Tuesday, May 6, 2014

শীতলক্ষ্যা থেকে হেঁটে আসছে লাশ by সাযযাদ কাদির

এ দেশে যারা জীবিত তারা মূঢ় মূক বধির আজ। তারা কিছু দেখে না, শোনে না, বলে না। কিন্তু যারা মৃত তারাই এখন সবচেয়ে জীবিত। তাদের চোখগুলো উপড়ে নেয়া, কিন্তু তারা তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। স্থির চোখে তারা দেখছে আমাদের। তাদের হাতগুলো পিঠমোড়া করে বাঁধা, কিন্তু ওই সব হাত লাল পতাকার মতো করে তারা তুলে ধরেছে আকাশের দিকে। তাদের মুখ স্কচটেপ দিয়ে আঁটা, কিন্তু তারা কথা বলছে। চিৎকার করছে।
তারা গর্জে উঠছে আকাশ ফাটানো স্লোগানে-স্লোগানে। তারা ধ্বংসস্তূপের নিচে পিষ্ট-নিষ্পিষ্ট, তারা অগ্নিকু-ে ভষ্ম-অঙ্গার... কিন্তু তারা রাজপথে উঠে আসছে ইট-কংক্রিটের গহ্বর থেকে। ইট-পাথর চাপিয়ে তাদের ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে স্বখাত সলিলে, কিন্তু সেই পাতাল থেকে উঠে আসছে তারা। তাদের পায়ের রগ-গোড়ালি কাটা, কিন্তু তারা এখন হেঁটে হেঁটে আসছে রাজধানীর দিকে। তারা আসছে শীতলক্ষ্যা-নারায়ণগঞ্জ থেকে, আসছে সাতক্ষীরা-সিরাজগঞ্জ থেকে, আসছে নীলফামারী-নোয়াখালী থেকে, আসছে চাঁপাই-রাজশাহী থেকে, আসছে মুন্সীগঞ্জ-ময়মনসিংহ থেকে। দেশের প্রতিটি সড়ক-মহাসড়ক ধরে, নৌপথ-রেলপথ ধরে লাশ আসছে, দিন-রাত কর্কশ সাইরেন বাজিয়ে ছুটছে অ্যামবুলেন্স। পথে-পথে গুলি, মাঠে-ঘাটে গুম-অপহরণ... তবুও তারা আসছে। আসছে ভাসমান লাশ, পুঁতে ফেলা লাশ, পুড়িয়ে ছাই করা লাশ। এই প্রতিটি লাশ আজ জ্বলন্ত ইতিহাস। এর সঙ্গে আছে ঘটনা, কাহিনী। আছে হত্যাকারী দলের উল্লাসনৃত্যের বৃত্তান্ত-বিবরণ। এ বিবরণ যেন সেই কবে রবীন্দ্রনাথ লিখে গিয়েছেন তাঁর নাট্যকাব্য ‘বিসর্জন’ (১৮৯০)-এর দ্বিতীয় অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে-
“... রক্তের অক্ষরে
অবিশ্রাম লিখিতেছে বৃদ্ধ মহাকাল
বিশ্বপত্রে জীবের ক্ষণিক ইতিহাস।
হত্যা অরণ্যের মাঝে, হত্যা লোকালয়ে,
হত্যা বিহঙ্গের নীড়ে. কীটের গহ্বরে,
অগাধ সাগর-জলে, নির্মল আকাশে,
হত্যা জীবিকার তরে, হত্যা খেলাচ্ছলে,
হত্যা অকারণে, হত্যা অনিচ্ছার বশে-
চলেছে নিখিল বিশ্ব হত্যার তাড়নে
ঊর্ধ্বশ্বাসে প্রাণপণে।...”
এই যে এত সব অপহরণ-গুম (‘ফোর্সড ডিসএপিয়ারেন্স’)-এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে। এর মূল উদ্দেশ্য একটাই- শিকার যাতে আইনের সুরক্ষা না পায় এ জন্য শিকারি পক্ষের তৎপরতায় গোপনে অপহরণ ও আটক করে রাখা হয় তাকে বা তাদের। এ সম্পর্কিত সকল তথ্য রাখা হয় চেপে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধি একে সরাসরি বলেছে মানবতাবিরোধী অপরাধ। এরপর ২০০৬ সালের ২০শে ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ গ্রহণ করেছে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অভ অল পারসনস্‌ ফ্রম এনফোর্সড ডিসএপিয়ারেন্সেস’। কিন্তু গুম-খুন চলছেই। চলছে বেপরোয়া ভাবেই। বিশ্বসমাজ নীরব দর্শক।
অপহরণের পর হত্যার ঘটনাই বেশি। আটক অবস্থায় কথা বের করতে বা স্বার্থ আদায় করতে নির্যাতন চালানো হয় শিকারের ওপর। ওই নির্যাতনে মৃত্যু ঘটে অনেকের। অনেককে অপহরণ করা হয় নৃশংস নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করার জন্যই। এরপর লাশ লুকিয়ে ফেলে চলে শিকারকে গুম বা একেবারে নিখোঁজ করার চেষ্টা। থানা-পুলিশ কোর্ট-কাচারি করে প্রতিকার মেলে না বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই। হত্যাকারীরা বেমালুম অস্বীকার করে সবকিছু, তারপর সাক্ষ্যপ্রমাণ বা সাক্ষী না মেলায় পুরোপুরি গুমই হয়ে যায় গোটা ব্যাপারটা।
দেশে-দেশে অজনপ্রিয় সরকারগুলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ঘায়েল করে নিজেদের ক্ষমতার মসনদ নির্বিঘ্ন রাখতে গুম-খুন অস্ত্রটি ব্যবহার করে নানা কৌশলে। এতে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ, আর বাইরে থেকে দেশের ভেতর দেখা মাইলের পর মাইল শুয়ে থাকা শান্তি-কল্যাণকে। উইকিপিডিয়া ঘাঁটলে ওই সব দেশের সন্ত্রস্ত সময়ের ইতিহাস পড়ে দেখতে পারেন প্রিয় পাঠক-পাঠিকা। তবে না, যা ভাবছেন তা নয়। আমাদের দেশের নাম এখনও ওঠে নি ওই তালিকায়। কিন্তু উঠতে বাকি আছে আর ক’দিন? এ প্রশ্নের উত্তর কি জানে নারায়ণগঞ্জের মানুষ? আরও সব রক্তাক্ত জনপদের সন্ত্রস্ত নরনারী-শিশু? ওরা কি বেঁচে থেকেও লাশ?
“দূর হতে কি শুনিস্‌ মৃত্যুর গর্জন, ওরে দীন,
ওরে উদাসীন,
ওই ক্রন্দনের কলরোল,
লক্ষ বক্ষ হতে মুক্ত রক্তের কল্লোল।”
এত সব রক্ত-লাল মৃত্যু-শীতল দিন, প্রায় প্রতি দিন- কে ভুলে যেতে পারে? না। কবির ভাষায় বলি, “সে আমার রক্তে ধোয়া দিন চেতনায় হানছে আঘাত... জাগ জনতা দুরন্ত সঙ্গিন, কারা মোর ঘর ভেঙেছে স্মরণ আছে।” তাই কবির আহ্বান, “দিন এসে গেছে ভাই রে - রক্তের দামে রক্তের ধার শুধবার।

No comments:

Post a Comment