকলে একটি দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিকভাবে যে বিভাজন রইবে সেটাই কাম্য। এক সময় শ্রেণী বিভাজনকে আক্রমণ করা হয়- সেটা মনে করা হতো অর্থনৈতিক। সাংস্কৃতিক বিভাজনটি সামাজিক, কিন্তু সেটা অর্থনৈতিক না হয়েও সর্বরকমে সমাজ, গোষ্ঠী, সম্প্রদায় ও ব্যক্তির মধ্যে বৈষম্য গড়ে তোলে। এখানেই সংস্কৃতিকে অতিক্রম করা যায় না।
এটা উপলব্ধি করে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক মহলকে দাবি করতে হবে সাংস্কৃতিক নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে নয়, একটা দেশের সব নাগরিককে সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে সমান মর্যাদা ও সুযোগসুবিধা প্রদান করতে হবে। তাহলেই সমস্যাটির সমাধান হবে। সংস্কৃতির দেয়াল অতিক্রম করতে হলে সংস্কৃতিকে পুরোভাগে আনা যাবে না, সৃষ্টি করতে হবে দেশজুড়ে একক জাতিসত্তা। জাতপাত, ধর্ম, বর্ণ- এসবকে অগ্রাধিকার না দিয়ে আমরা সবাই এক দেশের নাগরিক এই নীতিমালায় রাষ্ট্রকে উদ্বুদ্ধ করতে পারলেই সংস্কৃতির দেয়াল অতিক্রম করা সম্ভব হবে।                                                লেখক: প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতি গবেষক

No comments:

Post a Comment