ফৈজাবাদ শুনলে অনেকেই ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, ওটাও কোনো ‘হাই
প্রোফাইল’ কেন্দ্র কি না। উত্তরটা অবশ্যই ‘না’ এবং ‘হ্যাঁ’। না এ কারণে,
সত্যি সত্যিই এবারও যাঁরা ফৈজাবাদ থেকে লোকসভায় লড়ছেন, তাঁদের কেউই এমন
কোনো তালেবর নন যে জেলার বাইরে লোকে তাঁদের এক ডাকে চিনবে। কিন্তু উত্তরটা
তখনই ‘হ্যাঁ’ হয়ে যায়, যেই বলা হবে এই কেন্দ্র থেকেই ভারতের রাজনীতি একটা
অন্য ধরনের বাঁক নিয়েছিল।

যে-ই
শুনবে, এই লোকসভা কেন্দ্রেরই একটি বিধানসভা হলো অযোধ্যা। সেই অযোধ্যা,
১৯৯২ সালে যেখানে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার নামে বাবরি মসজিদ ধূলিসাৎ হয়েছিল।সেই
১৯৯২ সালের পরেও বার কয়েক অযোধ্যা গিয়েছি। এবার গেলাম ১৮-২০ বছর পরে।
সত্যি বলতে কি, ফৈজাবাদ শহর থেকে আগে যেভাবে আট-দশ কিলোমিটার দূরে অযোধ্যা
জনপদে যেতাম, সেই বহু চেনা রাস্তা একেবারে পাল্টে গেছে। ফৈজাবাদে ঢোকার
আগেই পেল্লাই উড়ালপথ। উড়ালপথ ধরে আট লেনের জাতীয় সড়ক চলে গেছে দূরদূরান্তে।
অটল বিহারি বাজপেয়ি যে সোনালি চতুর্ভুজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, এই উড়ালপথ
তারই একটা। ফৈজাবাদে না ঢুকে সেই সড়ক দিয়েই সটান চলে আসা যায় সরযু নদীর
তীরে, যেখান থেকে অযোধ্যার মূল আকর্ষণ কয়েক মিনিটের হাঁটাপথ মাত্র। সেই সড়ক
বেয়ে সরযুর তীরে দাঁড়িয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। ২০ বছর আগে সরযুর যে হাল
দেখেছিলাম, আজও সে রকমই রয়েছে। ক্ষীণকায়া মলিন স্রোতস্বিনীর কালিমা ঘুচিয়ে
তার গরিমা ফেরানোর কোনো চেষ্টাই বোধ হয় হয়নি। না হোক, রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার
কী হলো? ভাবতে ভাবতে রাম জন্মভূমির দিকে হাঁটা শুরু করতেই দলে দলে তরুণদের
আনাগোনা শুরু হলো। বয়স তাদের ২০ বছরের নিচে। ঠোঁটের ওপরে হালকা গোঁফের
ছোঁয়া, কপালে গেরুয়া টিপ, গলায় উত্তরীয়। সবাই বলল তাঁরা বিদ্যার্থী, ১০০
টাকার বিনিময়ে তারা যাবতীয় দর্শনীয় স্থান ঘুরিয়ে দেখাবে। সামনে দিয়ে গেলে
অনেকটা পথ হাঁটতে হবে বলে তারা পেছন দিয়ে নিয়ে যাবে। ২০ বছর আগে এই
দৌরাত্ম্য ছিল না। রামরাজ্যে এটা নবতম সংযোজন। হনুমানগড়ি মন্দিরে ঢোকার আগে
থেকেই গাড়ি চলার রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ওখান থেকে শুধুই পায়ে চলা।
প্রায় এক কিলোমিটার সরু আঁকাবাঁকা অপ্রশস্ত রাস্তার দুধারে ঝমঝম গমগম করে
গান বাজছে। হিন্দি সিনেমার জনপ্রিয় গানের সঙ্গে ঠাকুর-দেবতার বন্দনা করে
কথা বসানো গান। উত্তর ভারতে বিস্তীর্ণ এলাকায় এটারই চল আজ বহু বছর। প্রতিটি
দোকানেই পূজার সামগ্রী ও দেব-দেবীর ছবি বিক্রি হচ্ছে, ২০ বছর আগেও যা
দেখেছি। ২০ বছর আগে শাখামৃগদের দাপট যেমন ছিল, আজও তেমনই। সেই সঙ্গে দোকানে
দোকানে অবিরাম চলছে একটি ভিডিও ও তার ধারাবিবরণী। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে
করসেবকদের দাপাদাপি, তাদের বাবরি মসজিদের মাথায় চড়ে বসা, শাবল ও গাঁইতি
দিয়ে কাঠামো খোঁড়া এবং একে একে তিনটি গম্বুজের ধূলিসাৎ হওয়া। রক্তের কণায়
কণায় হিন্দুত্বের প্লাবন বইয়ে দেওয়ার মতো ধারাবিবরণীর শব্দচয়ন। খদ্দেরদের
কাছে দোকানদারেরা ইচ্ছেমতো দাম হাঁকছেন ওই সিডির। পুলিশ ও প্রশাসনের নাকের
ডগায় কী করে এমন ধরনের সিডি বিক্রি হয়, ভাবতে ভাবতে পুলিশের প্রথম চৌকি।
কলম নয়, ক্যামেরা নয়, জলের বোতল নয়, মোবাইল নয়, কিছুই প্রায় সঙ্গে নেওয়ার
অধিকার নেই কারও। মায় মহিলাদের সেফটিপিনও। তল্লাশির সময় সিডি প্রসঙ্গ তুলতে
পুলিশ বলল, ‘প্রশাসনকে বলুন। আমাদের কাজ স্রেফ হুকুম তামিল করা।’ রাম
জন্মভূমি-বাবরি মসজিদের বিতর্কিত কাঠামো যে স্থানে ছিল, সেই স্থানটি দুর্গ
বললেও বোধ হয় কম বলা হয়। চার জায়গায় চারবার তল্লাশির পর গর্ভগৃহ। অন্তত ২০
ফুট দূরে সেই রামলালা, ১৯৮৬ সালে বাবরি মসজিদে যাঁর আবির্ভাবের পর তালা
খোলার নির্দেশ দিয়েছিলেন স্থানীয় আদালত। কোথাও কোনো গাইড নেই, কোনো পান্ডা
নেই, কোনো হুটোপুটি নেই। দূর থেকে দর্শন করো, কাছ থেকে ডালায় প্রণামি দাও,
হাত পেতে পূজারির কাছে প্রসাদ নাও এবং খাঁচার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাও।
রাষ্ট্রের এই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা সত্ত্বেও নরেন্দ্র মোদির বিজেপির
নির্বাচনী ইশতেহারে রামমন্দির প্রতিষ্ঠার কথা নতুন করে বলা হয়েছে এবং কী
আশ্চর্য, অযোধ্যার হিন্দুরা তা হবে বলেও বিশ্বাস করছে। ফৈজাবাদ কেন্দ্রে
গতবার জিতেছিলেন কংগ্রেসের নির্মল ক্ষেত্রি। ১৯৮৪ ও ৮৯-তেও জিতেছিলেন তিনি।
পরের দুবার জেতেন বিজেপির ডাকাবুকো নেতা বিনয় কাটিয়ার। ৯৮ থেকে তাঁর টক্কর
মিত্রসেন যাদবের সঙ্গে। এই মিত্রসেন এক অদ্ভুত চরিত্র। সিপিআইয়ের রাজ্য
সম্পাদক ছিলেন একসময়, হঠাৎই ৯৮ সালে যোগ দিলেন সমাজবাদী পার্টিতে। ২০০৪
সালে মুলায়মকে ছেড়ে চলে যান মায়াবতীর দলে এবং জিতেও যান। এবার আবার
মুলায়মকে আঁকড়ে ধরেছেন। বিকাপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়কও এই মুহূর্তে।
তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধের গাদা গাদা মামলা। মায়াবতী এখানে যাঁকে পছন্দ করেছেন,
সেই জিতেন্দ্র সিং বাবলুও মামলার বেলায় কম যান না। লক্ষৌয়ে কংগ্রেসের
নেত্রী রীতা বহুগুণা জোশির বাড়িতে আগুন লাগানোর অভিযোগ তাঁরই বিরুদ্ধে।
তাঁদের সবার মোকাবিলা যাঁর সঙ্গে, তিনি অযোধ্যা থেকে বিজেপির তিনবারের
বিধায়ক লাল্লু সিং। বাহুবলে তিনিও কম নন। তার ওপর মোদি-হাওয়ায় তিনি আরও
বলীয়ান; যদিও টিকিট না পেয়ে ক্ষুব্ধ বিনয় কাটিয়ার তলে তলে সর্বনাশের ছক
কাটছেন। তবু লাল্লু সিংয়ের দাবি, একে রামচন্দ্র, দুইয়ে নরেন্দ্র মোদি, তিনে
মুসলমান ভোটের বিভাজন (সাড়ে তিন লাখ মুসলমান যাঁকে বেছে নেবেন, তাঁরই
কেল্লা ফতে। নির্মল ক্ষেত্রি এই আশাতেই বিভোর। লাল্লু সিং ভাবছেন, মুসলমান
ভোট অন্য তিনজনের মধ্যেই ভাগ-বাঁটোয়ারা হবে। শেষ হাসি হাসবেন তিনিই।)
তাঁকেই ‘ভিকট্রি স্ট্যান্ডে’ দাঁড় করাবে।
তাতে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার হবেটা কী? বিশ্ব হিন্দু পরিষদের উদ্যোগে এই ঘেরাটোপ নগরে রাখা তিন লাখের বেশি রাম শিলায় আজ অনেক দিন শ্যাওলা পড়েছে। শ্বেতপাথরের খিলানও জৌলুশ হারিয়েছে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বিজেপির উদ্যোগে দেশ-বিদেশ থেকে আসা কোটি কোটি দানের টাকারও কোনো হিসাব নেই। এই অযোধ্যায় রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার কথা আজ আর ভুলেও কেউ মুখে আনেন না। তবু বাল্মীকি আখড়ার সর্বেসর্বা রাম জন্মভূমি ন্যাসের চেয়ারম্যান মহন্ত নিত্যগোপাল দাসের গুরু মহন্ত কমলনয়ন দাস পরম নিশ্চিন্তে বলতে পারেন, ‘এবার মোদি আসছেন। দেখবেন, ভব্য রামমন্দির যেমন হবে, তেমনই রাষ্ট্র নির্মাণও হবে। সেটাই তো রামরাজ্য।
তাতে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার হবেটা কী? বিশ্ব হিন্দু পরিষদের উদ্যোগে এই ঘেরাটোপ নগরে রাখা তিন লাখের বেশি রাম শিলায় আজ অনেক দিন শ্যাওলা পড়েছে। শ্বেতপাথরের খিলানও জৌলুশ হারিয়েছে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বিজেপির উদ্যোগে দেশ-বিদেশ থেকে আসা কোটি কোটি দানের টাকারও কোনো হিসাব নেই। এই অযোধ্যায় রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার কথা আজ আর ভুলেও কেউ মুখে আনেন না। তবু বাল্মীকি আখড়ার সর্বেসর্বা রাম জন্মভূমি ন্যাসের চেয়ারম্যান মহন্ত নিত্যগোপাল দাসের গুরু মহন্ত কমলনয়ন দাস পরম নিশ্চিন্তে বলতে পারেন, ‘এবার মোদি আসছেন। দেখবেন, ভব্য রামমন্দির যেমন হবে, তেমনই রাষ্ট্র নির্মাণও হবে। সেটাই তো রামরাজ্য।
No comments:
Post a Comment