গাজীপুরের অসহায়, নিঃস্ব ও ক্ষতিগ্রস্ত
মানুষকে জিম্মি করে ক্ষতিপূরণ বিলের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ
উঠেছে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত
কর্মকর্তাকে বদলির ব্যাপারে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে পর পর তিনবার তাগিদপত্র
পাঠানোর পরও গাজীপুর জেলা প্রশাসক রহস্যজনক ভূমিকায় রয়েছেন বলেও অভিযোগ
তোলা হয়েছে।

অথচ
দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ জেলা প্রশাসক নিজেই ওই ভূমি অধিগ্রহণ
কর্মকর্তাকে বদলির জন্য বিভাগীয় কমিশনারের কাছে অনুরোধ পত্র পাঠিয়েছিলেন।
অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমানকে বদলি প্রসঙ্গে ভূমি
মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সুপারিশপত্র গায়েবের রহস্য উদ্ঘাটন করে সুশাসন
প্রতিষ্ঠায় ব্যবস্থা নিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ে এক আবেদনপত্র জমা দেয়া হয়েছে।
গাজীপুরের কালীগঞ্জের মো. শহীদুল্লাহর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভূমি
প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে তদন্তপূর্বক
ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। মন্ত্রণালয়ে পেশ করা আবেদন পত্রের বিবরণে জানা
যায়, বিগত ৬ বছর ধরে গাজীপুর কালেক্টরের অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা
মোস্তাফিজুর রহমান শাহ ফকির সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দুর্নীতি করে আসছেন। ভূমি
প্রশাসনের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং এলাকার জনভোগান্তি কমানোর যুক্তি
উল্লেখ করে বর্তমান জেলা প্রশাসক গত বছরের ২৩শে জানুয়ারি মোস্তাফিজুর রহমান
শাহ ফকিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে অন্যত্র বদলির জন্য অতিরিক্ত
বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) ঢাকাকে অনুরোধ পত্র পাঠান। সে মতে অতিরিক্ত
বিভাগীয় কমিশনার গত বছরের ৩রা ফেব্রুয়ারি মোস্তাফিজুর রহমানকে বদলির জন্য
ভূমি মন্ত্রণালয়েয়ের সচিবকে অনুরোধপত্র পাঠান। এর পর তাকে বদলির ব্যাপারে
আর কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় মোস্তাফিজুর রহমান ও তার সহযোগীরা ভূমি অধিগ্রহণের
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জিম্মি করে ক্ষতিপূরণের বিল দেয়ার ক্ষেত্রে কোটি
কোটি টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নিতেই থাকেন। মো. শহীদুল্লার আবেদনপত্রে আরও
জানা যায়, এ অবস্থায় গত বছরের ৩রা নভেম্বর এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের
পক্ষে এলাকাবাসীকে দুর্নীতিবাজদের কবল থেকে রক্ষার জন্য মন্ত্রণালয়ের সচিব
বরাবর এক আবেদন দেয়া হয়। পরে তারা জানতে পারেন মোস্তাফিজুর রহমানকে গাজীপুর
ডিসির পাঠানো পত্রের ভিত্তিতে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের সুপারিশ পত্রটি
ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর এই বদলির ব্যাপারে গাজীপুরের
ডিসিকে তার পাঠানো অনুরোধ পত্র এবং এলাকাবাসীর অভিযোগ সম্পর্কে মতামত দেয়ার
জন্য পর পর তিনবার ডাক ও ফ্যাক্স বার্তা যোগে তাগিদ পত্র পাঠানোর পরও
গাজীপুরের ডিসি রহস্যজনক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে নীরবতা
পালন করে যাচ্ছেন। এ সুযোগে ভূমি অধিগ্রহণ অফিসে ক্ষতিগ্রস্তদের
ক্ষতিপূরণের প্রাপ্য বিল উত্তোলনের ক্ষেত্রে নির্বিঘ্নে মাত্রাতিরিক্ত ঘুষ
বাণিজ্যের মহোৎসব অব্যাহত রয়েছে। আবেদনকারীর অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে
জনস্বার্থে ভূমি মন্ত্রণালয় এবং জেলা প্রশাসনে সুশাসন প্রতিষ্ঠাকল্পে
অভিযুক্ত ও জড়িতদের শাস্তি দেয়ার দাবি করা হয়। দুর্নীতির ব্যাপারে মো.
শহীদুল্লাহ মানবজমিনকে জানান, তার ভাইজি জামাই ওই অফিসে থেকে ক্ষতিপূরণের
১৪ লাখ টাকা বিল উত্তোলন করতে গিয়ে দু’লাখ টাকার বেশি ঘুষ দিতে বাধ্য
হয়েছেন। এর আগে গত বছর ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে
ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে বদলির আবেদন করা হয়। ওই
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, কালীগঞ্জ, শ্রীপুর ও জয়দেবপুর থানাধিন বড়কাউ,
পাড়াবর্থা, বড়রাথুরা ও পিরুজালি মৌজায় পূর্বাচল উপশহর এবং বঙ্গবন্ধু সাফারি
পার্ক নির্মাণে কয়েক হাজার বিঘা জমি অধিগ্রহণের বিল উত্তোলন করতে শতকরা
কমপক্ষে ২৫ ভাগ ঘুষ দিতে হচ্ছে। ওই আবেদনপত্রে এলাকাবাসীকে সুরক্ষার দাবি
জানানো হয়। এদিকে গাজীপুর জেলা প্রশাসক বরাবর গত বছরের ১২ই ডিসেম্বর ভূমি
মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তুলসী রঞ্জন সাহা অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা
মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে হাজী মোস্তফা কামালের দাখিলকৃত অভিযোগের
বিষয়ে মতামত পাঠানোর জন্য পত্র পাঠান। গত ২৪শে মার্চ ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে
মন্ত্রণালয়ের উপসচিব এ টি এম মোস্তফা কামাল স্বাক্ষরিত এক তাগিদপত্র পাঠানো
হয় গাজীপুর জেলা প্রশাসন বরাবর। ওই তাগিদ পত্রে ভূমি মন্ত্রণালয়ের দু’টি,
ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের একটি ও গাজীপুর জেলা প্রশাসকের একটি সূত্র এবং হাজী
মোস্তফা কামালের আবেদনের সূত্র উল্লেখ করে জেলা প্রশাসককে পাঠানো পত্রে
বলা হয়, হাজী মোস্তফা কামালের দাখিলকৃত আবেদনের বিষয়ে মতামত প্রদানের জন্য
আপনাকে অনুরোধ করা হয়েছিল। পরে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সূত্রস্থ স্মারকে পত্র ও
তৎসংযুক্ত কাগজপত্রের ভিত্তিতে জরুরি ভিত্তিতে মতামত পাঠানোর অনুরোধ করা
হয়। ওই পত্রের জবাব আজও পাওয়া যায়নি। অবস্থায় উপরউক্ত বিষয়ে মতামত প্রদানের
জন্য নির্দেশক্রমে পুনরায় অনুরোধ করা হলো। এরপর চলতি মে মাসের ৬ তারিখে
মো. শহীদুল্লাহ গাজীপুরের অতিরিক্ত ভূমি কর্মকর্তাকে বদলি প্রসঙ্গে ভূমি
মন্ত্রণালয়ে সুপারিশপত্র গায়েবের রহস্য উদঘাটনপূর্বক সুশাসন প্রতিষ্ঠায়
দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন পত্রটি জমা দেন।
No comments:
Post a Comment