ভারতে ইসলামী শাসনামলে হিজরি পঞ্জিকা
অনুসারেই সকল কাজকর্ম পরিচালিত হতো। মূল হিজরি পঞ্জিকা চান্দ্র মাসের উপর
নির্ভরশীল। চান্দ্র বৎসর সৌর বৎসরের চেয়ে ১১-১২ দিন কম হয়। কারণ সৌর বৎসর
৩৬৫ দিন, আর চান্দ্র বৎসর ৩৫৪ দিন। একারণে চান্দ্র বৎসরে ঋতুগুলো ঠিক থাকে
না।

আর
চাষাবাদ ও এ জাতীয় অনেক কাজ ঋতুনির্ভর। এ জন্য ভারতের মোগল সম্রাট আকবরের
সময়ে ইরান থেকে আগত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমির ফতেহউল্লাহ
শিরাজীকে হিজরি চান্দ্র বর্ষপঞ্জীকে সৌর বর্ষপঞ্জীতে রূপান্তরিত করার
দায়িত্ব প্রদান করেন। আমির শিরাজির সুপারিশে পারস্যে প্রচলিত সৌর
বর্ষপঞ্জীর অনুকরণে ৯৯২ হিজরি মোতাবেক ১৫৮৪ খৃস্টাব্দে সম্রাট আকবর হিজরি
সৌর বর্ষপঞ্জীর প্রচলন করেন। তবে তিনি ঊনত্রিশ বছর পূর্বে তার সিংহাসন
আরোহণের বছর থেকে এ পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন। এ জন্য ৯৬৩ হিজরি সাল
থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। ইতিপূর্বে বঙ্গে প্রচলিত শকাব্দ বা শক
বর্ষপঞ্জীর প্রথম মাস ছিল চৈত্র মাস। কিন্তু ৯৬৩ হিজরি সালের মহররম মাস ছিল
বাংলা বৈশাখ মাস, এ জন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জীর
প্রথম মাস এবং ১লা বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়। আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা
বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল
খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। এর পরদিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির
মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ
উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে
পরিণত হয়। এভাবে হিজরি মাসের স্থলে বাংলা মাসের প্রাধান্য আসতে থাকে। আসে
হালখাতা অনুষ্ঠান। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব বই বোঝানো হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হলো বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাঠের হিসাব
আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা,
সকল স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। মুঘলদের
পর ইংরেজরা ক্ষমতায় এলে স্থানীয় শিক্ষিত বাঙালি সমাজ ও কলকাতার
বুদ্ধিজীবীগণ আধুনিকভাবে এবং নিজস্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বোধের মাধ্যমে বাংলা
নববর্ষ উদযাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া
যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা
বৈশাখে হোম কীর্ত্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ
কর্মকা-ের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সনের আগে ঘটা করে পহেলা
বৈশাখ পালনের রীতি শুরু হয়। এখন নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর
কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ ঘটানো হয়েছে। গ্রামের মিলিত এলাকায়,
কোন খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। মেলাতে থাকে নানা রকম কুটির
শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন, থাকে নানারকম পিঠা-পুলির আয়োজন। অনেক স্থানে ইলিশ
মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি
হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে থাকে নৌকাবাইচ, লাঠিখেলা
কিংবা কুস্তি। বাংলাদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসর বসে ১২ই বৈশাখ,
চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে। এটি জব্বারের বলি খেলা নামে পরিচিত। রাজধানী
ঢাকা শহরে পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন
ছায়ানট-এর গানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহ্বান। পহেলা বৈশাখ
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের নারী ও পুরুষ শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গান
গেয়ে নতুন বছরকে আহ্বান জানান। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃতপক্ষে
যে গাছের ছায়ায় মঞ্চ তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয়, অশ্বত্থ গাছ। ১৯৬০-এর দশকে
পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গান-বাজনা-সংস্কৃতি দিয়ে রবীন্দ্রনাথের
গান ও জীবনকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্যোগী হয় ছায়ানট এবং ১৯৬৭ সাল থেকে
ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা করে, যা এখন বিশাল আকৃতি ধারণ করেছে।
ঢাকার বৈশাখী উৎসবের একটি আবশ্যিক অঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখে সকালে এই
শোভাযাত্রাটি বের হয়। শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা
ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন, জীবজন্তু এবং আবহমান
বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রায় সকল শ্রেণী-পেশার বিভিন্ন বয়সের
ধর্মনিরপেক্ষ-অসামপ্রদায়িক মানুষ অংশগ্রহণ করে। শোভাযাত্রার জন্য বানানো নয়
রং-বেরঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি। সূচনার পর থেকে নানা
বিবর্তনে বাংলা নববর্ষ লাভ করেছে বর্তমান রূপ।
No comments:
Post a Comment