তিনি যেন নিজেই ম্যাজিক। সাধারণ সাহিত্যরসিক থেকে রাষ্ট্রনায়ক—সবাই তাঁর
মুগ্ধ-পাঠক। নিরেট বাস্তবতার ছবি তিনি আঁকেন না। অথচ তাঁর লেখায় সবাই
খুঁজে পায় নিজেরই আত্মীয়-পরিজন, স্বদেশ। জাদুবাস্তবতার সফল রূপকার
গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের প্রয়াণে আমাদের শ্রদ্ধা এ খবরটি এখন বাসি
যে আমাদের জীবনকালের সবচেয়ে বিখ্যাত লেখককে আমরা হারিয়েছি কদিন আগে।
কথাশিল্পের জাদুকর গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এই ধরাধাম ছেড়ে চলে গেছেন
নিজের উপন্যাসের অসংখ্য হাইপারবোলিক বা অতিশয়োক্তিমূলক ঘটনার মতোই এক
মহাকাণ্ড ঘটিয়ে।

তাঁর
লেখায় গরমকালে এমন গরম পড়ে যে মুরগিরা সরাসরি ভাজা ডিম পাড়া শুরু করে
কিংবা যখন বৃষ্টি হয়, একটানা চার বছর এগারো সপ্তাহ দুই দিন ধরে পড়তেই থাকে
সেই বৃষ্টি। মার্কেসের মৃত্যুতে পৃথিবীতে আমরা সে রকম হাইপারবোলিক কাণ্ডই
ঘটতে দেখলাম—সত্তরজনের মতো রাষ্ট্রনায়ক শোক প্রকাশ করলেন, দেড় শয়ের বেশি
দেশের প্রধান সংবাদপত্রগুলো তাদের প্রথম পাতায় ছাপাল তাঁর মৃত্যুর সংবাদ,
আর টেলিগ্রাফ পত্রিকার হিসাবে দুনিয়ার সবগুলো প্রধান সংবাদপত্রের সংখ্যা
যদি হয় মোট ১০০, তাহলে এর ৮৩টিই মার্কেসের মৃত্যু নিয়ে পত্রিকায় সম্পাদকীয়
প্রকাশ করল। আমরা চোখের সামনে একজন লেখককে মর্ত্য থেকে বিদায় নিতে নয়, বরং
যেন ভূলোক থেকে স্বর্গের পথে সরাসরি দেবরাজ জিউস হয়ে হাত নাড়তে নাড়তে উঠে
যেতে দেখলাম; ঠিক যেভাবে তাঁর উপন্যাস ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস্ অব সলিচ্যুড-এ
পরমাসুন্দরী রেমিদিওস দ্য বিউটি একদিন বিকেল চারটায় উঠোনে সাদা একটা চাদর
ভাঁজ করতে করতে উড়ে চলে গিয়েছিল সেই একই পথে। রেমিদিওস ছিল মাকোন্দোর
ইতিহাসের সবচেয়ে রূপসী, যার প্রতি ভালোবাসা ও কামনায় জর্জর হয়ে টপ্ টপ্ করে
মারা যাচ্ছিল সেখানকার যুবকেরা। তার এত রূপ ও প্রজ্ঞা ধারণ করার জন্য তৈরি
ছিল না পৃথিবী, তাই তাকে যেতেই হলো। মার্কেসের উজ্জ্বল-বর্ণ, অতি ঘন বুনোট
গদ্যের (জড়ানো-প্যাঁচানো, শিকড়ে শিকড়ে এক হয়ে থাকা জঙ্গলের হাজারো গাছের
ঘন-জমাট নিবিড়তার কথা মনে আসে তাঁর অধিকাংশ বাক্য পড়লেই) সৌন্দর্যও এমন যে
তা পড়ে শেষ করে ওঠার সুগহন হাহাশ্বাস আর আনন্দ, পুলক আর সন্তাপ সব পাঠক
সইতে পারেন না। এমনও বাস্তব উদাহরণ আছে যে চন্দ্রগ্রস্ত হওয়ার মতো তাঁর
গদ্যগ্রস্ত হয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছে পাঠককে; প্যারাগুয়েতে পুলিশকে আসতে
হয়েছে গভীর রাতে কোনো পাঠকের বাড়ির সামনে বড় রাস্তায় দাঁড়িয়ে ‘গাবো, গাবো’
আর্তনাদ থামাতে। মার্কেসের গভীর গদ্যের আঠালো আচ্ছন্নতায় পাগল এসব পাঠক
পাড়ার লোককে ঘুমোতে দিচ্ছে না তাই নিশ্চিত কেউ না কেউ ফোন করেছিল থানায়।
অতএব, বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি পাঠককে তাঁর জাদুকরি গদ্যের ভাববিহ্বলতায় মজে
শ্বাসরুদ্ধ হওয়া থেকে খানিক থিতু হতে দেওয়ার জন্যই যেন গার্সিয়া মার্কেসকেও
শেষমেশ চলে যেতেই হলো।
পশ্চিমা মিডিয়া মার্কেসকে ইতিমধ্যে ‘পাঠক ও সমালোচক দুয়ের কাছেই পূজনীয়’ এমন অতি দুর্লভ লেখক তালিকায় চার্লস ডিকেন্স, মার্ক টোয়েন ও লিও টলস্টয়েরও ওপরে স্থান দিয়ে ফেলেছে। তারা বলছে, সমালোচকদের চোখে বোর্হেস আধুনিক লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের সবচেয়ে বড় তারকা হতে পারেন, কিন্তু পাঠক ও সমালোচকের যোগফলের বিমূর্ত যে জায়গা, সেখানে মার্কেসের ওপরে কেউ নেই—বিশ্বসাহিত্যে কোনো কালেও কেউ ছিল না।
এ দাবির সত্যতা কতটুকু? জানি না। আমার শুধু মনে পড়ছে মাত্র মাস তিনেক আগে দ্বিতীয়বার তাঁর ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস্ অব সলিচ্যুড পড়ার কথা। মধ্য বয়সের নিরাবেগ এই দ্বিতীয় পাঠে মনে হলো, উপন্যাসটি মাস্টারপিস এ কারণেই যে এটা একটা এপিসোডিক আখ্যান, যার আবার রয়েছে কঠোর এক প্রকরণ। এপিসোডিক আখ্যান আর কঠোর সুশৃঙ্খলতা সাধারণত একসঙ্গে যায় না। শৃঙ্খলা সেখানে ভেঙে পড়ে অনেক এলেবেলে আকার নিয়ে, ঠিক যেমনটা পড়েছে গুন্টার গ্রাসের টিন ড্রাম বা সালমান রুশদির মিডনাইটস্ চিলড্রেন-এ। ফর্মের এই শিথিলতা মার্কেসের উপন্যাসে একদমই নেই—সবকিছু ছকে বাঁধা, অতি গোছানো। শুরু থেকেই আমরা জানি, সেখানে মাকোন্দো নামের গ্রামটি মাত্র এক শতাব্দীই টিকবে, অতএব, এ উপন্যাসের ন্যারেটিভের দৈর্ঘ্য প্রথম থেকেই একটা সীমার মধ্যে ধরাবাঁধা। আবার কিছু দূর এগিয়ে আমরা এও জেনে যাই, যে বইটি পড়ছি তা মেলকিয়াদেস্ নামের এক আজব জিপসির লেখা; আর অরেলিয়ানো যখন সেই বইয়ের শেষ পাতাগুলো পড়ছে, আমরাও তখন তার সঙ্গে মিলে তা-ই পড়ছি; এরপর যেইমাত্র ওই এক শ বছর শেষ হলো, মাকোন্দো নামের গ্রাম ও মেলকিয়াদেসের সেই পাণ্ডুলিপিও উড়ে গেল হাওয়ায়।
উপন্যাসটি প্রকাশ হওয়া মাত্র বিশ্বজয় করে ফেললেন মার্কেস। এই অতিদ্রুত বিশ্বজয়ের বড় কারণ, এটাই বিশ্বসাহিত্যে জাদুবাস্তবতার প্রথম বড় মাপের লেখা। জাদুবাস্তবতা একটা টেকনিক—আপাত স্বাভাবিক, দৈনন্দিন পৃথিবীর কিছু কিছু জিনিস সেখানে অবিশ্বাস্য কিছু নিয়মে বা ভঙ্গিতে ঘটে। দ্বিতীয় পাঠেও আমি একইভাবে অভিভূত হয়েছিলাম উপন্যাসের সেই অংশে এসে যেখানে এক সদ্য মৃত পুত্রের রক্ত সারা গ্রাম ঘুরে এসে শেষমেশ তার মায়ের পায়ের কাছে হাজির হলো। আরেকটা চিরস্মরণীয় অংশ রয়েছে কর্নেল অরলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার হতভাগ্য ১৭ পুত্রকে নিয়ে। ৩২টি গৃহযুদ্ধে অংশ নেওয়া এই কর্নেলের ১৭ ছেলে জন্মেছে ভিন্ন ভিন্ন ১৭ নারীর গর্ভে। যখন কর্নেলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে সরকার তার ছেলেদের খুন করবে বলে পণ করল, তাদের খুঁজে পেতে কোনোই অসুবিধা হলো না সৈন্যদের। কারণ এই ১৭ জনের কপালেই কাটা আছে রহস্যময় ও চিরস্থায়ী অ্যাশ ওয়েডেনসেডর ক্রুশ চিহ্ন!
জাদুবাস্তবতা নিয়ে মার্কেসের আগেই কাজ করেছেন হোর্হে লুইস বোর্হেস ও আলেহো কার্পেন্তিয়ের। বোর্হেসের ‘দি কংগ্রেস’ গল্পে (যার রচনাকাল মার্কেসের উপন্যাসের অনেক আগে) আগেই জেনেছিলাম, জাদুবাস্তবতা কত মোহনীয় এক টেকনিক! পৃথিবীতে মানুষের ইতিহাস ও লেখা সব বইকে বাঁচানোর জন্য সেখানে হাজির হয়েছে নানা দেশের নানা মানুষ—সবাই মিলেই এই কংগ্রেস। বোর্হেস লিখছেন: ‘(এই কংগ্রেসের) প্রতি সমর্থনের বার্তা আসতে লাগল পেরু, ডেনমার্ক, হিন্দুস্তান থেকে। বলিভিয়ার এক ভদ্রলোক উল্লেখ করলেন, তাঁর দেশের সব দিকেই মাটি, কোনোদিকেই কোনো সমুদ্র (পানি) নেই, অতএব, তার পরামর্শ যে, আমাদের (কংগ্রেসের) একেবারে প্রথম দিকের তর্কটাই হওয়া উচিত দেশের এই শোচনীয় অবস্থা নিয়ে।’—মানে? এই কজন লোক মিলে কি তবে বলিভিয়া দেশটার পাশে কোনো সমুদ্র পুঁতে দেবে নাকি?
গার্সিয়া মার্কেস ও বোর্হেসের আগে হিস্পানি ভাষার সাহিত্য ছিল আলংকারিক ও চর্বিসমৃদ্ধ গদ্যে লেখা শুভ-অশুভের দ্বন্দ্ব ও শেষে শুভের জয়—এই কাহিনিতে ভরপুর, শৈলীর বিচারে এটি প্রাদেশিক, প্রতীক-রূপকে ভরা প্রাচীন ও অতি দীর্ঘায়তন। বোর্হেস সেই দীর্ঘায়তন উপাখ্যানকে নিয়ে এলেন কয়েক পাতার ছোট গল্পে, আর মার্কেস এক ভল্যুমের মাঝারি ও ছোট সাইজের উপন্যাসে—ঘন বুনোটের ঐন্দ্রজালিক গদ্যে কিন্তু একইসঙ্গে সরল সোজা এক পরিবেশনায়। শেষ বিচারে আমার কাছে মনে হয়, কবিতায় সামান্য কিছু পৃষ্ঠার মধ্যে আধুনিক মহাকাব্য লেখার যে প্রকরণটা শিখিয়েছিলেন টি এস এলিয়ট ও স্যাঁ-ঝন পের্স, উপন্যাসে তেমনই অভিযাত্রা; গৃহযুদ্ধ, প্রেম ও যৌনতা, অজাচার, বুলেট ও বিদ্রোহ, সুস্থতা ও পাগলামি এবং নিয়তি—এই সব মহাকাব্যিক ব্যাপ্তিকে যে আসলে ঘনীভবন করে আনা যায় সামান্য কয়েকটি পৃষ্ঠায়, তা আমরা প্রথম শিখলাম গার্সিয়া মার্কেসের কাছ থেকেই।
সালমান রুশদিকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, গার্সিয়া মার্কেসের প্রভাব তাঁর ওপরে কতটুকু? রুশদি উত্তরে বলেছিলেন, মার্কেসের সঙ্গে তাঁর সাদৃশ্য জাদুবাস্তবতার কারণে নয়, বরং গল্প বলার ক্ষেত্রেই রয়েছে সাদৃশ্য। ‘কিছু লেখক আছেন যাঁদের কাছে স্বাভাবিকতার বাস্তব প্রক্রিয়াটুকু যথেষ্ট মনে হয় না।’ এই লেখক তালিকায় রুশদি উল্লেখ করলেন ইতালো কালভিনো, গুন্টার গ্রাস, মিলান কুন্ডেরা, গার্সিয়া মার্কেস ও নিজের নাম। তিনি আরও বললেন, তাহলে ‘বিকল্প যে প্রক্রিয়াটি’ থাকল—অর্থাৎ বাস্তবকে বলতে হবে গপ্পোবাজের মতো করে, রং চড়িয়ে, আকারে-আয়তনে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে আর সাধারণ-স্বাভাবিক বাস্তবতার একঘেয়েমি থেকে ছাড়িয়ে আনতে হবে পাঠককে; এই ‘বিকল্প প্রক্রিয়াটি’ অন্যরা সবাই শিখেছেন ‘মূলত গার্সিয়া মার্কেস থেকে, যেমন কম কথায় বেশি বলা আমরা শিখেছি কাফকা ও বোর্হেস থেকে।’—অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা। পাঠক হিসেবে মার্কেসের ঘনীভবনকৃত লিরিক্যাল গদ্যের আমি যতটা না ভক্ত, তার চেয়েও বেশি ভক্ত তাঁর গল্প বলার এই ‘অস্বাভাবিক’ ক্ষমতার, যে ক্ষমতা দেখিয়ে দেয় কীভাবে মিথ্যা কথা—পদার্থবিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব ও প্রথাগত নৈতিকতার নিরিখে মিথ্যা কথা সত্যের চেয়েও বড় সত্য হয়ে উঠতে পারে। পৃথিবীর সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসজুড়ে যে রক্তপাত, নিয়তির হাতে তাড়িত ব্যক্তির ইতিহাসজুড়ে যে হতাশা ও নিঃসঙ্গতার বোধ, এর ‘টোটাল ইফেক্ট’কে ছুঁতে গেলে লজিকের বাইরে আপনাকে যেতেই হবে।
মার্কেসের সাহিত্য ওই আপাত ইল্লজিকেরই সাহিত্য, আর প্রত্যেকটি মানুষ জাতে বা আদতে অর্ধপাগল ও অর্ধসুস্থের মাঝামাঝি চরিত্রের কিছু বলেই গার্সিয়া মার্কেসের ইল্লজিকের এত ভক্ত তারা। এই অর্থে মার্কেস এক জাদুর আয়না, যেখানে মানবসন্তানেরা সভ্যতার সভ্য ও অসভ্য দুই চেহারাই সমান্তরালে দেখে হয় বিমূঢ় হয়ে পড়ে, না হয় মুচকি হাসে। তবে সবচেয়ে বড় হাসিটি হাসতেন মার্কেস নিজে। অন্তর্জালে তাঁর শিশুর মতো জিভ বের করা, ভেংচি কাটা কিছু ছবি আছে। দুঃখ এটুকুই যে আমরা গার্সিয়া মার্কেস পড়ে আজও মুচকি হেসেই যাব, কিন্তু তাঁর দুষ্টু হাসির ক্ষমতার এখানেই ইতি। মানবনিয়তির ক্রূর থাবা যে কতটা ক্ষমাহীন, বুঝতে হলে আপনাকে পড়তে হবে তাঁর উপন্যাস লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা এবং ক্রনিকল অব এ ডেথ ফোরটোল্ড। এগুলো পড়ার পর সেই নিয়তির থাবা কীভাবে লেখক গার্সিয়া মার্কেসের সরল, ব্যঙ্গাত্মক হাসিটি কেড়ে নিল শেষমেশ, ভেবে হয়তো চোখে পানি এসে যাবে আপনার। হিস্পানি ভাষায় ‘গাবো’র পাশাপাশি মার্কেসকে ‘জোকার’ (হিস্পানিতে ‘mamagallista’) নামেও ডাকা হতো। এই ডাক ব্যঙ্গার্থে বা তুচ্ছার্থে নয়; বরং এক লেখক অনর্গল মিথ্যা কথা বলে বলে সবচেয়ে সত্য কথাগুলোই যে গল্পে বলে যাচ্ছেন, অনেকটা তাঁর এই অতিমানবীয় ক্ষমতাকে স্বীকার করে নেওয়া অর্থে। মার্কেস যদি জোকার না হবেন তবে কেন স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে লাতিন আমেরিকা মহাদেশের মুক্তিদাতা সিমোন বলিভারের মতো বীরকে নিয়ে লেখা দি জেনারেল ইন হিজ ল্যাবিরিন্থ উপন্যাসে এ রকম মহান পুরুষের বুড়ো বয়সে ঘন ঘন বিশাল আওয়াজে বায়ুত্যাগের কথা উল্লেখ করবেন? একমাত্র মার্কেসের পক্ষেই এটা সম্ভব। সালাম, হে মহান জোকার
পশ্চিমা মিডিয়া মার্কেসকে ইতিমধ্যে ‘পাঠক ও সমালোচক দুয়ের কাছেই পূজনীয়’ এমন অতি দুর্লভ লেখক তালিকায় চার্লস ডিকেন্স, মার্ক টোয়েন ও লিও টলস্টয়েরও ওপরে স্থান দিয়ে ফেলেছে। তারা বলছে, সমালোচকদের চোখে বোর্হেস আধুনিক লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের সবচেয়ে বড় তারকা হতে পারেন, কিন্তু পাঠক ও সমালোচকের যোগফলের বিমূর্ত যে জায়গা, সেখানে মার্কেসের ওপরে কেউ নেই—বিশ্বসাহিত্যে কোনো কালেও কেউ ছিল না।
এ দাবির সত্যতা কতটুকু? জানি না। আমার শুধু মনে পড়ছে মাত্র মাস তিনেক আগে দ্বিতীয়বার তাঁর ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস্ অব সলিচ্যুড পড়ার কথা। মধ্য বয়সের নিরাবেগ এই দ্বিতীয় পাঠে মনে হলো, উপন্যাসটি মাস্টারপিস এ কারণেই যে এটা একটা এপিসোডিক আখ্যান, যার আবার রয়েছে কঠোর এক প্রকরণ। এপিসোডিক আখ্যান আর কঠোর সুশৃঙ্খলতা সাধারণত একসঙ্গে যায় না। শৃঙ্খলা সেখানে ভেঙে পড়ে অনেক এলেবেলে আকার নিয়ে, ঠিক যেমনটা পড়েছে গুন্টার গ্রাসের টিন ড্রাম বা সালমান রুশদির মিডনাইটস্ চিলড্রেন-এ। ফর্মের এই শিথিলতা মার্কেসের উপন্যাসে একদমই নেই—সবকিছু ছকে বাঁধা, অতি গোছানো। শুরু থেকেই আমরা জানি, সেখানে মাকোন্দো নামের গ্রামটি মাত্র এক শতাব্দীই টিকবে, অতএব, এ উপন্যাসের ন্যারেটিভের দৈর্ঘ্য প্রথম থেকেই একটা সীমার মধ্যে ধরাবাঁধা। আবার কিছু দূর এগিয়ে আমরা এও জেনে যাই, যে বইটি পড়ছি তা মেলকিয়াদেস্ নামের এক আজব জিপসির লেখা; আর অরেলিয়ানো যখন সেই বইয়ের শেষ পাতাগুলো পড়ছে, আমরাও তখন তার সঙ্গে মিলে তা-ই পড়ছি; এরপর যেইমাত্র ওই এক শ বছর শেষ হলো, মাকোন্দো নামের গ্রাম ও মেলকিয়াদেসের সেই পাণ্ডুলিপিও উড়ে গেল হাওয়ায়।
উপন্যাসটি প্রকাশ হওয়া মাত্র বিশ্বজয় করে ফেললেন মার্কেস। এই অতিদ্রুত বিশ্বজয়ের বড় কারণ, এটাই বিশ্বসাহিত্যে জাদুবাস্তবতার প্রথম বড় মাপের লেখা। জাদুবাস্তবতা একটা টেকনিক—আপাত স্বাভাবিক, দৈনন্দিন পৃথিবীর কিছু কিছু জিনিস সেখানে অবিশ্বাস্য কিছু নিয়মে বা ভঙ্গিতে ঘটে। দ্বিতীয় পাঠেও আমি একইভাবে অভিভূত হয়েছিলাম উপন্যাসের সেই অংশে এসে যেখানে এক সদ্য মৃত পুত্রের রক্ত সারা গ্রাম ঘুরে এসে শেষমেশ তার মায়ের পায়ের কাছে হাজির হলো। আরেকটা চিরস্মরণীয় অংশ রয়েছে কর্নেল অরলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার হতভাগ্য ১৭ পুত্রকে নিয়ে। ৩২টি গৃহযুদ্ধে অংশ নেওয়া এই কর্নেলের ১৭ ছেলে জন্মেছে ভিন্ন ভিন্ন ১৭ নারীর গর্ভে। যখন কর্নেলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে সরকার তার ছেলেদের খুন করবে বলে পণ করল, তাদের খুঁজে পেতে কোনোই অসুবিধা হলো না সৈন্যদের। কারণ এই ১৭ জনের কপালেই কাটা আছে রহস্যময় ও চিরস্থায়ী অ্যাশ ওয়েডেনসেডর ক্রুশ চিহ্ন!
জাদুবাস্তবতা নিয়ে মার্কেসের আগেই কাজ করেছেন হোর্হে লুইস বোর্হেস ও আলেহো কার্পেন্তিয়ের। বোর্হেসের ‘দি কংগ্রেস’ গল্পে (যার রচনাকাল মার্কেসের উপন্যাসের অনেক আগে) আগেই জেনেছিলাম, জাদুবাস্তবতা কত মোহনীয় এক টেকনিক! পৃথিবীতে মানুষের ইতিহাস ও লেখা সব বইকে বাঁচানোর জন্য সেখানে হাজির হয়েছে নানা দেশের নানা মানুষ—সবাই মিলেই এই কংগ্রেস। বোর্হেস লিখছেন: ‘(এই কংগ্রেসের) প্রতি সমর্থনের বার্তা আসতে লাগল পেরু, ডেনমার্ক, হিন্দুস্তান থেকে। বলিভিয়ার এক ভদ্রলোক উল্লেখ করলেন, তাঁর দেশের সব দিকেই মাটি, কোনোদিকেই কোনো সমুদ্র (পানি) নেই, অতএব, তার পরামর্শ যে, আমাদের (কংগ্রেসের) একেবারে প্রথম দিকের তর্কটাই হওয়া উচিত দেশের এই শোচনীয় অবস্থা নিয়ে।’—মানে? এই কজন লোক মিলে কি তবে বলিভিয়া দেশটার পাশে কোনো সমুদ্র পুঁতে দেবে নাকি?
গার্সিয়া মার্কেস ও বোর্হেসের আগে হিস্পানি ভাষার সাহিত্য ছিল আলংকারিক ও চর্বিসমৃদ্ধ গদ্যে লেখা শুভ-অশুভের দ্বন্দ্ব ও শেষে শুভের জয়—এই কাহিনিতে ভরপুর, শৈলীর বিচারে এটি প্রাদেশিক, প্রতীক-রূপকে ভরা প্রাচীন ও অতি দীর্ঘায়তন। বোর্হেস সেই দীর্ঘায়তন উপাখ্যানকে নিয়ে এলেন কয়েক পাতার ছোট গল্পে, আর মার্কেস এক ভল্যুমের মাঝারি ও ছোট সাইজের উপন্যাসে—ঘন বুনোটের ঐন্দ্রজালিক গদ্যে কিন্তু একইসঙ্গে সরল সোজা এক পরিবেশনায়। শেষ বিচারে আমার কাছে মনে হয়, কবিতায় সামান্য কিছু পৃষ্ঠার মধ্যে আধুনিক মহাকাব্য লেখার যে প্রকরণটা শিখিয়েছিলেন টি এস এলিয়ট ও স্যাঁ-ঝন পের্স, উপন্যাসে তেমনই অভিযাত্রা; গৃহযুদ্ধ, প্রেম ও যৌনতা, অজাচার, বুলেট ও বিদ্রোহ, সুস্থতা ও পাগলামি এবং নিয়তি—এই সব মহাকাব্যিক ব্যাপ্তিকে যে আসলে ঘনীভবন করে আনা যায় সামান্য কয়েকটি পৃষ্ঠায়, তা আমরা প্রথম শিখলাম গার্সিয়া মার্কেসের কাছ থেকেই।
সালমান রুশদিকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, গার্সিয়া মার্কেসের প্রভাব তাঁর ওপরে কতটুকু? রুশদি উত্তরে বলেছিলেন, মার্কেসের সঙ্গে তাঁর সাদৃশ্য জাদুবাস্তবতার কারণে নয়, বরং গল্প বলার ক্ষেত্রেই রয়েছে সাদৃশ্য। ‘কিছু লেখক আছেন যাঁদের কাছে স্বাভাবিকতার বাস্তব প্রক্রিয়াটুকু যথেষ্ট মনে হয় না।’ এই লেখক তালিকায় রুশদি উল্লেখ করলেন ইতালো কালভিনো, গুন্টার গ্রাস, মিলান কুন্ডেরা, গার্সিয়া মার্কেস ও নিজের নাম। তিনি আরও বললেন, তাহলে ‘বিকল্প যে প্রক্রিয়াটি’ থাকল—অর্থাৎ বাস্তবকে বলতে হবে গপ্পোবাজের মতো করে, রং চড়িয়ে, আকারে-আয়তনে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে আর সাধারণ-স্বাভাবিক বাস্তবতার একঘেয়েমি থেকে ছাড়িয়ে আনতে হবে পাঠককে; এই ‘বিকল্প প্রক্রিয়াটি’ অন্যরা সবাই শিখেছেন ‘মূলত গার্সিয়া মার্কেস থেকে, যেমন কম কথায় বেশি বলা আমরা শিখেছি কাফকা ও বোর্হেস থেকে।’—অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা। পাঠক হিসেবে মার্কেসের ঘনীভবনকৃত লিরিক্যাল গদ্যের আমি যতটা না ভক্ত, তার চেয়েও বেশি ভক্ত তাঁর গল্প বলার এই ‘অস্বাভাবিক’ ক্ষমতার, যে ক্ষমতা দেখিয়ে দেয় কীভাবে মিথ্যা কথা—পদার্থবিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব ও প্রথাগত নৈতিকতার নিরিখে মিথ্যা কথা সত্যের চেয়েও বড় সত্য হয়ে উঠতে পারে। পৃথিবীর সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসজুড়ে যে রক্তপাত, নিয়তির হাতে তাড়িত ব্যক্তির ইতিহাসজুড়ে যে হতাশা ও নিঃসঙ্গতার বোধ, এর ‘টোটাল ইফেক্ট’কে ছুঁতে গেলে লজিকের বাইরে আপনাকে যেতেই হবে।
মার্কেসের সাহিত্য ওই আপাত ইল্লজিকেরই সাহিত্য, আর প্রত্যেকটি মানুষ জাতে বা আদতে অর্ধপাগল ও অর্ধসুস্থের মাঝামাঝি চরিত্রের কিছু বলেই গার্সিয়া মার্কেসের ইল্লজিকের এত ভক্ত তারা। এই অর্থে মার্কেস এক জাদুর আয়না, যেখানে মানবসন্তানেরা সভ্যতার সভ্য ও অসভ্য দুই চেহারাই সমান্তরালে দেখে হয় বিমূঢ় হয়ে পড়ে, না হয় মুচকি হাসে। তবে সবচেয়ে বড় হাসিটি হাসতেন মার্কেস নিজে। অন্তর্জালে তাঁর শিশুর মতো জিভ বের করা, ভেংচি কাটা কিছু ছবি আছে। দুঃখ এটুকুই যে আমরা গার্সিয়া মার্কেস পড়ে আজও মুচকি হেসেই যাব, কিন্তু তাঁর দুষ্টু হাসির ক্ষমতার এখানেই ইতি। মানবনিয়তির ক্রূর থাবা যে কতটা ক্ষমাহীন, বুঝতে হলে আপনাকে পড়তে হবে তাঁর উপন্যাস লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা এবং ক্রনিকল অব এ ডেথ ফোরটোল্ড। এগুলো পড়ার পর সেই নিয়তির থাবা কীভাবে লেখক গার্সিয়া মার্কেসের সরল, ব্যঙ্গাত্মক হাসিটি কেড়ে নিল শেষমেশ, ভেবে হয়তো চোখে পানি এসে যাবে আপনার। হিস্পানি ভাষায় ‘গাবো’র পাশাপাশি মার্কেসকে ‘জোকার’ (হিস্পানিতে ‘mamagallista’) নামেও ডাকা হতো। এই ডাক ব্যঙ্গার্থে বা তুচ্ছার্থে নয়; বরং এক লেখক অনর্গল মিথ্যা কথা বলে বলে সবচেয়ে সত্য কথাগুলোই যে গল্পে বলে যাচ্ছেন, অনেকটা তাঁর এই অতিমানবীয় ক্ষমতাকে স্বীকার করে নেওয়া অর্থে। মার্কেস যদি জোকার না হবেন তবে কেন স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে লাতিন আমেরিকা মহাদেশের মুক্তিদাতা সিমোন বলিভারের মতো বীরকে নিয়ে লেখা দি জেনারেল ইন হিজ ল্যাবিরিন্থ উপন্যাসে এ রকম মহান পুরুষের বুড়ো বয়সে ঘন ঘন বিশাল আওয়াজে বায়ুত্যাগের কথা উল্লেখ করবেন? একমাত্র মার্কেসের পক্ষেই এটা সম্ভব। সালাম, হে মহান জোকার
No comments:
Post a Comment