বিশ্বকাপ মুহূর্তেই একজন খেলোয়াড়কে জাতীয় বীরে পরিণত করতে পারে। জিওফ
হার্স্টের কথাই ধরুন। ওয়েস্টহ্যাম ইউনাইটেডের এই ফুটবলার ১৯৬৬ সালের
বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড দলের মূল একাদশের খেলোয়াড় হিসেবে কোচ আলফ রামসের
ভাবনাতেই ছিলেন না। তারকা স্ট্রাইকার জিমি গ্রেভেসের চোটের কারণে তিনি
হঠাত্ই সুযোগ পান মাঠে নামার। এই হার্স্টের গোলেই কিনা এসেছিল এই অবধি
ইংল্যান্ডের একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপা!

হাওয়া থেকে কোনো খেলোয়াড়ের জাতীয়
বীরে পরিণত হওয়ার এরচেয়ে দারুণ গল্প আর কী হতে পারে! জিওফ হার্স্ট
ছেষট্টির ফাইনালের রাজা। তাঁর পা থেকে এসেছিল এযাবত্কালে বিশ্বকাপের
ফাইনালে একমাত্র হ্যাটট্রিকটিও। অথচ এই খেলোয়াড়টিকে কিনা প্রথম একাদশেই
ভাবেননি কোচ রামসে! ওয়েম্বলির ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ১৬
মিনিটেই এক গোলে পিছিয়ে পড়েছিল ইংল্যান্ড। জার্মানির হেলমুট হ্যালারের ওই
গোলটি শোধ দিয়েছিলেন হার্স্টই। পরে মার্টিন পিটারের দ্বিতীয়ার্ধের গোল
ইংল্যান্ডকে ২-১-এ এগিয়ে নিলেও খেলার ৮৯ মিনিটে উলফগ্যাং ওয়েবারের আরও একটি
সমতাসূচক গোল খেলাটিকে নিয়ে যায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ে
হার্স্টের দ্বিতীয় গোলটি ইতিহাসে কুখ্যাত বিতর্কিত এক গোল হিসেবে। তাঁর শট
ক্রসবারে লেগে গোল লাইনের ওপরে পড়লেও তা গোল হিসেবে ঘোষণা দেন রেফারি
গটফ্রাইড ডিয়েনস্ট। পশ্চিম জার্মানির খেলোয়াড়দের তীব্র প্রতিবাদের মুখে
সোভিয়েত লাইন্সম্যান তোফিক বাখামভের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করে ডিয়েনস্টের
সেই ঘোষণা আজও বিতর্কের ঝড় তোলে ফুটবল বিশ্বে। তবে হার্স্ট খেলার একেবারে
শেষ মুহূর্তে ববি মুরের পাস থেকে নিজের হ্যাটট্রিকটি পূরণ করে বিতর্কিত সেই
গোলের ‘বদনাম’ থেকে রক্ষা করেন ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়কে।আরও একটি
বিশ্বকাপ সামনে রেখে বিখ্যাত ফুটবল সাময়িকী ওয়ার্ল্ড সকারের কাছে নিজেদের
বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন ফুটবলগ্রেটরা। গত দুই দিন প্রথম আলো
অনলাইনের পাঠকেরা পড়েছেন ইয়োহান ক্রুইফ ও ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের কথা। আজ
প্রকাশিত হলো ইংল্যান্ডের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক জিওফ হার্স্টের কথা।
হার্স্ট অকপটেই স্বীকার করেছেন, ছেষট্টির ফাইনালে তাঁর দ্বিতীয় গোলটি আসলে
গোল ছিল না। প্রিয় পাঠক, কথা না বাড়িয়ে চলে যাওয়া যাক হার্স্টের জবানিতেই—
কোচ আলফ রামসের অধীনে ইংল্যান্ডের ছেষট্টির বিশ্বকাপ দলটি ছিল অসাধারণ
প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের সমারোহ। আবার ওই দলটিতে তুলনামূলক কম প্রতিভাবান অথচ
মানসিকতায় দৃঢ় খেলোয়াড়ের সংখ্যাও কম ছিল না। সত্যি বলছি, পুরো বিশ্বকাপে
আমরা কখনোই হেরে যাওয়ার কথা চিন্তা করিনি। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ শেষ
মুহূর্তের গোলে জার্মানরা ফাইনাল খেলাটি অতিরিক্ত সময়ে নিলেও আমরা
মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে উল্টো তাদের দুটো গোল দিতে পেরেছিলাম। বেশির ভাগ
সময়ই এমন পরিস্থিতিতে দলগুলো মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ২-২ গোলে
অমীমাংসিত অবস্থায় খেলাটি যখনই অতিরিক্ত সময়ে গড়াল, তখন কোচ রামসে আমাদের
দারুণ একটা কথা বলে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা তাদের
ইতিমধ্যেই হারিয়ে দিয়েছ। যাও অতিরিক্ত সময়ে মাঠে গিয়ে ওদের আবারও হারাও।’
রামসের এই কথায় পুরো দল এমনভাবে উজ্জীবিত হয়েছিল যেন তারা সম্পূর্ণ নতুন
একটা ম্যাচে মাঠে নামছে। পরিণতি সবারই জানা, আমরা অতিরিক্ত সময়ে জার্মানিকে
আরও দুই গোল হজম করতে বাধ্য করেছিলাম। ৪-২ গোলে জিতে আমরা ওয়েম্বলির
দর্শকদের আনন্দে ভাসিয়ে জিতে নিয়েছিলাম বিশ্বকাপ।
অতিরিক্ত সময়ে আমরা শারীরিকভাবে জার্মানদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ছিলাম। আমাদের খেলোয়াড়দের কমিটমেন্ট ছিল অনন্য। পুরো দলটিই টগবগ করছিল অফুরন্ত আত্মবিশ্বাসে। সেদিনকার ফাইনালে আমি বুঝতে পেরেছিলাম জয়ের অদম্য বাসনা কীভাবে একটি দলের শক্তি হয়ে কাজ করতে পারে। সবাই আমার দ্বিতীয় গোলটি নিয়ে কথা বলে। এবার আসি সেই আলোচনায়। আমি গোলটির ব্যাপারে জার্মানদের হতাশার দিকটা বুঝতে পারি। তাদের ধারণা, ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে সম্মাননাটা তাদের হাত থেকে একপ্রকার কেড়েই নেওয়া হয়েছে ওই গোলটির মাধ্যমে। তারা হয়তো তাদের দিক দিয়ে এক অর্থে ঠিকই। ৪৮ বছর ধরে গোলটি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। আমি নিজেও শতাধিকবার টেলিভিশনে গোলটির পুনঃপ্রচার দেখেছি। সবকিছু বিচার-বিবেচনা করে আমার মনে হয়, আসলেই আমার ওই শটে বল গোললাইন অতিক্রম করেনি। অর্থাত্ ওটা মোটেও গোল ছিল না।
খেলার শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো এক অনাবিল প্রশান্তিতে আমার মন-প্রাণ ছেয়ে গেল। একই ধরনের ব্যাপার ঘটেছিল ছেষট্টির বিশ্বকাপ দলে আমার নাম দেখে। একাদশে সুযোগ পেয়েও মনে হয়েছিল যেন দারুণ কিছু পেয়ে গেছি। ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে ওয়েম্বলিতে সেদিন উপস্থিত ৯৬ হাজার দর্শককে আনন্দের সাগরে ভাসাতে পেরে অদ্ভুত তৃপ্তি অনুভব করেছিলাম।
ফাইনালের পর আমরা সবাই স্বাভাবিক জীবনেই ফিরেছিলাম। ব্যাপারটা যেন ছিল হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে হঠাত্ মাটিতে নেমে আসা। সেদিন ছিল সোমবার, ১৯৬৬ সালের ৩০ জুলাই। এরপর আমার জীবনে আরও অনেক সোমবার এসেছে, আমি বাড়ির সামনের ঘাস কেটেছি, নিজের গাড়ি ধুয়েছি। কিন্তু ছেষট্টির ওই সোমবারটি এখনো আমার স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে।
অতিরিক্ত সময়ে আমরা শারীরিকভাবে জার্মানদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ছিলাম। আমাদের খেলোয়াড়দের কমিটমেন্ট ছিল অনন্য। পুরো দলটিই টগবগ করছিল অফুরন্ত আত্মবিশ্বাসে। সেদিনকার ফাইনালে আমি বুঝতে পেরেছিলাম জয়ের অদম্য বাসনা কীভাবে একটি দলের শক্তি হয়ে কাজ করতে পারে। সবাই আমার দ্বিতীয় গোলটি নিয়ে কথা বলে। এবার আসি সেই আলোচনায়। আমি গোলটির ব্যাপারে জার্মানদের হতাশার দিকটা বুঝতে পারি। তাদের ধারণা, ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে সম্মাননাটা তাদের হাত থেকে একপ্রকার কেড়েই নেওয়া হয়েছে ওই গোলটির মাধ্যমে। তারা হয়তো তাদের দিক দিয়ে এক অর্থে ঠিকই। ৪৮ বছর ধরে গোলটি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। আমি নিজেও শতাধিকবার টেলিভিশনে গোলটির পুনঃপ্রচার দেখেছি। সবকিছু বিচার-বিবেচনা করে আমার মনে হয়, আসলেই আমার ওই শটে বল গোললাইন অতিক্রম করেনি। অর্থাত্ ওটা মোটেও গোল ছিল না।
খেলার শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো এক অনাবিল প্রশান্তিতে আমার মন-প্রাণ ছেয়ে গেল। একই ধরনের ব্যাপার ঘটেছিল ছেষট্টির বিশ্বকাপ দলে আমার নাম দেখে। একাদশে সুযোগ পেয়েও মনে হয়েছিল যেন দারুণ কিছু পেয়ে গেছি। ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে ওয়েম্বলিতে সেদিন উপস্থিত ৯৬ হাজার দর্শককে আনন্দের সাগরে ভাসাতে পেরে অদ্ভুত তৃপ্তি অনুভব করেছিলাম।
ফাইনালের পর আমরা সবাই স্বাভাবিক জীবনেই ফিরেছিলাম। ব্যাপারটা যেন ছিল হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে হঠাত্ মাটিতে নেমে আসা। সেদিন ছিল সোমবার, ১৯৬৬ সালের ৩০ জুলাই। এরপর আমার জীবনে আরও অনেক সোমবার এসেছে, আমি বাড়ির সামনের ঘাস কেটেছি, নিজের গাড়ি ধুয়েছি। কিন্তু ছেষট্টির ওই সোমবারটি এখনো আমার স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে।
No comments:
Post a Comment