জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মুহাম্মদ আবদুস সুবহানের বিরুদ্ধে
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আজ মঙ্গলবার জবানবন্দি দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের
তৃতীয় সাক্ষী মো. আবু আসাদ (৬২)। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, একাত্তরে সুবহান
তাঁকে ধরে তাঁর ‘মুজাহিদ বাহিনীতে’ যোগদানে বাধ্য করান। তিনি বলেন,
একাত্তরে সুবহান নিজে অনেককে গুলি করতেন। বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের
নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ আজ মঙ্গলবার আবু
আসাদের জবানবন্দি নেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সুলতানা রেজিয়া। এ সময় আসামির
কাঠগড়ায় ছিলেন সুবহান।

জবানবন্দিতে
আবু আসাদ বলেন, ওই সময় তিনি খুব কাছ থেকে দেখেন, বিভিন্ন অভিযানে সুবহানের
নির্দেশে পাকিস্তানি সেনারা কীভাবে একের পর এক হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও
অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছেন। ঘটনার বর্ণনা দিতে একপর্যায়ে তিনি কেঁদে
ফেলেন। আবু আসাদ বলেন, তাঁর বাড়ি পাবনার ঈশ্বরদীতে। মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর
বয়স ছিল ২০-২২ বছর। একাত্তরের ১৫ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনা ও সুবহান তাঁদের
গ্রাম জয়নগরে অভিযানে এসে গুলি করে মানুষ হত্যা ও অগ্নিসংযোগ করতে থাকেন।
একপর্যায়ে তিনি সুবহানের হাতে ধরা পড়েন। গ্রামে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর
পর তাঁকেসহ আরও কয়েকজনকে ধরে ট্রাকে তুলে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পাশে স্থাপিত
সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনিসহ আটককৃতদের তাঁদের সঙ্গে কাজ
করে পাকিস্তানকে রক্ষার নির্দেশ দিয়ে সুবহান তাঁর ‘মুজাহিদ বাহিনীতে’ যোগ
দিতে বলেন। যারা এ নির্দেশ মানবে না, তাদের গুলি করে পদ্মা নদীতে ফেলে
দেওয়া হবে বলেও হুমকি দেন সুবহান। জবানবন্দিতে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী বলেন,
ক্যাম্পে পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দিত।
প্রশিক্ষণের সময় তাঁরা দেখতেন সুবহান সাদা গাড়িতে এসে পাকিস্তানি সেনাদের
সঙ্গে নিয়ে প্রায়ই ৫-৭ জন যুবককে হাত ও চোখ বেঁধে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে
নিয়ে যেতেন। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে মধ্যরাতে সুবহান মেজর জয়তুনের সঙ্গে পরামর্শ
করে ওই যুবকদের নিয়ে ব্রিজের ওপরে আনতেন। এ সময় বাধ্য হয়ে তাঁরাই ওই
যুবকদের ব্রিজের ওপর তুলে আনতে সহায়তা করতেন। পরে যুবকদের গুলি করে হত্যা
করা হতো। কখনো সুবহান নিজের পিস্তল দিয়ে গুলি করতেন, কখনো পাকিস্তানি
সেনারা গুলি করত। রাষ্ট্রপক্ষের তৃতীয় সাক্ষী আবু আসাদ বলেন, ১৫-১৬ নভেম্বর
তাঁদের দুই মুজাহিদ সদস্যকে তিনি রাইফেলসহ পালাতে সাহায্য করেন। এতে
সেনারা তাঁকে সন্দেহ করে নির্যাতন করে। সুবহানও তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং
মারধর করেন। একপর্যায়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। একদিন তাঁকে পাকিস্তানি
সেনাদের সঙ্গে নিয়ে সুবহান মুলাডুলির বেতবাড়িয়া এবং হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকা
আড়মবাড়িয়ায় অভিযানে যান। সুবহানের হাতে থাকা তালিকা অনুসারে সেনারা
সেখানকার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় সামনে কাউকে পেলে তাঁদেরও গুলি করে
হত্যা করা হয়। জবানবন্দির এ পর্যায়ে কাঁদতে কাঁদতে সাক্ষী বলেন, ‘ওই
অভিযানে আমি পাকিস্তানি সেনাদের দ্বারা বাবার সামনে মেয়েকে ও স্বামীর সামনে
স্ত্রীকে ধর্ষিত এবং তাঁদের গুলি করে হত্যা করতে দেখেছি। সুবহান এ সময়
সেনাদের সঙ্গেই থাকতেন।’ রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী আরও বলেন, একাত্তরের ২৮-২৯
নভেম্বর তাঁদের একটি দলকে রেলওয়ে কালভার্ট ব্রিজের পাহারায় রাখা হয়। রাতে
সবাই ঘুমিয়ে পড়লে তিনি পালিয়ে ভারতে যান। সেখানে কয়েক দিন মুক্তিযুদ্ধের
প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় দেশ স্বাধীন হলে দেশে ফেরেন। পরে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে
সরকার তাঁকে রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনীতে চাকরি দেয়। কাল বুধবার পর্যন্ত এ
মামলার কার্যক্রম মুলতবি করা হয়।
No comments:
Post a Comment