Sunday, May 4, 2014

নারায়ণগঞ্জ এক মৃত্যুপুরী by সাহস রতন |

ক’দিন ধরে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় নারায়ণগঞ্জ নিয়ে বেশ তোলপাড় চলছে। দিনে দুপুরে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে সাতজন জলজ্যান্ত মানুষকে অপহরণ করা হলো। অপহরণের পরপরই পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে ব্যক্তিবিশেষের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তা প্রথমে বিষয়টিকে আমলেই নিতে চায় নি। এমনকি মামলাও করতে দেয়া হয় নি। এরপর অপহৃত ব্যক্তিদের পরিবার ও স্বজনরা তাদেরকে উদ্ধারে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে চাপ প্রয়োগ করার লক্ষ্যে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। সে সময় উল্লিখিত পুলিশ কর্মকর্তাটি বিক্ষোভ প্রদর্শনকারীদের শাসিয়ে আসেন। পত্রিকায় সে খবর আমরা সচিত্র প্রত্যক্ষ করেছ
অপহরণের তিন দিন পর তাদের প্রত্যেকের মৃতদেহ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভেসে উঠলো। পরপরই তড়িঘড়ি করে ওই পুলিশ কর্মকর্তাটিকে অন্যত্র বদলি করা হলো। এটা তার জন্য শাস্তি না পুরস্কার ঠিক বোঝা গেল না। কারণ মৃতের বিক্ষুব্ধ স্বজনরা, অভিযুক্ত ও চিহ্নিত লোকটির অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন দিয়েছে। হয়তো পুলিশ কর্মকর্তাটিও আক্রান্ত হতেন। বিক্ষুব্ধ জনতাকে থামানোর জন্য ইতিমধ্যে পুলিশি অ্যাকশন শুরু হয়েছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নারায়ণগঞ্জে কয়েক প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এখন কেন বিজিবি মোতায়েন করা হলো? সাতজন মানুষ অপহরণ ও খুন হওয়ার পর কাকে রক্ষা করার জন্য এত বিজিবি নিয়োগ করা হলো? শুনেছি স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে বাড়তি প্রটেকশনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। এত লোক থাকতে একমাত্র সংসদ সদস্য শামীম ওসমানই কেন নিজের জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন? যে সংসদ সদস্য নিজের জীবন নিয়ে সংশয়ে আছেন তিনি জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন কিভাবে?
বৃটিশ আমল থেকেই এই বাংলায় নানা কারণে নারায়ণগঞ্জের আলাদা মর্যাদা ছিল। বিশেষ করে নৌবন্দর হিসেবে এর বিশেষ সুনাম ছিল। পাশাপাশি অসংখ্য হোসিয়ারি কারখানা, আদমজী পাটকল নারায়ণগঞ্জকে ভিন্ন মাত্রার ব্যবসা-এলাকায় পরিণত করে। আর এখন নারায়ণগঞ্জ আতঙ্ক, গুম-অপহরণ-খুনের জন্য কুখ্যাত এক জনপদের নাম। বর্তমান ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নারায়ণগঞ্জ এবং ওসমান পরিবার। কিন্তু বিগত ১০-১৫ বছর ধরে ওসমান পরিবারের অত্যাচারে নারায়ণগঞ্জের মানুষ অতিষ্ঠ। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে নারায়ণগঞ্জে যতগুলো গুম-অপহরণ-হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তার প্রায় সব ক’টিতেই কোন না কোনভাবে ওসমান পরিবারের একজন সদস্যের নাম জড়িয়ে গেছে। সর্বশেষ মেধাবী ছাত্র ত্বকী হত্যাকাণ্ড এর প্রমাণ। শুনতে খারাপ লাগলেও বাস্তবতা হলো, আমাদের মিডিয়াগুলোও সব সময় যেন দুঃসংবাদের জন্য মুখিয়ে থাকে। কারণ ভাল সংবাদ নাকি বিক্রি হয় না। জনগণ নাকি ভাল সংবাদ ‘খায় না’। হতেও পারে। একটা ২০তলা ভবন বানানো হচ্ছে এটা কোন খবর নয়। কিন্তু সেই একই ভবন যখন কাত হয়ে ভেঙে পড়ছে তখন সেটা বিরাট খবর। সেজন্যই কি এত এত খারাপ খবর প্রতিদিন সংবাদপত্র আর টিভি চ্যানেলগুলোয় প্রকাশিত-প্রচারিত হচ্ছে? নারায়ণগঞ্জে অভিযোগের আঙুল সব সময় ওঠে গডফাদারদের বিরুদ্ধে। কি রাষ্ট্রের চেয়েও ক্ষমতাবান হয়ে গেল? বছরের পর বছর তাদের অত্যাচারে নারায়ণগঞ্জের মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে আর রাষ্ট্র কাঠামো তা দেখেও না দেখার ভাণ করছে। এর পরিণতি কিন্তু কখনওই ভালো হয় না। ইতিহাস তা-ই বলে। সাধারণ মানুষ সাধারণত গা বাঁচিয়ে চলে। আইনি ব্যবস্থা জনগণের পক্ষে নেই বিধায় অন্যায় দেখেও পাশ কেটে যায়। সহজে উত্তেজিত হয় না। কিন্তু কারও ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে, আপাত নিরীহ এই সাধারণ জনতারও সহ্যের একটা সীমা থাকে। সীমা ছাড়িয়ে গেলে, নিজের জীবন বিপন্ন জেনেও তারা চরম প্রতিবাদী হয়। তখন সব কিছুই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আশা করি সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই রাষ্ট্রযন্ত্র বিষয়টা উপলব্ধি করবে। আর দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে নারায়ণগঞ্জের জনজীবনে শান্তি ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হবেন। নিশ্চিত করবেন সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা।

No comments:

Post a Comment