বর্বরতা আর নৃশংসতার আরেক নজির স্থাপন হলো নারায়ণগঞ্জে। একসঙ্গে অপহরণের
পর ছয় জনের লাশও পাওয়া গেল একসঙ্গে। হাত-পা বেঁধে হত্যার পর তাদের ফেলে
দেয়া হয়েছিল নদীতে। লাশ গুম করার উদ্দেশে লাশের সঙ্গে বেঁধে দেয়া হয়েছিল
২৪টি করে ইট। পানির নিচে পচে গলে লাশ ভেসে ওঠে নদীতে। আর এই লাশ উদ্ধারের
পর শোক আর ক্ষোভে একাকার হয়ে পড়ে গোটা নারায়ণগঞ্জ। স্তব্ধ, নির্বাক
মানুষগুলো প্রতিবাদে নেমে আসেন রাস্তায়। গুম-অপহরণ নিয়ে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া
আতঙ্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে নৃশংস এই অপহরণ ও হত্যাকা-ের ঘটনা।
জনপ্রতিনিধি, আইনজীবী ও তাদের সহযোগী ও সহকর্মীদের লাশ উদ্ধারের পর গতকাল
বিকাল থেকে বিক্ষোভের আগুনে জ্বলছে নারায়ণগঞ্জ।

ঢাকা-চট্টগ্রাম
মহাসড়কের স্থানে স্থানে বিক্ষোভ করেছেন সাধারণ মানুষ। ভাঙচুর ও
অগ্নিসংযোগের কারণে বিকাল থেকেই গুরুত্বপূর্ণ এই রাস্তায় যান চলাচল ছিল
বন্ধ। রাতে এ রিপোর্ট লেখার সময়ও রাস্তা বন্ধ করে বিক্ষোভ করছিলেন এলাকার
লোকজন।
অপহরণের ৭৩ ঘণ্টা পর অপহৃত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকারসহ একে একে ৬ জনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে একসঙ্গে অপহরণের পর এতগুলো লাশ উদ্ধারের ঘটনা এটাই প্রথম। এমন হৃদয়বিদারক ঘটনায় নির্বাক নারায়ণগঞ্জবাসী। সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের মৃত্যুর সঙ্গে ৬টি লাশ উদ্ধারের ঘটনায় শোকাহত নারায়ণগঞ্জ। বুধবার দুপুর ৩টায় বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের শান্তিনগর এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় প্রথমে প্যানেল মেয়র নজরুলের লাশটি উদ্ধার করে পুলিশ। একই সময় নজরুলের লাশের সঙ্গে নদীর একই এলাকায় নির্দিষ্ট দূরত্বে আরও ৫টি লাশ নদীতে ভেসে ওঠে। এর মধ্যে নজরুল ইসলামের সহযোগী মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারের গাড়িচালক ইব্রাহিমের লাশ বলে শনাক্ত হলেও একটি লাশ শনাক্ত হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে ওই লাশটি প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের বন্ধু লিটন অথবা গাড়িচালক জাহাঙ্গীরের। লাশগুলো উদ্ধারের পর স্বজনদের আহাজারিতে শীতলক্ষ্যার বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। এদিকে নজরুল ইসলামসহ অপহৃতদের লাশ শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধারের খবরে সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় এলাকায় বিকাল ৪টা থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে গাড়ি ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়। বিক্ষোভকারীরা সড়কের উপর বড় বড় গাছের গুঁড়ি ফেলে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। বিক্ষুব্ধ লোকজন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও নারায়ণগঞ্জ-চিটাগাংরোড সড়ক অবরোধ করেন। দু’টি সড়কের অর্ধশতাধিক স্থানে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। ভাঙচুর করা ৩০-৩৫টি যানবাহন। মৌচাক বাসস্ট্যান্ডে আওয়ামী লীগ নেতার মালিকানাধীন শামস ফিলিং স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। আতঙ্কে বন্ধ হয়ে যায় সিদ্ধিরগঞ্জপুল, মিজমিজি, চিটাগাংরোড, শিমরাইল, মৌচাক, সানারপাড়সহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোন তৎপরতা ছিল না। পুরো এলাকা বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত। উদ্ধারকৃত ৬টি লাশের ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
গতকাল রাত সাড়ে ১১টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের লাশ নগর ভবনের সামনে নেয়া হয়। সেখানে প্রথম দফা জানাযা শেষে তার লাশ নারায়ণগঞ্জের ৩০০ শয্যা হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। আজ সকাল ১০টায় তার লাশ তার নিজ এলাকা ২ নম্বর ওয়ার্ডে নেয়া হবে। স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় দফা জানাযা শেষে পারিবারিক কবরাস্থানে লাশ দাফন করা হবে। এদিকে অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার সরকারের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে রাত সাড়ে ১২টার দিকে শহরের মাজদাইর শশ্মান ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাতেই তার লাশ দাহ করা হয়। এছাড়া অপর চার জনের লাশও ময়নাতদন্ত শেষে নারায়ণগঞ্জের ৩০০ শয্যা হাসপাতালের হিম ঘরে রাখা হয়েছে। সকালে প্রত্যেকের স্বজনদের কাছে লাশগুলি হস্তান্তর করা হবে। নারায়ণগঞ্জ সিটি মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী নিজে উপস্থিত থেকে এসব তত্ত্বাবধান করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধারকৃত এই ছয় লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন জেলার সিভিল সার্জন দুলাল চন্দ্র চৌধুরী। ময়নাতদন্ত শেষে তিনি বলেন, প্রত্যেকটি লাশের মাথায় ক্ষত রয়েছে। অচেতন করার জন্য হত্যার আগে প্রত্যেকের মাথায় ভাড়ি বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। পরে তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। তিনি বলেন, লাশগুলি গুম করার জন্য নদীতে ফেলার আগে প্রত্যেক লাশের পেট ফুটো করে দেয়া হয়। যাতে লাশ গুলি ডুবে থাকে।
যেভাবে লাশগুলো উদ্ধার ও শনাক্ত হয়
এদিকে দুপুর ৩টায় বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের শান্তিনগর এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে ৩টি লাশ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেয়। খবর পেয়ে বন্দর থানার ওসি আক্তার মোর্শেদ ঘটনাস্থলে ছুটে যান। বিকাল ৩টার দিকে চারদিকে খবর রটে যায় শীতলক্ষ্যায় লাশের খবর। লাশ ভাসার খবরে পাগলের মতো ছুটে আসে রোববার নিখোঁজ হওয়া ৭ পরিবারের স্বজনরা। যদিও স্বজনদের আগেই নদীর পাড়ে উৎসুক মানুষ ভিড় করে নদীর পূর্বপাড়ের কলাগাছিয়ার শান্তিনগর এলাকায়। যেখানে লাশগুলো ভাসছিল। বন্দর থানার ওসি আকতার মোর্শেদের নেতৃত্বে পুলিশ একে একে লাশগুলো উদ্ধার করে যখন তীরে নিয়ে আসছিল তখন নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা হুমড়ি খেয়ে লাশের সামনে। প্রথমে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা এবং মুখে দাড়ি আছে এমন একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে লাশটি নাসিকের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের বলে শনাক্ত করেন নিহতের ছোটভাই আবদুস সালাম ও স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। পৌনে এক ঘণ্টা পর নজরুলের সহযোগী মনিরুজ্জামান স্বপনের লাশ শনাক্ত করে তার ছোট ভাই রিপন। ৩টি লাশের মধ্যে ২টি লাশ শনাক্ত হওয়ার খবরে ঘটনাস্থলের আশপাশে সাধারণ মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। এরপর নদী থেকে উদ্ধার হয় আরেকটি লাশ। পরে ওই লাশটি নিখোঁজ সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকারের গাড়িচালক ্ইব্রাহিমের লাশ বলে শনাক্ত করে নিহতের ভাগ্নে আবুবকর ও সাঈদ। বিকাল পৌনে ৬টায় উদ্ধার হয় আরেকটি লাশ। লাশটি প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের সহযোগী তাজুল ইসলামের বলে শনাক্ত করে তার ভাই আনিস ও বোন শিরিন আক্তার। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় উদ্ধার হয় আরেকটি লাশ। লাশগুলো নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে নেয়ার পর রাত সোয়া ৮টার দিকে হাতের ব্রেসলেট ও কাপড়-চোপড় দেখে সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকারের লাশ শনাক্ত করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা বারের সভাপতি এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ও নিহতের ভাগ্নি। অপর একটি লাশের পরিচয় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শনাক্ত হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে ওই লাশটি নিহত প্যানেল মেয়রের বন্ধু লিটন অথবা গাড়িচালক জাহাঙ্গীরের।
প্রতিটি লাশ ভারি বস্তু দিয়ে বাঁধা
ঘাতকরা পরিকল্পিতভাবে অপহৃতদের হত্যাকা- ঘটিয়ে লাশ গুম করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে। আর এজন্যই হত্যার পর লাশগুলো যাতে শনাক্ত বা পাওয়া না যায় সেজন্য প্রতিটি লাশের পেছন থেকে হাত ও পা বাঁধা হয়। এরপর প্লাস্টিকের বস্তায় সারিবদ্ধ করে ১২টি করে ইট ভরা হয়। সূক্ষ্মভাবে বস্তাটিকে একটি প্যাকেটে বানানো হয়। এরপর লাশের পায়ের সঙ্গে দু’টি করে ইটের ওই বস্তা বেঁধে দেয়া হয়। যাতে লাশগুলো ভেসে না ওঠে। তবে নিহত নজরুলের হাত পিঠ মোড়া করে এবং পা বাঁধা ছিল। লাশ যাতে ভেসে না ওঠে সেজন্য নজরুলের পেট ফেঁড়ে দেয়া হয়। তার মুখম-ল পলিথিন দিয়ে মোড়ানো ছিল। মনিরুজ্জামান স্বপনের একটি হাতের কয়েকটি আঙুল কাটা ছিল। আইনজীবী চন্দনের মুখ এসিড দিয়ে ঝলসে দেয়া হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। লাশ উদ্ধার করতে যাওয়া বন্দর থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মোকাররম হোসেন সাংবাদিকদের জানান, এলাকাবাসীর খবর পেয়ে আমরা লাশ উদ্ধার করছি। প্রতিটি লাশই ইট দিয়ে বাঁধা ছিল। যেন লাশ ভেসে উঠতে না পারে তার জন্যই দুর্বৃত্তরা এটি করে থাকতে পারে। কারও কারও চেহারা ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না। পাঞ্জাবি-পাজামা পরা লাশ (নজরুল ইসলাম)টি প্রথমে শান্তিনগর এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি লাশের হাত-পা বাঁধা ছিল। মুখ পলিথিন দিয়ে মোড়ানো ছিল। কোন সংঘবদ্ধ চক্রই এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। বন্দর থানার ওসি আক্তার মোর্শেদ বলেন, শীতলক্ষ্যা নদীর বন্দরের শান্তিনগর এলাকার তীর থেকে ৬টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সব কয়টি লাশের পরিচয় শনাক্ত করেছে স্বজনরা।
লাশ উদ্ধারের পর বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এলাকাবাসী, পেট্রলপাম্পে আগুন, ভাঙচুর
এদিকে বিকাল ৩টার পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে প্যানেল মেয়র-২ নজরুল ইসলামের লাশ উদ্ধার হওয়ার খবরে আবারও রাস্তায় নামে নজরুলের সমর্থকরা। বিকাল ৪টার দিকে তারা সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় থেকে শিমরাইল মোড় পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং আদমজী সালেহা সুপার মার্কেট থেকে শিমরাইল মোড় পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ-চিটাগাং রোড সড়কের অর্ধশতাধিক পয়েন্টে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে। তারা অপহরণকারী হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও ফাঁসি দাবি করে বিভিন্ন সেøাগান দিতে থাকে। অবরোধের কারণে ওই দু’টি সড়কে সকল প্রকার যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে সকাল ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত ৪ ঘণ্টা একই সড়ক অবরোধ করে রেখেছিল বিক্ষুব্ধ লোকজন। অবরোধের কারণে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় ওই সড়কে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়ে শ’ শ’ মানুষ। বেলা ২টা দিকে অবরোধকারীরা সড়ক থেকে সরে গেলে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। কিন্তু লাশ উদ্ধারের পর ফের অবরোধের কারণে সিদ্ধিরগঞ্জের জীবনযাত্রা অনেকটা অচল হয়ে পড়ে। সিদ্ধিরগঞ্জ পুল, মিজমিজি, মৌচাক, সানারপাড়, শিমরাইল এলাকায় আতঙ্কে সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এক ভুতুড়ে নগরীতে পরিণত হয় ওই সব এলাকা। সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে আদমজী ইপিজেডসহ আশপাশের শতাধিক ফ্যাক্টরি ছুটি হলে হাজার হাজার ঘরমুখো শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তারা আটকা পড়ে। অনেকেই নিরুপায় হয়ে পায়ে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হন। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কোন তৎপরতা চোখে পড়েনি। রাত সাড়ে ৭টার দিকে মৌচাক বাসস্ট্যান্ডে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী ইয়াছিন মিয়ার মালিকানাধীন সামস ফিলিং স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেয় নিহত নজরুলের সমর্থকরা। বিভিন্ন পয়েন্টে বিক্ষুব্ধ লোকজন কমপক্ষে অর্ধশতাধিক গাড়ি ভাঙচুর করে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ও নারায়ণগঞ্জ-চিটাগাং রোড সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
আইনজীবীদের সড়ক অবরোধ, এসপি অফিস ঘেরাও
এদিকে টানা তৃতীয় দিনের মতো আদালত বর্জন করে অপহৃত আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারের সন্ধান দাবিতে প্রথমে আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করে। পরে সকাল ১১টায় আইনজীবীরা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডটি অবরোধ করে। ওই সময় ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আসার সময় আইনজীবীদের বাধার মুখে পড়েন। পড়ে তিনি গাড়ি থেকে নেমে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে যান। ওই সময় তিনি বিক্ষুব্ধ আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, অপহৃতদের উদ্ধারে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে আইনজীবীরা ডিআইজির কথায় আশ্বস্ত হতে পারেননি।
আইনজীবীদের ধারণা
নারায়ণগঞ্জের আইনজীবী নেতাদের ধারণা, কাউন্সিলর নজরুল ও তার সহযোগীদের অপহরণের ঘটনা এডভোকেট চন্দন দেখে ফেলায় গাড়িসহ (ঢাকা-মেট্রো-গ-২৭-৩৩৩৭) তাকে ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিমকেও অপহরণ করে নিয়ে যায়। ঘটনার সাক্ষী যাতে না থাকে এ জন্য চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালককে হত্যা করেছে ঘাতকরা। এডভোকেট চন্দন কুমার সরকারের ভাইপো এডভোকেট অরুনাথ কুমার সরকার জানিয়েছিলেন, ঘটনার দিন তার চাচা চন্দন সরকারের গাড়ি ও কাউন্সিলর নজরুলকে বহনকারী গাড়িটি আদালত প্রাঙ্গণ থেকে আগে পিছে বের হয়ে যেতে দেখেছেন তিনি। উল্লেখ্য, রোববার দুপুরে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার একটি মামলায় জামিন নিয়ে নারায়ণগঞ্জ আদালত থেকে বাসায় ফেরার পথে নাসিক প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার সহযোগী লিটন, মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর প্রাইভেটকারসহ অপহৃত হন। একই সময় নিখোঁজ হন সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম। এর মধ্যে ওই রাতে নজরুলের গাড়িটি গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়। সোমবার রাতে গুলশানের নিকেতন থেকে উদ্ধার হয় আইনজীবী চন্দন সরকারের গাড়ি।
সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান বন্ধ
নারায়ণগঞ্জে প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ ৭ জন অপহরণের ঘটনার পরে সারা দেশে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান স্থগিত করা হয়েছে। বুধবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান। এছাড়া, ৭ জন অপহরণের ঘটনায় ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশাসন) খন্দকার গোলাম ফারুককে প্রধান করে একটি ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) সাজ্জাদুর রহমান ও ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফুল আজিম। নারায়ণগঞ্জে একের পর এক খুন ও অপহরণের ঘটনা বেড়ে চলায় করণীয় সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে বিকল্প চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। জনগণের নিরাপত্তায় যতগুলো দিক রয়েছে সেগুলো বিবেচনা করা হবে।
নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় খালেদা জিয়ার নিন্দা
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নারায়ণগঞ্জে সাতজনকে অপহরণ ও তাঁদের ছয়জনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি এ নিন্দা জানান। বিবৃতিতে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, বর্তমান অবৈধ সরকার গোটা দেশকে একটি বধ্যভূমিতে পরিণত করেছে। মানুষের মৌলিক অধিকারকে গুড়িয়ে দিয়ে মানুষের চলাচলের স্বাধীনতা ও জীবন-জীবিকার নিরাপত্তাকে দুর্বিসহ ও বিপন্ন করে তোলার পর এখন মানুষের জীবন নিয়ে বেঁচে থাকাটাই দায় হয়ে পড়েছে। সরকার মানুষের শান্তি-স্বস্তি এবং নির্বিঘœ জীবন-যাপনের সব সুযোগ কেড়ে নিয়েছে। বর্তমান অবৈধ সরকার ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচন করার পরে জনমতকে আর তোয়াক্কাই করছে না। জনগণের রুদ্ররোষ থেকে বাঁচার জন্য তারা জনমনে ভীতি সৃষ্টির লক্ষ্যে গুম, খুন আর গুপ্ত হত্যার নৃশংস পথ অবলম্বন করেছে। খালেদা জিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দেশব্যাপী প্রতিনিয়ত গুম, খুন, অপহরণ ও বিচার বর্হিভূত হত্যাকা-ের দায় সরকার কোন অবস্থাতেই এড়াতে পারবে না। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে আজ আর কোন নিরাপত্তা নেই।
বিএনপি চেয়ারপারসন সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেন, এই মুহূর্তে মরণঘাতী অপহরণ, গুম ও গুপ্ত হত্যা বন্ধ না করলে সরকারকে চরম মূল্য দিতে হবে। যারা এই ঘৃণ্য অপকর্মের সঙ্গে জড়িত তাদের সব হিসাবই জনগণের কাছে সংরক্ষিত আছে। বিবৃতিতে তিনি জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের জন্য বিএনপির সব নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
‘দু-একদিনের মধ্যে বড় কিছু দেখতে পাবেন’
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, নারায়ণগঞ্জে অপহরণের ঘটনায় সরকারের পদক্ষেপের ব্যাপারে দু-একদিনের মধ্যে বড় কিছু দেখা যাবে। গতকাল নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে যান স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। সেখান থেকে বের হওয়ার পর ঘটনায় জড়িতদের এখনো গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না কেন এমন এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারায়ণগঞ্জে অপহরণের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন। দু-একদিনের মধ্যেই বড় কিছু দেখতে পাবেন।’
দেশ গুপ্ত ঘাতকদের লীলাভূমি: ফখরুল
নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশে গুম ও অপরহরণের নিন্দা জানিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশ গুপ্ত ঘাতকদের লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ঘটনাই তার চরম দৃষ্টান্ত। গতরাতে বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম-মহাসচিব রিজভী আহমেদ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে তিনি এ কথা বলেন, নারয়ণগঞ্জের ঘটনা তুলে ধরে মির্জা আলমগীর বলেন, আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি দেশের সকল রেকর্ডকে ভঙ্গ করেছে। গোটা জাতি এক বিভীষিকাময় আতঙ্ক ও ভীতির মধ্যে বাস করছে। বাসা থেকে বেরিয়ে পরিবারের কাছে ফিরতে পারবে কিনা; সে বিষয়ে প্রত্যেক নাগরিকই সংশয়ে ভুগছেন। প্রতিদিন মানুষ গুম হচ্ছে এবং কয়েকদিন পর তাদের লাশ দেশের কোনো না কোনো অঞ্চলে পাওয়া যাচ্ছে। বিবৃতিতে বলা হয়, রোববার নারায়ণগঞ্জে দিনে দুপুরে কাউন্সিলারসহ ৭ জনকে অপহরণ করা হয়। পরবর্তীতে বুধবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে মৃতদেহ ভাসতে দেখে স্থানীয় জনগণ পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ এসে ৬ জনের মৃতদেহ নদী থেকে উদ্ধার করে। এটা শুধু বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির বহিঃপ্রকাশই নয়। বরং গোটা দেশ গুপ্ত ঘাতকদের লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছে এটি তারই চরম দৃষ্টান্ত। সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে জনগণকে এর বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
অপহরণের ৭৩ ঘণ্টা পর অপহৃত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকারসহ একে একে ৬ জনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে একসঙ্গে অপহরণের পর এতগুলো লাশ উদ্ধারের ঘটনা এটাই প্রথম। এমন হৃদয়বিদারক ঘটনায় নির্বাক নারায়ণগঞ্জবাসী। সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের মৃত্যুর সঙ্গে ৬টি লাশ উদ্ধারের ঘটনায় শোকাহত নারায়ণগঞ্জ। বুধবার দুপুর ৩টায় বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের শান্তিনগর এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় প্রথমে প্যানেল মেয়র নজরুলের লাশটি উদ্ধার করে পুলিশ। একই সময় নজরুলের লাশের সঙ্গে নদীর একই এলাকায় নির্দিষ্ট দূরত্বে আরও ৫টি লাশ নদীতে ভেসে ওঠে। এর মধ্যে নজরুল ইসলামের সহযোগী মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারের গাড়িচালক ইব্রাহিমের লাশ বলে শনাক্ত হলেও একটি লাশ শনাক্ত হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে ওই লাশটি প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের বন্ধু লিটন অথবা গাড়িচালক জাহাঙ্গীরের। লাশগুলো উদ্ধারের পর স্বজনদের আহাজারিতে শীতলক্ষ্যার বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। এদিকে নজরুল ইসলামসহ অপহৃতদের লাশ শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধারের খবরে সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় এলাকায় বিকাল ৪টা থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে গাড়ি ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়। বিক্ষোভকারীরা সড়কের উপর বড় বড় গাছের গুঁড়ি ফেলে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। বিক্ষুব্ধ লোকজন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও নারায়ণগঞ্জ-চিটাগাংরোড সড়ক অবরোধ করেন। দু’টি সড়কের অর্ধশতাধিক স্থানে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। ভাঙচুর করা ৩০-৩৫টি যানবাহন। মৌচাক বাসস্ট্যান্ডে আওয়ামী লীগ নেতার মালিকানাধীন শামস ফিলিং স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। আতঙ্কে বন্ধ হয়ে যায় সিদ্ধিরগঞ্জপুল, মিজমিজি, চিটাগাংরোড, শিমরাইল, মৌচাক, সানারপাড়সহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোন তৎপরতা ছিল না। পুরো এলাকা বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত। উদ্ধারকৃত ৬টি লাশের ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
গতকাল রাত সাড়ে ১১টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের লাশ নগর ভবনের সামনে নেয়া হয়। সেখানে প্রথম দফা জানাযা শেষে তার লাশ নারায়ণগঞ্জের ৩০০ শয্যা হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। আজ সকাল ১০টায় তার লাশ তার নিজ এলাকা ২ নম্বর ওয়ার্ডে নেয়া হবে। স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় দফা জানাযা শেষে পারিবারিক কবরাস্থানে লাশ দাফন করা হবে। এদিকে অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার সরকারের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে রাত সাড়ে ১২টার দিকে শহরের মাজদাইর শশ্মান ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাতেই তার লাশ দাহ করা হয়। এছাড়া অপর চার জনের লাশও ময়নাতদন্ত শেষে নারায়ণগঞ্জের ৩০০ শয্যা হাসপাতালের হিম ঘরে রাখা হয়েছে। সকালে প্রত্যেকের স্বজনদের কাছে লাশগুলি হস্তান্তর করা হবে। নারায়ণগঞ্জ সিটি মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী নিজে উপস্থিত থেকে এসব তত্ত্বাবধান করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধারকৃত এই ছয় লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন জেলার সিভিল সার্জন দুলাল চন্দ্র চৌধুরী। ময়নাতদন্ত শেষে তিনি বলেন, প্রত্যেকটি লাশের মাথায় ক্ষত রয়েছে। অচেতন করার জন্য হত্যার আগে প্রত্যেকের মাথায় ভাড়ি বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। পরে তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। তিনি বলেন, লাশগুলি গুম করার জন্য নদীতে ফেলার আগে প্রত্যেক লাশের পেট ফুটো করে দেয়া হয়। যাতে লাশ গুলি ডুবে থাকে।
যেভাবে লাশগুলো উদ্ধার ও শনাক্ত হয়
এদিকে দুপুর ৩টায় বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের শান্তিনগর এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে ৩টি লাশ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেয়। খবর পেয়ে বন্দর থানার ওসি আক্তার মোর্শেদ ঘটনাস্থলে ছুটে যান। বিকাল ৩টার দিকে চারদিকে খবর রটে যায় শীতলক্ষ্যায় লাশের খবর। লাশ ভাসার খবরে পাগলের মতো ছুটে আসে রোববার নিখোঁজ হওয়া ৭ পরিবারের স্বজনরা। যদিও স্বজনদের আগেই নদীর পাড়ে উৎসুক মানুষ ভিড় করে নদীর পূর্বপাড়ের কলাগাছিয়ার শান্তিনগর এলাকায়। যেখানে লাশগুলো ভাসছিল। বন্দর থানার ওসি আকতার মোর্শেদের নেতৃত্বে পুলিশ একে একে লাশগুলো উদ্ধার করে যখন তীরে নিয়ে আসছিল তখন নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা হুমড়ি খেয়ে লাশের সামনে। প্রথমে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা এবং মুখে দাড়ি আছে এমন একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে লাশটি নাসিকের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের বলে শনাক্ত করেন নিহতের ছোটভাই আবদুস সালাম ও স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। পৌনে এক ঘণ্টা পর নজরুলের সহযোগী মনিরুজ্জামান স্বপনের লাশ শনাক্ত করে তার ছোট ভাই রিপন। ৩টি লাশের মধ্যে ২টি লাশ শনাক্ত হওয়ার খবরে ঘটনাস্থলের আশপাশে সাধারণ মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। এরপর নদী থেকে উদ্ধার হয় আরেকটি লাশ। পরে ওই লাশটি নিখোঁজ সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকারের গাড়িচালক ্ইব্রাহিমের লাশ বলে শনাক্ত করে নিহতের ভাগ্নে আবুবকর ও সাঈদ। বিকাল পৌনে ৬টায় উদ্ধার হয় আরেকটি লাশ। লাশটি প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের সহযোগী তাজুল ইসলামের বলে শনাক্ত করে তার ভাই আনিস ও বোন শিরিন আক্তার। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় উদ্ধার হয় আরেকটি লাশ। লাশগুলো নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে নেয়ার পর রাত সোয়া ৮টার দিকে হাতের ব্রেসলেট ও কাপড়-চোপড় দেখে সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকারের লাশ শনাক্ত করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা বারের সভাপতি এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ও নিহতের ভাগ্নি। অপর একটি লাশের পরিচয় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শনাক্ত হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে ওই লাশটি নিহত প্যানেল মেয়রের বন্ধু লিটন অথবা গাড়িচালক জাহাঙ্গীরের।
প্রতিটি লাশ ভারি বস্তু দিয়ে বাঁধা
ঘাতকরা পরিকল্পিতভাবে অপহৃতদের হত্যাকা- ঘটিয়ে লাশ গুম করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে। আর এজন্যই হত্যার পর লাশগুলো যাতে শনাক্ত বা পাওয়া না যায় সেজন্য প্রতিটি লাশের পেছন থেকে হাত ও পা বাঁধা হয়। এরপর প্লাস্টিকের বস্তায় সারিবদ্ধ করে ১২টি করে ইট ভরা হয়। সূক্ষ্মভাবে বস্তাটিকে একটি প্যাকেটে বানানো হয়। এরপর লাশের পায়ের সঙ্গে দু’টি করে ইটের ওই বস্তা বেঁধে দেয়া হয়। যাতে লাশগুলো ভেসে না ওঠে। তবে নিহত নজরুলের হাত পিঠ মোড়া করে এবং পা বাঁধা ছিল। লাশ যাতে ভেসে না ওঠে সেজন্য নজরুলের পেট ফেঁড়ে দেয়া হয়। তার মুখম-ল পলিথিন দিয়ে মোড়ানো ছিল। মনিরুজ্জামান স্বপনের একটি হাতের কয়েকটি আঙুল কাটা ছিল। আইনজীবী চন্দনের মুখ এসিড দিয়ে ঝলসে দেয়া হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। লাশ উদ্ধার করতে যাওয়া বন্দর থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মোকাররম হোসেন সাংবাদিকদের জানান, এলাকাবাসীর খবর পেয়ে আমরা লাশ উদ্ধার করছি। প্রতিটি লাশই ইট দিয়ে বাঁধা ছিল। যেন লাশ ভেসে উঠতে না পারে তার জন্যই দুর্বৃত্তরা এটি করে থাকতে পারে। কারও কারও চেহারা ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না। পাঞ্জাবি-পাজামা পরা লাশ (নজরুল ইসলাম)টি প্রথমে শান্তিনগর এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি লাশের হাত-পা বাঁধা ছিল। মুখ পলিথিন দিয়ে মোড়ানো ছিল। কোন সংঘবদ্ধ চক্রই এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। বন্দর থানার ওসি আক্তার মোর্শেদ বলেন, শীতলক্ষ্যা নদীর বন্দরের শান্তিনগর এলাকার তীর থেকে ৬টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সব কয়টি লাশের পরিচয় শনাক্ত করেছে স্বজনরা।
লাশ উদ্ধারের পর বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এলাকাবাসী, পেট্রলপাম্পে আগুন, ভাঙচুর
এদিকে বিকাল ৩টার পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে প্যানেল মেয়র-২ নজরুল ইসলামের লাশ উদ্ধার হওয়ার খবরে আবারও রাস্তায় নামে নজরুলের সমর্থকরা। বিকাল ৪টার দিকে তারা সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় থেকে শিমরাইল মোড় পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং আদমজী সালেহা সুপার মার্কেট থেকে শিমরাইল মোড় পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ-চিটাগাং রোড সড়কের অর্ধশতাধিক পয়েন্টে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে। তারা অপহরণকারী হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও ফাঁসি দাবি করে বিভিন্ন সেøাগান দিতে থাকে। অবরোধের কারণে ওই দু’টি সড়কে সকল প্রকার যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে সকাল ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত ৪ ঘণ্টা একই সড়ক অবরোধ করে রেখেছিল বিক্ষুব্ধ লোকজন। অবরোধের কারণে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় ওই সড়কে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়ে শ’ শ’ মানুষ। বেলা ২টা দিকে অবরোধকারীরা সড়ক থেকে সরে গেলে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। কিন্তু লাশ উদ্ধারের পর ফের অবরোধের কারণে সিদ্ধিরগঞ্জের জীবনযাত্রা অনেকটা অচল হয়ে পড়ে। সিদ্ধিরগঞ্জ পুল, মিজমিজি, মৌচাক, সানারপাড়, শিমরাইল এলাকায় আতঙ্কে সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এক ভুতুড়ে নগরীতে পরিণত হয় ওই সব এলাকা। সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে আদমজী ইপিজেডসহ আশপাশের শতাধিক ফ্যাক্টরি ছুটি হলে হাজার হাজার ঘরমুখো শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তারা আটকা পড়ে। অনেকেই নিরুপায় হয়ে পায়ে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হন। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কোন তৎপরতা চোখে পড়েনি। রাত সাড়ে ৭টার দিকে মৌচাক বাসস্ট্যান্ডে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী ইয়াছিন মিয়ার মালিকানাধীন সামস ফিলিং স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেয় নিহত নজরুলের সমর্থকরা। বিভিন্ন পয়েন্টে বিক্ষুব্ধ লোকজন কমপক্ষে অর্ধশতাধিক গাড়ি ভাঙচুর করে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ও নারায়ণগঞ্জ-চিটাগাং রোড সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
আইনজীবীদের সড়ক অবরোধ, এসপি অফিস ঘেরাও
এদিকে টানা তৃতীয় দিনের মতো আদালত বর্জন করে অপহৃত আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারের সন্ধান দাবিতে প্রথমে আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করে। পরে সকাল ১১টায় আইনজীবীরা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডটি অবরোধ করে। ওই সময় ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আসার সময় আইনজীবীদের বাধার মুখে পড়েন। পড়ে তিনি গাড়ি থেকে নেমে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে যান। ওই সময় তিনি বিক্ষুব্ধ আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, অপহৃতদের উদ্ধারে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে আইনজীবীরা ডিআইজির কথায় আশ্বস্ত হতে পারেননি।
আইনজীবীদের ধারণা
নারায়ণগঞ্জের আইনজীবী নেতাদের ধারণা, কাউন্সিলর নজরুল ও তার সহযোগীদের অপহরণের ঘটনা এডভোকেট চন্দন দেখে ফেলায় গাড়িসহ (ঢাকা-মেট্রো-গ-২৭-৩৩৩৭) তাকে ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিমকেও অপহরণ করে নিয়ে যায়। ঘটনার সাক্ষী যাতে না থাকে এ জন্য চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালককে হত্যা করেছে ঘাতকরা। এডভোকেট চন্দন কুমার সরকারের ভাইপো এডভোকেট অরুনাথ কুমার সরকার জানিয়েছিলেন, ঘটনার দিন তার চাচা চন্দন সরকারের গাড়ি ও কাউন্সিলর নজরুলকে বহনকারী গাড়িটি আদালত প্রাঙ্গণ থেকে আগে পিছে বের হয়ে যেতে দেখেছেন তিনি। উল্লেখ্য, রোববার দুপুরে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার একটি মামলায় জামিন নিয়ে নারায়ণগঞ্জ আদালত থেকে বাসায় ফেরার পথে নাসিক প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার সহযোগী লিটন, মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর প্রাইভেটকারসহ অপহৃত হন। একই সময় নিখোঁজ হন সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম। এর মধ্যে ওই রাতে নজরুলের গাড়িটি গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়। সোমবার রাতে গুলশানের নিকেতন থেকে উদ্ধার হয় আইনজীবী চন্দন সরকারের গাড়ি।
সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান বন্ধ
নারায়ণগঞ্জে প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ ৭ জন অপহরণের ঘটনার পরে সারা দেশে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান স্থগিত করা হয়েছে। বুধবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান। এছাড়া, ৭ জন অপহরণের ঘটনায় ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশাসন) খন্দকার গোলাম ফারুককে প্রধান করে একটি ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) সাজ্জাদুর রহমান ও ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফুল আজিম। নারায়ণগঞ্জে একের পর এক খুন ও অপহরণের ঘটনা বেড়ে চলায় করণীয় সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে বিকল্প চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। জনগণের নিরাপত্তায় যতগুলো দিক রয়েছে সেগুলো বিবেচনা করা হবে।
নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় খালেদা জিয়ার নিন্দা
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নারায়ণগঞ্জে সাতজনকে অপহরণ ও তাঁদের ছয়জনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি এ নিন্দা জানান। বিবৃতিতে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, বর্তমান অবৈধ সরকার গোটা দেশকে একটি বধ্যভূমিতে পরিণত করেছে। মানুষের মৌলিক অধিকারকে গুড়িয়ে দিয়ে মানুষের চলাচলের স্বাধীনতা ও জীবন-জীবিকার নিরাপত্তাকে দুর্বিসহ ও বিপন্ন করে তোলার পর এখন মানুষের জীবন নিয়ে বেঁচে থাকাটাই দায় হয়ে পড়েছে। সরকার মানুষের শান্তি-স্বস্তি এবং নির্বিঘœ জীবন-যাপনের সব সুযোগ কেড়ে নিয়েছে। বর্তমান অবৈধ সরকার ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচন করার পরে জনমতকে আর তোয়াক্কাই করছে না। জনগণের রুদ্ররোষ থেকে বাঁচার জন্য তারা জনমনে ভীতি সৃষ্টির লক্ষ্যে গুম, খুন আর গুপ্ত হত্যার নৃশংস পথ অবলম্বন করেছে। খালেদা জিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দেশব্যাপী প্রতিনিয়ত গুম, খুন, অপহরণ ও বিচার বর্হিভূত হত্যাকা-ের দায় সরকার কোন অবস্থাতেই এড়াতে পারবে না। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে আজ আর কোন নিরাপত্তা নেই।
বিএনপি চেয়ারপারসন সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেন, এই মুহূর্তে মরণঘাতী অপহরণ, গুম ও গুপ্ত হত্যা বন্ধ না করলে সরকারকে চরম মূল্য দিতে হবে। যারা এই ঘৃণ্য অপকর্মের সঙ্গে জড়িত তাদের সব হিসাবই জনগণের কাছে সংরক্ষিত আছে। বিবৃতিতে তিনি জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের জন্য বিএনপির সব নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
‘দু-একদিনের মধ্যে বড় কিছু দেখতে পাবেন’
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, নারায়ণগঞ্জে অপহরণের ঘটনায় সরকারের পদক্ষেপের ব্যাপারে দু-একদিনের মধ্যে বড় কিছু দেখা যাবে। গতকাল নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে যান স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। সেখান থেকে বের হওয়ার পর ঘটনায় জড়িতদের এখনো গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না কেন এমন এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারায়ণগঞ্জে অপহরণের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন। দু-একদিনের মধ্যেই বড় কিছু দেখতে পাবেন।’
দেশ গুপ্ত ঘাতকদের লীলাভূমি: ফখরুল
নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশে গুম ও অপরহরণের নিন্দা জানিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশ গুপ্ত ঘাতকদের লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ঘটনাই তার চরম দৃষ্টান্ত। গতরাতে বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম-মহাসচিব রিজভী আহমেদ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে তিনি এ কথা বলেন, নারয়ণগঞ্জের ঘটনা তুলে ধরে মির্জা আলমগীর বলেন, আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি দেশের সকল রেকর্ডকে ভঙ্গ করেছে। গোটা জাতি এক বিভীষিকাময় আতঙ্ক ও ভীতির মধ্যে বাস করছে। বাসা থেকে বেরিয়ে পরিবারের কাছে ফিরতে পারবে কিনা; সে বিষয়ে প্রত্যেক নাগরিকই সংশয়ে ভুগছেন। প্রতিদিন মানুষ গুম হচ্ছে এবং কয়েকদিন পর তাদের লাশ দেশের কোনো না কোনো অঞ্চলে পাওয়া যাচ্ছে। বিবৃতিতে বলা হয়, রোববার নারায়ণগঞ্জে দিনে দুপুরে কাউন্সিলারসহ ৭ জনকে অপহরণ করা হয়। পরবর্তীতে বুধবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে মৃতদেহ ভাসতে দেখে স্থানীয় জনগণ পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ এসে ৬ জনের মৃতদেহ নদী থেকে উদ্ধার করে। এটা শুধু বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির বহিঃপ্রকাশই নয়। বরং গোটা দেশ গুপ্ত ঘাতকদের লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছে এটি তারই চরম দৃষ্টান্ত। সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে জনগণকে এর বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
No comments:
Post a Comment