Sunday, May 18, 2014

যখন প্রতিবাদ থাকে না by আলী ইদরিস

কবির বাণী “অন্যায় যে করে, অন্যায় যে সহে/ তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে” যেন মহাকালের শাশ্বত সত্য রূপ। আজ ঘরে-বাইরে, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, রাষ্ট্রে অহরহ অন্যায় সংঘটিত হচ্ছে। চুরি, চামারি, সন্ত্রাস, ছিনতাই, ডাকাতি, ঘুষ, দুর্নীতি, খুন-গুম এ সমস্ত অন্যায় যেন আজ ডালভাত।
পরিবারে দেখা যায়, অর্থবিত্তের লোভে ভাই ভাইকে, ছেলে পিতাকে হত্যা করে, যৌতুকের জন্য স্বামী, দেবর, শ্বশুর-শাশুড়ি মিলে বউকে হত্যা করে, অর্থের লোভে ছিনতাইকারী, পকেটমার, অজ্ঞান পার্টি, ডাকাতদল, রাস্তা-ঘাটে, ট্রেনে, স্টিমারে তৎপর, অর্থবিত্তের লোভে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা/কর্মচারী ঘুষ দাবি করে, দুর্নীতিতে মত্ত হয়, অর্থের লোভেই ব্যবসায়ী ভেজাল মিশায়, অর্থ-বিত্তের প্রলোভনেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি জনগণের প্রাপ্য লুটে খায় এবং স্বজনপ্রীতিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। সমস্ত অন্যায় কাজের নেপথ্যে অবৈধ অর্থলোভ আর ন্যায় কাজের পেছনে থাকে আইনের শাসন ও মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা। আজ অন্যায় কর্মের কলেবর এবং আইনের শাসনের অভাব এত বেশি প্রকট যে, সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করার সাহসটিও হারিয়ে ফেলছে। শুধু গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজ প্রতিবাদে সোচ্চার বলে তাদের ওপরও বিধিনিষেধ এবং নিয়ন্ত্রণ চলছে। কিন্তু যে সমাজে অন্যায়ের প্রতিবাদ নেই, ওই সমাজ তো জড় পদার্থের মতো অথর্ব, অচল। শিক্ষিত, সুস্থ সমাজ গড়তে হলে পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করতে হবে। একুশ শতকের ডিজিটাল বিশ্বে যেখানে সমস্ত কর্মের তথ্য সহজেই পাওয়া যায় সে ক্ষেত্রে যদি প্রতিবাদের সুযোগ না থাকে তাহলে অন্ধকার যুগে বাস করার মতো অবস্থা। কাবিখা’র চাল হতদরিদ্রের প্রাপ্য। হতদরিদ্ররা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মসজিদ, মন্দির, রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পানি সরবরাহের প্রকল্প তৈরি করে দিনান্তে যে চালটুকু পেয়ে তাদের দারিদ্র্য কিঞ্চিৎ ঘোচাতো, কিন্তু গাইবান্ধা-১ সুন্দরগঞ্জ আসনের মহাজোট সরকারের এমপি ডা. কাদের খান গত ৫ বছরে ভুয়া প্রকল্প ও ভুয়া ভাউচার দেখিয়ে প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যের ৯০০ টন চাল গায়েব করে দিয়েছেন। এতে হতদরিদ্রের যেমন কপাল পুড়েছে তেমনি উন্নয়ন কর্ম মুখ থুবড়ে পড়েছে, দেশের দারিদ্র্য বেড়েছে। এমপি তার সহযোগী হিসেবে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জহুরুল ইসলামকে টনপ্রতি ৩,০০০ টাকা ভাগ দিয়ে ভুয়া প্রকল্পের মিথ্যা কাগজপত্র তৈরি করে নিয়েছেন। এ চাল আত্মসাতের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে ৪টি মামলা দায়ের করার পরও তিনি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে কয়েকটি ইউনিয়নে ১৬টি টিউবওয়েল খনন ও ব্যক্তিগত পুকুরে ঘাট বাঁধাই করে আরও ২ কোটির বেশি টাকা ভুয়া বিল দাখিল করে আত্মসাৎ করেন। এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে জনগণ কিছু দিন বলাবলি করলেও প্রকল্প কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম কারসাজি করে সাংবাদিকদেরকে বোঝালেন যে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। এভাবে ডিজিটাল যুগেও ভুয়া কাগজ পত্রে জনগণের কোটি কোটি টাকা এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সুযোগ খোয়া গেল। কিন্তু দশম নির্বাচনে ওই এমপি নিজের জামানত ও ক্ষমতা হারিয়ে আটকে গেলেন। প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম ওই আসনে কৃতকার্য হয়ে কাদের খানের অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন এবং সংসদ সহ বিভিন্ন ফোরামে তার দুর্নীতির ফিরিস্তি প্রকাশ করেন। গত ৩রা মার্চ তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনে কাদের খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। এখানে বলার বিষয় হলো নিজেদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির প্রকাশ্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণ প্রতিবাদ করার সাহস হারিয়ে ফেলেছে। তাহলে আশ্রয় প্রশ্রয় পাওয়া দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস হবে কিভাবে? সাংবাদিক ও নতুন জনপ্রতিনিধি না থাকলে এই বিরাট অন্যায়ের বিষয়টি  ধামাচাপা পড়ে যেতো। প্রতি বছর জাতীয় বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রত্যক্ষ প্রণোদনা, যেমন কাবিখা, ভিক্ষাবৃত্তির অবসান, ভিজিডি, ভিজিএফ, মাতৃত্বকালীন ভাতা, বয়স্ক ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বিধবা ভাতা, স্বামী-পরিত্যক্ত ভাতা, হতদরিদ্রের খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান, একটি বাড়ি, একটি খামার প্রকল্প, এতিম, হিজড়াদের জন্য বরাদ্দ ইত্যাদি খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। কিন্তু শুধু কাবিখা থেকে একটি  মাত্র আসনে খোদ জনপ্রতিনিধি দ্বারা যদি ৫ কোটি টাকার চাল ও নগদ অর্থ আত্মসাৎ হতে পারে তাহলে আরও ২২৯টি আসনে অথবা ৬৬টি জেলায় ওই সমস্ত সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দ থেকে জনপ্রতিনিধি ছাড়াও সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারী, দলীয় অঙ্গসংগঠনের নেতানেত্রী, স্থানীয় সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই মিলে কত হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করতে পারেন তা সহজেই অনুমেয়। এ সমস্ত অপকর্মের পেছনে দুর্দমনীয় অর্থ-বিত্তের লোভ ছাড়া আর কিছু নেই। অর্থের বরাদ্দ যত বাড়বে, আত্মসাতের পরিমাণও বাড়তে পারে। সেই সঙ্গে  বাড়ে সংঘাত, সংঘর্ষ, গুম, অপহরণ, খুন ইত্যাদি। আজ নারায়ণগঞ্জ সহ সারা দেশে এসব অপরাধ বেড়েই চলছে। এ সমস্ত অপরাধ বন্ধ করতে হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক বা অধিষ্ঠিত থাকুক, আইনের শাসন ছাড়া অপরাধ দমন করা সম্ভব হবে না। আইনের প্রয়োগ দ্বারাই সমস্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূল করা যেতে পারে। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। লিমনের জন্য যেমন আইন প্রযোজ্য, তেমনি সেনাবাহিনী প্রধান বা রাষ্ট্রের প্রধানের জন্যও আইন প্রযোজ্য। এখানে দুর্বলতা দেখালে বা আশ্রয়-প্রশ্রয় দিলে অপরাধীরা একদিন ফ্রাঙ্কেনস্টাইলের দানবের মতো তাদের সৃষ্টিকারীকে আক্রমণ করতে পারে।

No comments:

Post a Comment