Monday, May 19, 2014

শক্তিশালী বিরোধী দলের খোঁজে মোদি

ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি ১৫তম লোকসভা বিলুপ্ত ঘোষণা করেছেন। ফলে ১৬তম লোকসভা শুরুর আগেই দেখা দিয়েছে সঙ্কট। সেই সঙ্কট হলো বিরোধী দল কে হবে তা নিয়ে। এ নির্বাচনে কোন দলই বিরোধী দলের বেঞ্চে বসার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পারে নি। কারণ, ঐতিহ্যবাহী কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, এআইএএমডি কোন দলই বিরোধী দলে বসার মতো আসন পায় নি। 
তাই নিজে সরকার গঠনের মতো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পর আগামী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এখন মাথাব্যথা বিরোধী দল নির্বাচন করা নিয়ে। বিরোধী দলে বসতে হলে লোকসভার মোট আসনের শতকরা ১০ ভাগ আসন পেতে হবে। এক্ষেত্রে আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৪টি। এ বিষয়ে লোকসভার সচিবালয় থেকে বলা হয়েছে, কংগ্রেস যেহেতু ৫৪ আসন অতিক্রম করতে পারে নি তাই তারা সরকারিভাবে কোন বিরোধী দল থাকছে না ১৬তম লোকসভায়। ফলে কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী বিরোধীদলীয় নেতাও হতে পারছেন না। তবে সচিবালয় থেকে বলা হয়, এমন একটি অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল ১৯৮৪ সালের নির্বাচনের পর। তখন তেলুগু দেশম পার্টি যে পদ্ধতিতে পি উপেন্দ্রকে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত করেছিল রাহুল গান্ধী সেই পদ্ধতিতে বিরোধীদলীয় নেতা হতে পারেন। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার এত লজ্জাজনক অবস্থায় উপনীত হয়েছে যে, তারা এখন বিরোধী দলের আসনে বসতে পারবে কিনা সে জন্য স্পিকারের করুণার দিকে তাকিয়ে আছে। যদি বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচন করা না যায় তাহলে কি হবে ১৬তম লোকসভায়! এতে থাকবে বিভিন্ন বিরোধী দল। এর মধ্যে কয়েকটি দল আছে, যারা প্রায় কাছাকাছি আসন পেয়েছে। তাদের সব দলেরই নিজস্ব নেতা থাকবে। ফলে বিশেষ কোন একক ব্যক্তি বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে বাড়ি-গাড়ি, বেতন-ভাতা না-ও পেতে পারেন। তিনি পাবেন না ডেপুটি স্পিকারের পাশে পার্লামেন্টের বাম সারিতে প্রথম আসন। পাবেন না পার্লামেন্ট হাউজে কোন সচিবালয় ও অন্যান্য সুবিধা। এমন অবস্থা হয়েছিল লোকসভার প্রথম তিনটি পার্লামেন্টে। তখন কংগ্রেসের প্রাধান্য ছিল। স্বীকৃত কোন বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন না তখন। এক্ষেত্রে এবার যদি বিরোধী স্পিকার বা পার্লামেন্টবিষয়ক মন্ত্রণালয় রাহুল গান্ধীকে বিরোধীদলীয় নেতার মর্যাদা দেয়ও তাহলে তিনি ওইসব সুবিধা না-ও পেতে পারেন। এসব নিয়ে ভারতে নির্বাচন পরবর্তী চায়ের কাপে ঝড় উঠেছে। ১২৩ কোটি মানুষের দেশ ভারত তার নতুন সরকার পেয়ে গেছে। একটি বড় প্রশ্নের সমাধান মিলে গেছে সেখানে। কিন্তু এর পরেই যে প্রশ্নটি এসে সামনে দাঁড়িয়েছে তাতে কে বসবেন বিরোধীদলীয় নেতার আসনে তা নিয়ে ভারতীয় মিডিয়ায় চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে। কংগ্রেস এমনিতেই নির্বাচনে খারাপ ফল করে দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছে। এ অবস্থায় রাহুল গান্ধী বিরোধীদলীয় নেতার আসন গ্রহণ করতে আগ্রহী হবেন কিনা তা-ও পরিষ্কার নয়। যদি পার্লামেন্টে কোন শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকে তাহলে মোদির সরকার অনায়াসে যে কোন পদক্ষেপ নিয়ে নিতে পারবে।
পার্লামেন্ট বিলুপ্ত করলেন প্রেসিডেন্ট
প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি গতকাল ১৫তম লোকসভা বিলুপ্ত করেছেন। নতুন লোকসভা শুরুর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি এ পদক্ষেপ নিলেন। রাষ্ট্রপতি ভবনের প্রেস সেক্রেটারি বেণু রাজামণি বলেন, প্রেসিডেন্ট মন্ত্রিপরিষদের পরামর্শ গ্রহণ করেছেন এবং গতকাল তিনি সংবিধান অনুযায়ী ১৫তম লোকসভা বিলুপ্তির আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। এর আগে শনিবার বিদায়ী সরকারের মন্ত্রিপরিষদ প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের অধীনে সর্বশেষ বৈঠক করেন। তারা অবিলম্বে প্রেসিডেন্টকে ১৫তম লোকসভা বিলুপ্ত করার জন্য পরামর্শ দেন। এর পরে পার্লামেন্ট বিষয়ক মন্ত্রী কমল নাথ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং মন্ত্রিপরিষদের সুপারিশ তার হাতে তুলে দেন। নির্বাচন কমিশন এখন নতুন লোকসভার নবনির্বাচিত সদস্যদের নামের তালিকা তুলে দেবে প্রেসিডেন্টের হাতে।
আদবানির সঙ্গে মোদির সাক্ষাৎ
গতকাল দফায় দফায় দিল্লিতে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী হতে যাওয়া নরেন্দ্র মোদি। এসব বৈঠকে তিনি নতুন সরকার কিভাবে গঠন করবেন সেই পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন। তিনি সাক্ষাৎ করেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিজেপির সাবেক সিনিয়র নেতা এল কে আদবানির সঙ্গে। দীর্ঘ ৪০ মিনিট তার বাসভবনে ওই বৈঠক হয়। এরপর তার বৈঠক করার কথা বিজেপির প্রেসিডেন্ট রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে। সেই বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের নাম চূড়ান্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জয়ললিতাকে মোদির অভিনন্দন
তামিলনাড়ুতে অভাবনীয় সাফল্য পাওয়ায় সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। তাকে একটি চিঠি লিখেছেন তিনি। এছাড়া গতকাল বিকালে তিনি ফোন করেন জয়ললিতাকে। সরকারের ইস্যু করা এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এ সময় নরেন্দ্র মোদি তাকে পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তামিলনাড়ুতে জয়ললিতার বিজয় নিয়ে গতকাল দ্য হিন্দু পত্রিকায় একটি সম্পাদকীয়তে বলা হয়, তামিলনাডুকে জয়ললিতার নেতৃত্বে এআইএডিএমকে’র (অল ইন্ডিয়া দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাগাম) নিরঙ্কুশ বিজয় অনেক দিক দিয়ে নজিরবিহীন। কোন মিত্র দল ছাড়াই দলটি রাজ্যের ৩৯টি আসনের ৩৭টিতে জয়ী হয়েছে। কয়েক দশক ধরে এ আসনে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে জোটের ভিত্তিতে। তামিলনাডুর সামপ্রতিক নির্বাচনী হাওয়া বিবেচনায় এ সাফল্য বিরল। এখানে প্রধান ধারার রাজনীতিতে রাজ্য ও লোকসভা নির্বাচনগুলোতে জোটভুক্ত হওয়াটাই নিরাপদ ছিল। দলটির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাগাম কোন গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দল ছাড়া লড়াইয়ে নামায় সেটা অবশ্য এআইএডিএমকে দলকে সাহায্য করেছে। এদিকে তারা নির্বাচনে শরিক দলগুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছে যার মধ্যে বামপন্থি দু’টি দল রয়েছে। ওই দল দু’টিকে প্রাথমিক শরিক দল হিসেবে স্বাগত জানানো হয়েছিল, কিন্তু কোন আসন দেয়া হয়নি। ডিএমকে কংগ্রেসের সঙ্গে জোটভুক্ত না হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর অন্য কোন দলকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার বিজয় আরও অসামান্য। কেননা, ডিএমকে একটিও আসন জিততে পারেনি। ভোটের ভাগ অনুযায়ী এআইএডিএমকে ৪৪.৩ শতাংশ ভোট পেয়েছে- যা ডিএমকের তুলনায় ২০ শতাংশেরও বেশি ভোট। জয়ললিতার দল যে দু’টি আসন হারিয়েছে তার একটি বিজেপির কাছে কন্যাকুমারীতে। অপরটি ধর্মপুরি আসনে পাতালি মাকাল কাচি দলের কাছে। এর কারণ হলো এলাকা দু’টিতে জাত, গোত্র ও ধর্মীয় মেরুকরণ। কন্যাকুমারীতে নির্বাচনকে হিন্দু খ্রিস্টান লড়াইয়ে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি। আর ধর্মপুরিতে জাতের ভিত্তিতে ভানিয়ার ভোটারদের একীভূত করতে পেরেছে পিএমকে। এছাড়াও এবারের নির্বাচনে জয়ললিতার অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে। কারণ তার দল পুনরায় ক্ষমতায় আসবে না এমন মনোভাব জনমনে ছিল না। যদিও তার সরকার মাত্র ৩ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে। ক্ষমতায় আবার না আসার সম্ভাবনা যদি কারও ছিল সেটা হলো ডিএমকের। দলটি গত বছর পর্যন্ত কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউপিএ জোট সরকারের অংশ ছিল। যে জোট এবার তামিলনাডুতে একটিও আসন জিততে পারেনি। আর এআইএডিএমকে প্রথাগত ক্ষমতায় পুনরায় ফিরে না আসার আশঙ্কা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। এখনও তামিলনাডুর ভোটারদের চিন্তা-ভাবনায় দলটির দারুণ প্রভাব এটাই প্রমাণ করে যে, জাতীয় পর্যায়ে জয়ললিতার শক্তি বিবেচনাযোগ্য। অবস্থান টিকিয়ে রাখার জন্য বিজেপি সরকারের হয়তো অন্য কোন দলের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে না। তারপরও এআইএডিএমকে কেন্দ্রে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে। বিজেপি ও কংগ্রেসের পর লোকসভায় তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে এআইডিএমকে’র পর্যাপ্ত প্রতিনিধি রয়েছে যাদের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান লোকসভায় জোরালো ও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারবে দলটি। তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজু জনতা দল সহ অন্যান্য আঞ্চলিক দলের পাশাপাশি এআইএডিএমকে ধর্মনিরপেক্ষতার ভূমিকা পালন করতে পারবে। যে কোন প্রকার কর্তৃত্বপরায়ণ সম্ভাবনা যা কিনা সামনের দিনগুলোতে আবির্ভূত হতে পারে তেমন প্রবণতা গণতান্ত্রিক মানদ-ে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করতে পারবে দলটি।

No comments:

Post a Comment