Wednesday, May 21, 2014

ডোবার পানিই ভরসা

মুজিবনগর উপজেলার তারানগর গ্রামের মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা ডোবার পানি। এ পানি দেখলে মনে হয় আলকাতরা ধোয়া এবং পচা। ছোট ছোট পোকা সাঁতার দিচ্ছে তাতে। 
গন্ধে ব্যাঙ পর্যন্ত পালিয়েছে ডোবা থেকে। সুপেয় পানির ব্যবস্থা না থাকায় গ্রামের এক পাশের ডোবার নোংরা পানিই এখন গ্রামবাসীর ভরসা। গোটা গ্রামের ভূ-গর্ভে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক হওয়ায় বার বার চেষ্টা করেও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে পারেনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। মুজিবনগর উপজেলার তারা নগর গ্রামে বসবাস করে প্রায় ২ হাজার ২শ ৫৮ জন মানুষ। বহু দিন ধরে আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করায় ইতিমধ্যেই আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে বেশ কয়েকজন। বর্তমানে আর্সেনিকোসিস রোগে আক্রান্তের সংখ্যা রয়েছে প্রায় ২শ’ ৪৮ জন। বিভিন্ন এনজিওর দেয়া সুপেয় পানির উৎসগুলো নষ্ট হয়ে গেছে অনেক আগেই। এই নিয়ে চিৎকারও করেছে গ্রামবাসী। আর্সেনিকোসিস রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসা বৃদ্ধির দাবিতে মানববন্ধনও করেছে এলাকার মানুষ। আগে গ্রামটিতে আর্সেনিকের মাত্রা কম থাকলেও বর্তমানে এর মাত্রা দাড়িয়েছে ৯৩ দশমিক ৫৮ ভাগ। গ্রামটি ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন সময়ে এনজিও কর্তৃক দেয়া অধিকাংশ রিংওয়েল টিউবয়েল অকেজো। যে কয়েকটি সচল আছে তাতে পানির পরিবর্তে কাদামাটি উঠছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এরূপ হচ্ছে বলে জানিয়েছে ভুক্তভোগীরা। দীর্ঘদিন ধরে সুপেয় পানির কোন ব্যবস্থা না হওয়ায় গ্রামের এক পাশের একটি ডোবা থেকে অপরিষ্কার পানি সংগ্রহ করে তা নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করছে গ্রামবাসী। গৃহবধূরা ডোবাটি থেকে পানি সংগ্রহ করছেন। বছর তিনেক আগে সেভ দ্য চিলড্রেন গ্রামবাসীর মাঝে সুপেয় পানি সরবরাহ করার লক্ষ্যে একটি সিডকো প্লান্ট স্থাপন করে। কিন্তু বিদ্যুৎ সংযোগের অভাবে তা কোন কাজেই আসেনি। তারানগর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থা আরো খারাপ। মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক শনাক্ত হওয়ায় অন্তত চারটি পানির উৎস সৃষ্টি করা হয়েছে। যার তিনটিই এখন বন্ধ। আর্সেনিক থাকার পরও একটি এনজিওর দেয়া ফিল্টারের মাধ্যমে পানি পান করছে শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, এখানে প্রায় ৩শ’ শিক্ষার্থীকে পাঠদান করা হয়। কিন্তু চৈত্রের তাপদাহে পানির চাহিদা বেড়ে গেছে। কয়েকটি ফিল্টার দিয়ে তাদের পানির চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। এতে করে অনেক শিক্ষার্থীই বাধ্য হয়ে আর্সেনিক মিশ্রিত পানি পান করছে। কারিতাস দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন বিভাগের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময়ে গ্রামবাসীর সঙ্গে সভা সেমিনার ওঠোন বৈঠক করে আর্সেনিকের ভয়াবহতার বিষয়টি অবহিত করার পাশাপশি আর্সেনিকে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করছে। মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাসান আলী জানিয়েছেন, দেশের অস্থিতিশীল অবস্থার কারণে এবারে আর্সেনিক আক্রান্তের কোন তালিকা তৈরি করা হয়নি। গ্রামবাসীর ডোবার পানি ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, অবশ্যই ডোবার পানি ফুটিয়ে পান করতে হবে। তা না হলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা আছে। মুবিজনগর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কার্যালয় থেকে আর্সেনিক কবলিত তারানগর গ্রাামের কোন তথ্য না পেলেও একটি এনজিও সূত্রে জানা গেছে, অন্যান্য এলাকায় আর্সেনিক পরীক্ষা করে সর্বোচ্চ ৫০ পিপিবি মাত্রা হলেও শুধু তারানগর গ্রামের পানির উৎসে ৩০০ পিপিবি থেকে ৭০০ পিপিবি পর্যন্ত  আর্সেনিক পাওয়া গেছে। যার অবস্থা বিষের মতো। মেহেরপুর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল ওয়াদুদ জানিয়েছেন, জেলার ভোলাডাঙ্গা, আলমপুর, আমঝুপি ও তারানগর এলাকাগুলোতে অধিকমাত্রায় আর্সেনিক শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে তারানগর গ্রামটির অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ। গ্রামটিতে ১৬৫টি নলকূপের মধ্যে মাত্র ৫টি টিউবওয়েল আর্সেনিকমুক্ত। যা দিয়ে গোটা গ্রামের মানুষের সুপয়ে পানির চাহিদা মেটানো অসম্ভব। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরর সুপেয় পানি সরবরাহ করার লক্ষ্যে সব চেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছে। এখানে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট সাপ্লাই ছাড়া কোনভাবেই সুপেয় পানির উৎস তৈরি সম্ভব নয়।

No comments:

Post a Comment