বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া র্যাব-১১-এর
সদ্য সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মাদ ও বাহিনীর চার
কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কুমিল্লায় মামলা হয়েছে। লাকসাম উপজেলা বিএনপির
সভাপতি ও সাবেক সাংসদ সাইফুল ইসলাম ওরফে হীরু এবং লাকসাম পৌর বিএনপির
সভাপতি হুমায়ুন কবীর পারভেজ গুমের ঘটনায় আজ রোববার দুপুরে এই মামলা হয়।
গত বছরের ২৭ নভেম্বর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন তাঁরা।

মামলার
বাকি চার আসামি হলেন সঙ্গে র্যাব-১১ কুমিল্লার দায়িত্বে থাকা
কোম্পানি-২-এর মেজর শাহেদ হাসান রাজী, ডিএডি শাহজাহান আলী, উপপরিদর্শক
(এসআই) কাজী সুলতান আহমেদ ও অসিত কুমার রায়। কুমিল্লার ৬ নম্বর আমলি
আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সাবরিনা নার্গিসের আদালতে মামলাটি করা
হয়েছে। হুমায়ুনের বাবা রঙ্গু মিয়া মামলাটি দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত
করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য লাকসাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি)
নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। দণ্ডবিধির ৩৪, ৩২৩, ৩৬৪, ৩৮০, ৪৪৭ ও ৪৪৮ ধারায়
মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেছেন, ২০১৩ সালের
২৭ নভেম্বর রাত আনুমানিক নয়টা থেকে ১১টার মধ্যে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ
উপজেলার হরিশ্চর এলাকা থেকে সাইফুল, হুমায়ুন ও পৌর বিএনপির সহসাংগঠনিক
সম্পাদক জসিম উদ্দিনকে আটক করে র্যাব। এরপর জসিমকে থানায় হস্তান্তর করা
হয়। কিন্তু বাকি দুজনের এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ মেলেনি। নিখোঁজ হওয়া
বিএনপির দুই নেতার পরিবারের পক্ষ থেকে গত সপ্তাহে অভিযোগ করা হয়, তাঁদের
গুম করেছে র্যাব। হুমায়ুনের স্ত্রী শাহনাজ আক্তার গত ৮ মে দুপুরে লাকসামে
নিজ বাড়িতে এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, লে. কর্নেল তারেক সাঈদ তাঁর
স্বামী হুমায়ুন ও বিএনপির নেতা সাইফুলকে গুম করেছেন। এ ঘটনায় তিনি
র্যাবের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। পরে সাধারণ
ডায়েরি (জিডি) করেন। শাহনাজের অভিযোগ, পুলিশ সেই জিডিরও তদন্ত করছে না।
তাই তিনি আবারও র্যাবের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা ভাবছেন।

ওই
সংবাদ সম্মেলনে টাঙানো ডিজিটাল ব্যানারে লেখা ছিল, ‘র্যাব-১১-এর সিও সদ্য
চাকরিচ্যুত তারেক সাঈদের নেতৃত্বে হীরু ও হুমায়ুনকে গুম করা হয়েছে।’
এদিকে সাইফুল ইসলামের মেয়ে তাসনুমা ইসলাম ৯ মে শুক্রবার মুঠোফোনে প্রথম
আলোকে বলেন, ‘বাবা গুম হওয়ার পর আমার মা ও ছোট বোন র্যাব কর্মকর্তা তারেক
সাঈদের সঙ্গে দেখা করেন। ওই সময়ে তারেক বলেছিলেন, “আমরা কিছু জানি না।
বিএনপির দুই নেতার সঙ্গে লাকসামের অন্য বিএনপি নেতাদের বিরোধ রয়েছে।
আপনাদের অনেক শক্র। তার পরও বলছি, আমরা তাঁদের গুম করিনি।”’ তাসনুমা অভিযোগ
করে বলেন, ‘আমাদের সন্দেহ, তারেকই ওই গুমের সঙ্গে জড়িত। তিনি সবই জানেন।
তিনি নিজে কুমিল্লায় গিয়ে গুমের নেতৃত্ব দেন। তাঁর সঙ্গে র্যাব-১১
কুমিল্লার দায়িত্বে থাকা কোম্পানি-২-এর অধিনায়ক মেজর শাহেদ হাসান রাজী ও
ডিএডি শাহজাহান আলী জড়িত।’ অবশ্য মেজর শাহেদ হাসান রাজী দাবি করেন, র্যাব
সদস্যরা ওই দুই নেতার কাউকে তুলে আনেনি। তাঁরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছেন।
নিখোঁজ দুই নেতার পরিবার জানায়, ২৭ নভেম্বর রাত ১০টার দিকে সাইফুল,
হুমায়ুন ও পৌর বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক জসিম উদ্দিন একটি
অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার
হরিশ্চর এলাকায় পৌঁছালে র্যাব পরিচয়ে একদল লোক অ্যাম্বুলেন্সটি থামিয়ে
তিনজনকে অন্য একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর র্যাব সদস্যরা
কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় সাইফুল
ইসলাম ও হুমায়ুন কবীর পারভেজকে গাড়িতে রেখে জসিম উদ্দিনকে নামিয়ে দেয়।
ওই রাতে র্যাব লাকসামে সাইফুল ইসলামের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের বিভিন্ন
এলাকা থেকে আরও ১০ জনকে আটক করে লাকসাম থানায় হস্তান্তর করে। র্যাব-১১
কুমিল্লার কোম্পানি ২-এর ডিএডি শাহজাহান আলী তাঁদের লাকসাম থানায়
হস্তান্তর করেন। একই সঙ্গে মামলা করেন। ওই রাতের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে
র্যাবের হাত থেকে ছাড়া পাওয়া জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘র্যাব
সদস্যরা হীরু ভাই (সাইফুল ইসলাম), পারভেজ ভাই ও আমাকে আটক করে। পরে পদুয়ার
বাজার বিশ্বরোডে এসে গাড়ি থামিয়ে আমাকে অন্য একটি গাড়িতে তুলে লাকসাম
থানায় পাঠিয়ে দেয়।’ জসিম উদ্দিন জামিনে মুক্তি পেয়ে সম্প্রতি আওয়ামী
লীগে যোগদান করেছেন। লাকসাম ফেয়ার হেলথ হসপিটালের অ্যাম্বুলেন্সচালক সাদেক
আহমেদ বলেন, ‘র্যাব বিএনপির নেতাদের আমার অ্যাম্বুলেন্স থেকে নিয়ে
যায়।’ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ সাতজন
অপহরণ ও খুনের ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে র্যাব-১১-এর অধিনায়ক তারেক
সাঈদ মোহাম্মাদকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার
করে গতকাল শনিবার পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে।
No comments:
Post a Comment