ইরানের ইস্পাহান শহরের সঙ্গে তার কোন
সম্পর্ক নেই। তবু তার নাম ইস্পাহানি। শুধু তারই নয় তার অন্য ভাইদের নামও
এমন খাপছাড়া। কারও নাম জ্যাক, কারও নাম পঙ্কজ। খাপছাড়া নামের তরুণ
ইস্পাহানি যেন খাপ খোলা তলোয়ার। সে তলোয়ার পুরো সুনামগঞ্জ শহরের আতঙ্ক। ২৯
বছর বয়সী ইস্পাহানির পুরো নাম হাসানুজ্জামান ইস্পাহানি। সুনামগঞ্জ পৌর
শহরের দক্ষিণ আরপিননগরের আবদুল আলীর ছেলে ইস্পাহানি সর্বশেষ আলোচনায় আসে
সিলেটের ব্র্যাক ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় আটক হয়ে। কয়েক মাস জেল খেটে বেরিয়ে
আসার পর আরও বেপরোয়া সে। জেল খেটেছে আগেও।

গায়ে
থাকা জেলফেরত ‘র্যাঙ্ক’ যেন তাকে আরও শক্তি যোগাচ্ছে। বিয়ের আসর থেকে কনে
ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে ইস্পাহানি আবারও জানিয়ে দিলো- আগের মতোই ভয় পেতে
হবে তাকে। শান্ত শহর হিসেবে সুনামগঞ্জের আলাদা সুনাম। কবিতার মতো সাজানো সে
শহরে ইস্পাহানি যেন এক ছন্দপতন। ২০০১ সালের দিকে সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী
লীগের সাধারণ সম্পাদক নূরুল হুদা মুকুটের হাত ধরে মাত্র কৈশোরে পা রাখা
ইস্পাহানির উত্থান। কৈশোরেই তার চেনা হয়ে যায় অস্ত্রের ঝনঝনানি। শহরের
বুলচান্দ হাই স্কুল ও এইচএমপি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও হাই স্কুলের গ-ি
পেরোতে পারেনি বখাটেপনার কারণে। প্রভাব খাটানোর মোহে পড়ে সে। নিজেকে হারিয়ে
ফেলে অন্ধকারের চোরাগলির মাঝে। এক সময় হয়ে ওঠে শান্ত সুনামগঞ্জের ত্রাস।
নজর কেড়ে নেয় আরও অনেকের, যারা তাকে কাজে লাগাতে চান নিজেদের সাম্রাজ্য
গড়ার মিশনে। নূরুল হুদা মুকুটের ছত্রচ্ছায়ায় নিজেকে ধীরে ধীরে সন্ত্রাসী
হিসেবে গড়ে নিতে থাকে ইস্পাহানি। এককালের ছিঁচকে ছিনতাইকারী এখন
সুনামগঞ্জের দাপুটে সন্ত্রাসী। সময়ের পালাবদলে গুরুও পাল্টায় তার। আওয়ামী
লীগ নেতা মতিউর রহমান এমপি থাকাকালে তার বশ্যতা মেনে নেয় ইস্পাহানি। তবে
মতিউর রহমান এখন আর এমপি নন, তাই তাকে মানার আর প্রয়োজনও নেই ইস্পাহানির।
সুনামগঞ্জের এককালের আতঙ্ক ওয়াটার লর্ড জয়নালের ছেলে শাহাবুদ্দিন এখন তার
মাথার ছায়া। আর সুনামগঞ্জ সদর নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-৪ আসনে আওয়ামী লীগ দলীয়
এমপি না থাকায় কাছে ভিড়তে চেষ্টা করছে সংরক্ষিত আসনের এমপি অ্যাডভোকেট
শামসুন্নাহার বেগম শাহানা রব্বানীর। ইস্পাহানির নিয়ন্ত্রণেই সুনামগঞ্জের
দখল-চাঁদাবাজি-নারী ব্যবসা। ইস্পাহানি নিজেও ছোটখাটো গডফাদার। তার নিজেরও
রয়েছে একটি গ্রুপ। ছাত্রলীগ কর্মী ফরহাদ, উজ্জ্বল, রাজা, ছাত্রদলকর্মী
সুজনসহ অনেকেই এ গ্রুপের সদস্য। শহরের আরপিননগর, তেঘরিয়া, কালিবাড়ি,
ট্রাফিক পয়েন্ট, পুরাতন বাজারসহ শহরজুড়েই গ্রুপটির আধিপত্য। এ গ্রুপের
সদস্যরাই শহরের সকল ছিনতাই ঘটনার নেপথ্য কুশীলব। সুনামগঞ্জের বাসিন্দারা তো
আছেনই ঢাকা থেকে আসা বাসযাত্রীরা প্রায়ই এ বাহিনীর শিকার হন। শুধু টাকাকড়ি
নয় ইস্পাহানি মেয়ে ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটিয়েছে কয়েকবার। ২০১৩ সালে শহরের
কালিবাড়ি থেকে এক প্রবাসীর স্ত্রীকে তুলে আনে ইস্পাহানি। ২০১১ সালে
সুনামগঞ্জে বাণিজ্যমেলা চলাকালে যাত্রামঞ্চ থেকে জুঁই নামের এক অভিনেত্রীকে
উঠিয়ে আনে সে। এ খবর জানতে পেরে তার স্ত্রী মোর্শেদা আক্তার কাকলী
আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। ২০১০ সালে নবীনগর থেকে যুক্তরাজ্য প্রবাসী জনৈক
ফুয়াদকে মারধর করে তুলে নিয়ে যায় তার প্রেমিকাকে। আর সর্বশেষ নিজের ছোট ভাই
তারেকুজ্জামান প্লাবনের জন্য বিয়ের আসর থেকে মামাতো বোনকে উঠিয়ে আনতে
চেয়েছিল। গত ১৩ই মে দক্ষিণ আরপিননগরের রসিক বখতের দ্বিতীয় মেয়ের বিয়ে ছিল। এ
মেয়েটিকে তার ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দেয়ার জন্য আগে থেকে প্রস্তাব দিয়েছিল
ইস্পাহানির পরিবার। কিন্তু রাজি হননি রসিক বখত। ক্ষেপে গিয়ে বিয়ের দিন
হামলা চালায়। কনেকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এ ঘটনায় থানায় এজাহার জমা
পড়লেও মামলা নেয়নি কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ। ইস্পাহানির মূল অস্ত্র নারী
দিয়ে ব্ল্যাকমেইলিং। শহরের বনানীপাড়ায় দু’টি আর ষোলোঘরে একটি বাসা ভাড়া
নিয়ে চলে তার ব্ল্যাকমেইলিং মিশন। প্রথমে নিজে সম্পর্ক গড়ে তুলে শহরের
ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সঙ্গে। তারপর তাদের ভিড়িয়ে দেয় নিজের নেটওয়ার্কের
মেয়েদের সঙ্গে। ফাঁদে ফেলে ছবি তুলে, রেকর্ড করে রাখে মোবাইল ফোনে। তারপর
ব্ল্যাকমেইলিংয়ের পালা। সুনামগঞ্জে রটনা, এমন ফাঁদে পড়েছিলেন সুনামগঞ্জ
চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি খায়রুল হুদা চপল। পরে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে মুখ
রক্ষা করেন তিনি। তবে এ ঘটনা অস্বীকার করেছেন চপল। মানবজমিনকে দৃঢ়কণ্ঠে
তিনি বলেন, এমন ঘটনা কখনওই ঘটেনি। প্রশ্নই ওঠে না ইস্পাহানিকে টাকা দেয়ার।
ইস্পাহানির ব্ল্যাকমেইলিংয়ের এমন ঘটনা অসংখ্য। এসব ঘটনায় তার সারথি
সুনামগঞ্জের মধ্যনগরের জনৈকা লাকি ও আমবাড়ির জনৈকা সুমি। ব্ল্যাকমেইলিংয়ের
পাশাপাশি নারী ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও ধরে রেখেছে ইস্পাহানি। পুরাতন
বাসস্ট্যান্ড, ট্রাফিক পয়েন্ট ও কালিবাড়ি এলাকার তিনটি হোটেল ঘিরে তার এ
ব্যবসা। পান দোকানদার পিতার ছেলে রাতারাতি বিত্তশালী হয়ে ওঠা ইস্পাহানির
আয়ের এক খাত চাঁদাবাজি। সদর উপজেলার ধোপাজান বালু-পাথর মহালে তাকে চাঁদা না
দিয়ে ব্যবসা করার উপায় নেই। সুনামগঞ্জ শহরের বিভিন্ন ব্যবসায়ীকেও তাকে
নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। পোশাক-আশাকসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছুই কিনতে হয় না
তাকে। পছন্দ হলে জোর করে নিয়ে আসে সে। জোর করে নিয়েছিল সর্বশেষ
বাণিজ্যমেলায় র্যাফেল ড্রতে বিজয়ীদের মোটরসাইকেলগুলোও। বিজয়ীদের হাতে ২০
হাজার টাকা করে ধরিয়ে দিয়ে সাইকেলের দখল নিয়ে পরে সেগুলোই বেশি দামে আবার
মেলা আয়োজকদের কাছে বিক্রি করে দেয়। ইস্পাহানির কাছে খাতির মেলে না দলীয়
লোকজনদেরও। তার হাতে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক যুবলীগের
কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার এনামুল কবির ইমন। প্রশাসক হিসেবে শপথ নেয়ার পর
প্রথম সুনামগঞ্জে আসার পর তার গাড়ি আটকে দিয়েছিল ইস্পাহানি। ২০১৩ সালে
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ওলিমান মিয়া তার
মারধরের শিকার হন। এ ঘটনায় ৪ মাস জেল খাটতে হয় ইস্পাহানিকে। তবে প্রতিবারই
জেল খেটে বেরিয়ে আসার পর ইস্পাহানির ত্রাসের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। বক্তব্য
জানতে ফোন করা হয় হাসানুজ্জামান ইস্পাহানির মোবাইল ফোনে। খটকা লাগে। ও
প্রান্ত থেকে ওয়েলকাম টিউন হিসেবে ভেসে আসে সুরা ইয়াসিনের তেলাওয়াত। ভুল
হলো না তো! অন্য কারও নম্বর নয় তো এটি। কয়েক দফার চেষ্টায় ও প্রান্ত থেকে
সাড়া মেলার পর নিশ্চিত হওয়া গেল ওটা ইস্পাহানিরই নম্বর। এক কথায় সব অভিযোগ
অস্বীকার করেন ইস্পাহানি। কাতর কণ্ঠে বলেন, আমি কিছুই করিনি। ইস্পাহানির
বক্তব্য, বিয়ে বাড়ি থেকে কনে উঠিয়ে আনতে যায়নি সে। এ বিরোধ দেনাপাওনা নিয়ে
আমার ঘরের মধ্যেই।
No comments:
Post a Comment