দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে শ্রমিকশ্রেণী যে আন্দোলন সংগ্রাম করেছিল,
তার সুফল অবশ্যই বিশ্বের শ্রমিকদের কাছে পৌঁছেছে। শ্রমিকদের জীবন স্তরের
উন্নতি— দেশ, জাতি ও সমাজের বিকাশ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে
সম্পর্কিত। তাই দেখা যায়, বিশ্বমন্দা পরিস্থিতির কারণে খোদ আমেরিকাতেই
শ্রমিকরা চাকরি হারাচ্ছে। অনেক কলকারখানা তাদের কার্যক্রম সংকুচিত করে
এনেছে। শ্রমিকদের বেতনও হ্রাস পেয়েছে।

১৮৮৬ সালে মার্কিন শ্রমিকদের
জীবনদানের মধ্য দিয়ে শ্রমিকরা দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেয়েছিল। আর তা
সম্ভব হয়েছিল বলেই শ্রমিকরা ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন করাসহ বহু সুযোগসুবিধা
পেয়েছে। উন্নত বিশ্বের শ্রমিকদের জীবনাযাত্রার মানও উন্নততর হয়েছে। কাজের
সময়সীমা আট ঘণ্টা করার দাবিতে বিশ্বের প্রথম শ্রমিক ধর্মঘট হয়েছিল
বঙ্গদেশেই; ১৮৬২ সালের মে মাসে। অর্থাৎ শিকাগোর ঘটনার ২৪ বছর আগে রেলওয়ে
শ্রমিকরা এই ধর্মঘটে অংশ নেয়। তাদের দাবি ছিল, একই প্রতিষ্ঠানের শ্রম ও
কর্মঘণ্টা অভিন্ন করা। রেলওয়ের কোনো কোনো বিভাগের শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা, আবার
কোনো কোনো বিভাগ ১০ ঘণ্টা কাজ করতো। এই বৈষম্য দূর করার জন্য হাওড়া
রেলস্টেশনের ১২০০ রেলশ্রমিক ধর্মঘট ডেকেছিল। তারা ১০ ঘণ্টার বদলে ৮ ঘণ্টা
কাজের দাবিতে এই ধর্মঘট বেশ কয়েকদিন বহাল রেখেছিল। কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি
মেনে নেয়। দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘সোম প্রকাশ’ পত্রিকার
২৩ বৈশাখ; ১২৬৯ বাংলা সন ও ৫ মে ১৮৫২ সালে প্রকাশিত সংখ্যার ৩০৫ পৃষ্ঠায়
‘বিবিধ সংবাদ’ শিরোনামে খবরটি ছাপা হয়েছিল। এতে লেখা হয় ‘সম্প্রতি হাবড়ার
রেইলওয়ে স্টেশনে প্রায় ১২০০ মজুর কর্মত্যাগ করিয়াছে। তাহারা বলে লোকোমোটিব
ডিপার্টমেন্টের মজুরেরা প্রত্যহ ৮ ঘণ্টা কাজ করে। কিন্তু তাহাদিগকে ১০
ঘণ্টা পরিশ্রম করিতে হয়। কয়েক দিবসাবধি কার্য্য স্থগিত রহিয়াছে। রেইলওয়ে
কোম্পানি মজুরদিগের প্রার্থনা পরিপূর্ণ করুন। নচেৎ লোক পাইবেন না।’ অর্থাৎ
শ্রমিকদের দাবি মেনে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ধর্মঘটের কারণে ছাঁটাই করা
হলে নতুন দক্ষ লোক পাওয়া যে সহজ সাধ্য হবে না, তা শাসক ব্রিটিশ সরকার
উপলব্ধি করেছিল। যে কারণে বঙ্গদেশে শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের অধিকার পায়
রেলওয়েতে। সংগঠিত ক্ষেত্রে আধুনিক শিল্প শ্রমিকদের কাজের ঘণ্টা কমানোর
দাবিতে আন্দোলনের এটাই প্রথম নথিভুক্ত ঘটনা। অবশ্য রেল ধর্মঘটের আগে
বঙ্গদেশে আরো দু’টি ধর্মঘট হয়েছিল। ১৮২৩ সালে বাংলাদেশের পালকি বেহারারা
কর্মবিরতি পালন শুরু করে। সে সময় ইংরেজরাও পালকি ব্যবহার করতেন। তারাও
কর্মঘণ্টা নির্ধারণের দাবি করে ব্যর্থ হয়েছিল। কারণ এই ধর্মঘটের কোনো
সংগঠিত রূপ ছিল না। ১৮৩৫ সালে এদেশে আরো একটি ধর্মঘট হয়। নদী পরিবহনের
সঙ্গে যুক্ত মালবাহকরা ধর্মঘট করেছিল। এটিরও ছিল না কোনো সংগঠিত রূপ। শুধু
শ্রমিক ধর্মঘট নয়, বঙ্গদেশ থেকেই প্রথম শ্রমজীবী মানুষের জন্য বেরিয়েছিল
পত্রিকা ‘ভারত শ্রমজীবী।’ ব্রাহ্ম সমাজ ছিল এর নেপথ্যে। শ্রমজীবী মানুষের
দুঃখ-দুর্দশা মোচন, তাদের আত্মিক উন্নতি ঘটানো এবং তাদের মধ্যে নৈতিক
মূল্যবোধ জাগ্রত করার লক্ষ্য নিয়ে ১৮৫৩ সালে শশিপদ বন্দ্যোপাধ্যায় মাসিকটির
প্রকাশনা শুরু করেন। পত্রিকার পাশাপাশি চটকল শ্রমিকদের জন্য সেভিংস ব্যাংক
চালু, শ্রমিক বস্তিতে নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল। শ্রমিকদের জীবন মান
উন্নত করা ও চেতনা সঞ্চারের কাজটি মূলতঃ বঙ্গদেশেই শুরু হয়েছিল বলা যায়। ১৮৮৬
সালের ১ মে শিকাগো শহরের হে মার্কেটে শ্রমিক সমাবেশে গুলি চালানো হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে পড়ে। এসময় সংবাদপত্রগুলো শ্রমিকদের
বিরুদ্ধে বিষোদগার চালায়। এমনকি তাদের গ্রেফতার ও শাস্তি দিতে নির্দেশও
দেয়। শ্রমিক নির্যাতন, অসন্তোষ অব্যাহত থাকার মাঝে ৮ জন শ্রমিককে গ্রেফতার
করা হয়। পরে এদের ৪ জনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে
রক্তক্ষয়ী আন্দোলন শুধু আমেরিকায় নয়, ইউরোপের অন্যান্য দেশেও হয়েছে। কেবল
বাংলাদেশেই ছিল রক্তপাতহীন। আটঘণ্টার আগে দশঘণ্টা কাজের দাবিতেও আন্দোলন
হয়েছে। হয়েছে পারী কমিউন, চার্টিস্ট আন্দোলন, লুডাইট আন্দোলন। প্রকৃতপক্ষে
ষোড়শ শতকে ইউরোপে ধনতন্ত্রের আবির্ভাব লগ্ন থেকেই শ্রমজীবী মানুষদের লড়াই
করতে হয়েছে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং নিজেদের অধিকারের ক্ষেত্র
সম্প্রসারিত করতে। বাঁচা-মারার সেই লড়াইয়ের প্রক্রিয়ায় শ্রমিকরা
সামন্ততান্ত্রিক প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে ধনতন্ত্রের বিজয়কেই সুনিশ্চিত
করেছে। এবং বিশ্ব ইতিহাসে সূচনা করেছে সেই বুর্জোয়া গণতন্ত্রের যুগকে। যা
প্রবর্তনে সবচে’ অনিচ্ছুক ছিল বুর্জোয়া সম্প্রদায় নিজেরাই। ষোড়শ শতকে
জার্মনিতে আনাব্যাপাটস্টদের আন্দোলন, সপ্তদশ শতকে ব্রিটেনে লেভেলার ও
ডিগারদের আন্দোলন এবং অষ্টাদশ শতকে ফ্রান্সে সাম্যের জন্য বেবুফপন্থিদের
আন্দোলন সেই শ্রমজীবী মানুষদেরই প্রতিরোধ। যারা সংগঠিত শিল্পশ্রমিকদের
পূর্বসূরী। বিশ্বের প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে ওঠে মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় ১৮২৮ সালে। মেকানিকরা এই সংগঠনের উদ্যোক্তা।
১৮৩০ সালের জুলাইয়ে ফ্রান্সে সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে বুর্জোয়াশ্রেণীর আর এক
দফা ক্ষমতার লড়াই ঘটে। সার্বজনীন ভোটাধিকারের দাবিতে শ্রমিক শ্রেণী এ
লড়াইয়ে ব্যাপকভাবে অংশ নেয়। কিন্তু শিল্প মালিকরা এবারও সামন্ত্রতন্ত্রের
সঙ্গে রফা করে নেয়। প্রতিবাদ প্রতিরোধ অভ্যুত্থান তবু গোটা দশক ধরেই চলতে
থাকে। প্রায়শ তা ব্যারিকেড লড়াইয়ের রূপ নেয়। কিন্তু পিছু হঠতে হয় শ্রমিক
শ্রেণীকে। ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে আছড়ে পড়ে এই জুলাই বিপ্লবের ঢেউ। ব্রিটিশ
শ্রমিকরা নিজেদের রাজনৈতিক দাবির সনদ বা চার্টার রচনা করে গণস্বাক্ষর
চালাতে থাকে। দেশজুড়ে আয়োজিত হতে থাকে বিশাল বিশাল সমাবেশ। গাড়িবোঝাই
স্বাক্ষরিত দরখাস্ত নিয়ে আয়োজিত মিছিল রওনা হয় পার্লামেন্টের দিকে।
নিরস্ত্র মিছিলের ওপর নৃশংস হামলা চালানো হয়। শ্রমিকরা খালি হাতে সেনা
বাহিনীকে প্রতিরোধের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয় এবং এবারও পিছু হটে। ব্রিটিশ
শ্রমিকরা গঠন করে রাজনৈতিক সংগঠন পিপলস চার্টার অ্যাসোসিয়েশন। এদিকে
ইউরোপের সব বড় বড় শহরে থেকে থেকেই রাজপথে মুখোমুখি হতে থাকে শ্রমিক শ্রেণী
No comments:
Post a Comment