Sunday, May 18, 2014

হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, সহযোগিতায় ছিলেন আজহার

১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল দিবাগত রাত আড়াইটা-তিনটার দিকে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে দখিগঞ্জ শ্মশানে নিয়ে আমার বাবা দীনেশ চন্দ্র ভৌমিকসহ আরো দশজনকে হাত-পা বেধে ব্রাশফায়ার করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ব্রাশফায়ারে আমার বাবা দীনেশ চন্দ্র ভৌমিক ছাড়া বাকি দশজন শহীদ হন। ইসলামী ছাত্রসংঘ রংপুর শহর শাখার তৎকালীন সভাপতি এটিএম আজহারুল ইসলামের পরিকল্পনা এবং সহায়তায় এ হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হয়। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেছেন রথিশ চন্দ্র ভৌমিক। তিনি আজহারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ১৩তম সাক্ষী। 
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষ্য দেন রথিশ চন্দ্র ভৌমিক। সাক্ষ্যগ্রহণে সহযোগিতা করেন প্রসিকিউটর তাপস কান্তি বল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম ও রেজিয়া সুলতানা চমন। সাক্ষ্য শেষে সাক্ষীকে জেরা শুরু করেছেন আজহারের আইনজীবী আব্দুস সোবাহান তরফদার। জেরা অসমাপ্ত অবস্থায় সোমবার পর্যন্ত মুলতবি করেছেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল। বর্তমানে আইনজীবী সাক্ষী রথিশ চন্দ্র ভৌমিকের মুক্তিযুদ্ধের সময় বয়স ছিল ১৩ বছর। পড়তেন পঞ্চম শ্রেণীতে। এ সময় তার পরিবার রংপুরের কোতোয়ালি থানার বাবুপাড়ায় থাকতেন। তার বাবা দীনেশ চন্দ্র ভৌমিক ছিলেন একজন হোমিও ডাক্তার। সে সময় তিনি রংপুর জেলা কৃষক লীগের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। রথিশ চন্দ্র ভৌমিক জানান, ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল দিবাগত রাত আড়াইটা-তিনটার দিকে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে দখিগঞ্জ শ্মশানে নিয়ে তার বাবা দীনেশ চন্দ্র ভৌমিকসহ আরো দশজনকে হাত-পা বেধে ব্রাশফায়ার করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ব্রাশফায়ারে তার বাবা দীনেশ চন্দ্র ভৌমিক ছাড়া বাকি দশজন শহীদ হন। ইসলামী ছাত্রসংঘ রংপুর শহর শাখার তৎকালীন সভাপতি এটিএম আজহারুল ইসলামের পরিকল্পনা এবং সহায়তায় এ হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন সাক্ষী। সাক্ষী বলেন, বাবা শ্মশানের বিমের পাশে থাকায় প্রথম অবস্থায় গুলি লাগেনি। পরে আবার ব্রাশফায়ার করলে জররেজ সাহেবের শরীর ভেদ করে বাবার বাম পায়ে এবং ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে গুলি লাগে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসররা মৃত ভেবে চলে গেলে বাবা দেখেন যে, আমার মামা শান্তি চাকী, খুররম, মহররম, জররেজ সাহেব, দুলাল, দুর্গাদাস অধিকারী, উত্তম অধিকারী, খিতিশ হালদার, গোপাল অধিকারী ও পাগলা দরবেশসহ বাকি দশজন গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছেন। রথিশ চন্দ্র ভৌমিক বলেন, মৃত ভেবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী চলে গেলে বাবা দীনেশ চন্দ্র ভৌমিক স্থানীয় এলকাট ল্যাবরেটরিজের চিফ কেমিস্ট জাফর আলী সাহেবের বাসায় আশ্রয় নিলে জাফর সাহেব তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। এরপর জাফর সাহেব এবং স্থানীয় গোপাল বাবুর সহযোগিতায় তিনি ভারতে চলে যান। ভারতে গিয়ে প্রথমে কুচবিহার ও পরে কোলকাতার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। চিকিৎসাকালে যারা তাকে দেখতে গিয়েছিলেন, তাদের সবার কাছেই তিনি এ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন সাক্ষী।

সাক্ষী বলেন, ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ দুপুর তিনটার দিকে (তখন কারফিউ চলছিল) পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর জামায়াত এবং ইসলামী ছাত্রসংঘের লোকজন তাদের বাড়ি ঘেরাও করে দরজায় জোরে কড়া নাড়তে থাকে। এ সময় বাবা ডাক্তার দীনেশ চন্দ্র ভৌমিক দরজা খুলে দিলে তারা কর্নেল সাহেব সালাম দিয়েছেন, এখনি তাকে তাদের সঙ্গে যেতে হবে বলে ধরে নিয়ে যায়। পাকিস্তানি সেনারা তার মামা শান্তি চাকীকেও গাড়িতে তুলে রংপুর শহরের দিকে চলে যায়। এরপর সাক্ষী এবং তার পরিবারের লোকজন অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাদের সন্ধান পাননি।

আইনজীবী এ সাক্ষী আরো বলেন, ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল দিবাগত রাত আড়াইটা-তিনটার দিকে দখিগঞ্জ এলাকার দিক থেকে প্রচণ্ড গুলির শব্দ শুনতে পাই। ভোর আনুমানিক সাড়ে চারটার দিকে রবার্টসনগঞ্জ এলাকার জনৈক গোপাল চন্দ্র বাবু কাকা মানিক চন্দ্র ভৌমিককে পরিবারের সকলকে নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলেন। এরপর তার কাকা পরিবারের সবাইকে নিয়ে প্রথমে অযোধ্যাপুর গ্রামে চলে যান। সেখানে এক মাস থাকার সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের নিউ জলপাইগুড়ি এলাকার রেলওয়ে কোয়ার্টারে মামা দেবু চাকীর বাসায় গিয়ে আশ্রয় নেন।

সেখানে বাবার সঙ্গে তাদের দেখা হলে বাবা দীনেশ চন্দ্র ভৌমিক তাদের জানান, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা তাকে ধরে রংপুর ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। সেখানে একই সেলে আগে থেকে বন্দি ছিলেন রংপুরের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব দুর্গা দাস অধিকারীও তার ছেলে উত্তম অধিকারী।

বাবা দীনেশ চন্দ্র ভৌমিক তাদের আরো জানান, ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ রংপুরের বিশিষ্ট আয়কর আইনজীবী ও ন্যাপ নেতা এবিওয়াই মাহফুজ আলী জররেজকেও ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে আসা হয়। একই দিনে শহরের ধাপ ইঞ্জিনিয়ার এলাকার খুররম, মহররম, দুলাল, চার্চ থেকে খিতিশ হালদার ও গোপাল অধিকারীকে ধরে এনে একই সেলে রাখা হয়। প্রতিরাতেই তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হতো। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়ে এ পর্যন্ত আজহারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন আরও ১২ জন সাক্ষী। তাদের মধ্যে সপ্তম সাক্ষী আমিনুল ইসলামকে বৈরি ঘোষণা করেছেন রাষ্ট্রপক্ষ। বাকি ৯ সাক্ষী হলেন ক্যামেরা ট্রায়ালে সাক্ষ্য দেওয়া একজন ভিকটিম, মুক্তিযোদ্ধা মো. মোস্তফা, শহীদপুত্র মোখলেসার রহমান সরকার ওরফে মোখলেস আলী, মো. মেছের উদ্দিন, আব্দুর রহমান, মকবুল হোসেন, মো. মুজিবর রহমান মাস্টার, শোভা কর, রতন চন্দ্র দাস, সাখাওয়াত হোসেন রাঙ্গা এবং রফিকুল হাসান নান্নু। তাদের জেরা শেষ করেছেন আসামিপক্ষ গত বছরের ৫ ডিসেম্বর আজহারের বিরুদ্ধে সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর একেএম সাইফুল ইসলাম। এর আগে ১২ নভেম্বর এটিএম আজহারের বিরুদ্ধে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। এটিএম আজহারের বিরুদ্ধে গণহত্যা, হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, নির্যাতন, আটক, অপহরণ, গুরুতর জখম ও অগ্নিসংযোগের ৬টি অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটিতেও(উর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়) অভিযুক্ত হয়েছেন তিনি।

গত বছরের ২৯ আগস্ট ও ৩ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠনের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর একেএম সাইফুল ইসলাম। অন্যদিকে ২৪ সেপ্টেম্বর ও ১০ অক্টোবর অভিযোগ গঠনের বিপক্ষে শুনানি করেন আজহারের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, আইনজীবী শিশির মোহাম্মদ মুনির ও ইমরান এ সিদ্দিকী। ২৫ জুলাই এটিএম আজহারুলের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। ১৮ জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগটি দাখিল করেন প্রসিকিউটর একেএম সাইফুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর নুরজাহান বেগম মুক্তা। ৪টি ভলিউমে ৩শ’ পৃষ্ঠায় দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগে আজহারের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে ৯ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের ৬টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়।

এটিএম আজহারের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা এস এম ইদ্রিস আলী ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু করে গত বছরের ৪ জুলাই পর্যন্ত মোট ১ বছর ৩ মাস ১১ দিনে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। মানবতাবিরোধী ৯ ধরনের অপরাধে তদন্ত চূড়ান্ত করে ৯ জুলাই প্রসিকিউশনের কাছে তদন্ত রিপোর্টটি দাখিল করেন তদন্ত সংস্থা। এর ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন প্রসিকিউশন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর আদেশে ২০১২ সালের ২২ আগস্ট আজহারের ঢাকার মগবাজারের বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় এটিএম আজহারুল ইসলামকে। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

No comments:

Post a Comment