Sunday, May 4, 2014

আতঙ্কের দাবদাহ চারদিকে by আলী ইদরিস

বৈশাখের দাবদাহের চেয়ে এখন খুন, গুম, অপহরণের আতঙ্ক ভয়াবহ। এসব যেন আজকাল ডালভাত। টিভির পর্দায় হোক আর খবরের কাগজে হোক, চোখ পড়লেই অপহরণ, খুন, গুমের সচিত্র ঘটনা ভেসে ওঠে। এসব ঘটনা স্বচক্ষে যারা দেখে তাদের মধ্যে আরও ভয়াল আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। এর প্রথম কারণ প্রত্যক্ষভাবে নৃশংসতা দেখার আতঙ্ক, দ্বিতীয় কারণ ঘটনার সাক্ষী হিসেবে শনাক্ত হলে অপরাধীর রোষানলে পড়ে প্রাণ হারানোর ভয়। সুতরাং প্রত্যক্ষ সাক্ষীরা এখন জীবন বাঁচাতে ঘটনা দেখেছে বলে অস্বীকার করে অথবা সাংবাদিক, পুলিশের নজর বা ধরাছোঁয়া থেকে পালিয়ে বেড়ায়।
সমাজের জন্য এটা মহা-অবক্ষয় ও বিপর্যয়। পরিস্থিতির কতটা অবনতি হলে এ রকম আতঙ্ক ও ভয়াবহতা সৃষ্টি হয় তা সহজেই অনুমেয়।  গত ২৭শে এপ্রিল ব্যস্ততম এলাকা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে যে ভয়াবহ অপহরণ এবং খুনের ঘটনা ঘটে গেল তা জনমনে আতঙ্কের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রকাশ্য দিবালোকে, দুপুর বেলায় নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্যানাল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন কুমারসহ সাতজনকে টেনে হিঁচড়ে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নিয়ে গেল, তিনদিন পর তাদের পচা লাশ পাওয়া গেল শীতলক্ষ্যার জলে। মিডিয়ার ক্যামেরাম্যানদের  বদৌলতেও সাহসিকতায় বিশ্বজিৎ হত্যার নৃশংসতা আমরা টিভির পর্দায় দেখতে পেরেছিলাম। কিন্তু এবারের অপরাধীরা সবই করেছে ত্বরিত গতিতে, মিডিয়া তো দূরে থাক, জনমানুষের চোখেও যেন ধরা না পড়ে সেই কূটকৌশলে। খুন করার সময় অপরাধীদের নৃশংসতা ও নির্মমতার মাত্রা যে বর্বর পশুত্বকেও ছাড়িয়ে গেছে সন্দেহ নেই। ভর-দুপুরে ব্যস্ত রাস্তায় ঘটনা কেউ না কেউ দেখে থাকবেই। কিন্তু পুলিশ বলেছে, প্রত্যক্ষদর্শী কাউকেই পাওয়া যায়নি, অর্থাৎ দেখে থাকলেও অপরাধীদের দ্বারা প্রাণনাশের ভয়ে কেউ স্বীকার করেনি। পুলিশও সে সুযোগে গুমের মামলা না নিয়ে নিখোঁজ হয়েছে বলে দায়সারা গোছের তদন্ত করেছে। পুলিশ ইচ্ছা করলে এবং উঠে পড়ে তদন্তে নামলে হয়তো সাতজনকেই বাঁচানো যেত। ২৮শে এপ্রিল ভোরে গাজীপুরে দুই সহোদরকে অপহরণ করা হলেও রাতে তাদেরকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। একই দিনে ময়মনসিংহের ভালুকায় দুজন শিক্ষককে অপহরণ করা হয়েছে। একই দিনে কেরানীগঞ্জ থেকে আওয়ামী লীগ কর্মী রিন্টু নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে খোদ ক্ষমতাসীন দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে আন্তরিক সাধুবাদ জানাচ্ছি। তিনিই একমাত্র সরকার দলীয় সদস্য যিনি স্বীকার করেছেন যে গুম, খুন, অপহরণ সীমা অতিক্রম করেছে। গত ২৮শে এপ্রিল তিনি ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে নৌকা সমর্থক গোষ্ঠীর আলোচনা সভায় বলেন অপহরণ, গুম ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকা-ের পেছনে কারা রয়েছে সে চক্রকে খুঁজে বের করতে হবে। নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্যানেল মেয়রসহ বাকি পাঁচজনই সরকারের লোক। সরকারের বাইরে আর একটি সরকার থাকলে চলবে না। তিনি আরও বলেন, যদি ত্বকী হত্যার বিচার হতো, তাহলে আবু বকর সিদ্দিকীর ও এ সাতজনের অপহরণ হতো না। নারায়ণগঞ্জের ঘটনার পর সারা দেশে আইনের শাসনে বিশ্বাসী মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। আইনের স্বার্থে কোন দুর্বলতা নয়, নমনীয় হওয়া যাবে না। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে ‘আমরা দেখিনি বা আমরা জানি না’ বললে চলবে না। তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে অপহৃত ও অপরাধীদের অবশ্যই খুঁজে জনসমক্ষে আনতে হবে। বিচারবহির্ভূত অপহরণ, গুম গণতন্ত্রের পরিপন্থি। জনাব সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে আবারও ধন্যবাদ জানাচ্ছি তার সময়োপযোগী বক্তব্যের জন্য। সরকারি দলের বাঘা বাঘা প্রবীণ নেতারা যেখানে মুখে কলুপ এঁটে বসে আছেন, সেখানে জনাব সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সরকারের সমালোচনা করে ন্যায্য কাজটি করেছেন। সরকারি দলের প্রবীণ নেতা বলেই হয়তো তার গুম হওয়ার ভয় নেই। প্রকৃতপক্ষে সময়টা  খুবই ভয়ঙ্কর। মানুষ  ভাত মাছ একটু কম খেয়েও শান্তিতে থাকতে চায়। কে, কোথায়, কখন, আসল বা নকল র‌্যাব-পুলিশের হাতে গুম হবে সে আতঙ্কে জনগণ অস্থির। অতীতে দেখা গেছে রাজনৈতিক কারণে বিরোধী দলের নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করতে  গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অর্থোপার্জনের উদ্দেশ্যে নিরপরাধ জনগণকেও ছাড়েনি। এখনও কিছু অপহরণ হচ্ছে ভুয়া র‌্যাব-পুলিশের হাতে। ইসলামী ব্যাংকের সহকারী কর্মকর্তা ইলিয়াস উদ্দিনের গুম হওয়া নিয়ে অপরাধীরা প্রতারণা করে চিকিৎসার নামে ব্যাংক থেকে ১৫,০০০ টাকা আদায় করেছে। এতে বোঝা যায় কোন কোন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কারণে নয়, স্রেফ অর্থোপার্জনের উদ্দেশ্যে এক বা একাধিক চক্র অপহরণে নেমে গেছে। এদের শনাক্ত করে উপযুক্ত শাস্তি না দিলে এরা আরও সুসংগঠিত ও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে এবং সরকারের ভাবমূর্তিকে ভূলুন্ঠিত করতে পারে। সরকার যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ না দিয়ে উল্টো বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপায়  কিংবা বিব্রত বোধ না করে তাহলে ওই সব চক্র প্রশ্রয় পেয়ে একদিন ফ্র্যাংকেনস্টাইনের মতো সরকারের বুকের ওপর চেপে বসতে পারে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, সরকার বিব্রত নয়, এসব ঘটনা ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত শত্রুতা বা প্রভাব বিস্তারের জন্য হচ্ছে। যে কারণেই ঘটুক, যে চক্রই ঘটাক, গুম বা খুন হলে অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। বিরোধী দল জড়িত হলেও তাদের আইনের আওতায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা আগেও দায়িত্বহীন বক্তব্য দিয়েছেন, যেমন: আল্লার মাল আল্লা নিয়ে গেছে, হরতালকারীরা পিলার ধরে নাড়াচাড়া করায় রানা প্লাজা ধসে পড়েছে, ইত্যাদি। রাজনৈতিক কারণে বা কোন্দলে যদি সরকারের ভেতরে বা বাইরে আর একটি সরকার সৃষ্টি হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রভাবিত করে তাহলে সে বাহিনী দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে যায়। তখন সুশাসন সুদূরপরাহত হয়। আমরা সাধারণ নাগরিকগণ শান্তিতে বাস করতে চাই, সরকার যেন আমাদের ইচ্ছা পূরণ করার চেষ্টা করে।

No comments:

Post a Comment