আইনী বাধ্যবাধকতা থাকলেও গবেষণায় আগ্রহ নেই বেশির ভাগ বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়ের। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন (২০১০) অনুযায়ী সব কটি
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবছর বাজেটে গবেষণা খাতে একটি বরাদ্দ রেখে তা
খরচ করার কথা। কিন্তু সব বিশ্ববিদ্যালয় তা করছে না। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়
গবেষণা খাতে খরচ দেখালেও প্রতিবছর গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করছে না। ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন,
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ দুটি। প্রথমত, শিক্ষাদান, দ্বিতীয়ত,
শিক্ষাদানের জন্য নতুন নতুন জ্ঞানের উদ্ভাবন।

একটিকে
বাদ দিয়ে আরেকটি চলে না। এ জন্য শিক্ষকদের গবেষণা করতে হবে। তাঁরা
প্রতিনিয়ত সেসব প্রকাশ করবেন, প্রবন্ধ লিখবেন, সেমিনার করবেন। অক্সফোর্ড
ডিকশনারিতে ইউনিভার্সিটি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে,
বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে একটি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে শিক্ষার্থীরা
ডিগ্রির জন্য অধ্যয়ন করেন এবং একাডেমিক গবেষণা করা হয়। বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ২০১২ সালের যে তথ্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে
দিয়েছিল (গত বছরের নভেম্বরে প্রকাশিত), তাতে দেখা যায়, ওই বছর ৬০টি
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৩টিতে কোনো গবেষণা প্রকল্প পরিচালিত হয়নি।
পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে গবেষণা প্রকল্প পরিচালিত হয়েছে। ১৫টি
বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতে কোনো ধরনের টাকাও খরচ করেনি। ৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয়
কোনো গবেষণা বৃত্তি দেয়নি। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সিরাজুল ইসলাম
চৌধুরী বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণাকে উত্সাহিত করা হয় না।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশও নেই। এটি দুঃখজনক। যদি গবেষণা
না থাকে, তাহলে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়
মঞ্জুরি কমিশন তাদের সর্বশেষ (২০১২) প্রতিবেদনে বলেছে, উচ্চ শিক্ষার
মানোন্নয়নে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। ২০১২ সালে ১৫টি বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা কার্যক্রমে কোনো অর্থ ব্যয় করেনি, যা উচ্চ শিক্ষার
মানোন্নয়নে প্রতিবন্ধক বলে কমিশন মনে করে। কমিশনের এই মতের সঙ্গে সম্পূর্ণ
একমত পোষণ করেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির চেয়ারম্যান সি এম শফি সামি।
যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে
মানসম্মত উচ্চ শিক্ষা দিতে হলে গবেষণা কার্যক্রমের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, বেসরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা
হয়, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে হয় না। যোগ্য শিক্ষকের অভাব এবং ইচ্ছার অভাব
গবেষণা কম হওয়ার কারণ বলে তিনি মনে করেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে
(২০১০) প্রতিবছর গবেষণা খাতে ব্যয় করার বাধ্যবাধকতা আছে। আইনে সনদ পাওয়ার
শর্তাবলীতে বলা আছে, সাময়িক অনুমতিপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সনদ পাওয়ার
ক্ষেত্রে সাতটি শর্ত পূরণ করতে হবে। এর একটি হলো (৯ এর ৬ ধারা) বার্ষিক
বাজেটের ব্যয় খাতে কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত একটি অংশ গবেষণার জন্য বরাদ্দ
রেখে তা ব্যয় করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রতিবেদনে দেখা
যায়, এমন অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যেগুলো গবেষণা খাতে নিজেদের
ব্যয় দেখিয়েছে। কিন্তু কোনো গবেষণা প্রকল্প ওই বছর পরিচালিত হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা মাস্টার্সে যে
থিসিস করেন, তা এ খাতে বিবেচনা করা হয়। তবে সার্বিকভাবে গবেষণা খাতে
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যয় আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। ২০১২ সালে
৪৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় ছিল ৪১ কোটি টাকার বেশি। এর আগের বছর এ খাতে
ব্যয় ছিল ২৬ কোটি টাকার মতো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার ব্যয় বাড়ায়
সন্তোষ প্রকাশ করে কমিশন। ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড
সায়েন্সের (ইউআইটিএস) উপাচার্য মুহাম্মদ সামাদ বলেন, বাংলাদেশে বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাগত কাঠামো এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে গবেষণা, আবিষ্কারে বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরই অবদান বেশি। বাংলাদেশে তার উল্টো। এখানকার অনেক
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। সদিচ্ছার অভাব, বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয় আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও পর্যবেক্ষণের অভাবকে তিনি এ জন্য দায়ী
করেন। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ছিল: ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড
টেকনোলজি চট্টগ্রাম, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইন্টারন্যাশনাল
ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান
ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট, ব্র্যাক, স্টামফোর্ড, আমেরিকান
ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক,
সাউথ ইস্ট, ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল, ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, মানারাত
ইন্টারন্যাশনাল, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, নর্দান ইউনিভার্সিটি,
প্রাইম ইউনিভার্সিটি। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ছিল না: নর্থ সাউথ,
প্রিমিয়ার, সিটি ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি,
গণবিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, লিডিং ইউনিভার্সিটি,
শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, ইউনিভার্সিটি অব
ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ, গ্রীন ইউনিভার্সিটি, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি,
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ইস্টার্ন
ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি
অ্যান্ড সায়েন্স, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল
আর্টস বাংলাদেশ, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব
বাংলাদেশ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, প্রাইমেশিয়া ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, আশা ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ডেল্টা, সিলেট
ইন্টারন্যাশনাল, দি মিলেনিয়াম, সেন্ট্রাল উইমেন্স, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি
অব বাংলদেশ, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি, সাউদার্ন, ইবাইস, অতীশ দীপঙ্কর
ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল
ইউনিভার্সিটি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, দারুল ইহসান, ইউরোপিয়ান
ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়,
বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি, নর্থ ইস্ট, ফার্স্ট
ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি,
জেড এইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
No comments:
Post a Comment