‘অসাম্যের বিশ্বে সাম্যের স্বপ্ন’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতায় ড. অনুপম সেন ।। অধ্যাপক খালেদ সকলকে সমচোখে দেখতেন, যথার্থই তিনি অভিভাবক ।। পুঁজিবাদী আগ্রাসন থেকে বেরুতে না পারলে সাম্যের বিশ্ব গড়ে তোলা যাবে না : এম এ মালেক
সভ্য বিশ্ব
বলতে বুঝায় সাম্যের বিশ্ব। অসাম্য দূর করতে হলে শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে পূর্ণতা আনতে হবে। তবেই আমরা প্রকৃত সত্যটা অনুধাবন করতে
পারবো। বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থার মদদপুষ্ট আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক নিত্য
নতুন প্রেসক্রিপশন দিয়ে তা মানতে বাধ্য করছে আমাদের। অন্যের প্রেসক্রিপশন
অনুযায়ী আমাদের চলতেই হবে এমনটা নয়। দেশের মানুষকে স্বাবলম্বী করে তুলতে
হলে রাষ্ট্রকে ভূমিকা রাখতে হবে। রাষ্ট্র বিনিয়োগ করতে পারে। তারা বিনিয়োগ
করলেই মানুষের হাতে টাকা আসবে। অর্থনৈতিক উন্নতি হবে।

গতকাল চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব আয়োজিত অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ স্মারক বক্তৃতা ‘অসাম্যের বিশ্বে সাম্যের স্বপ্ন’ শীর্ষক বক্তব্য প্রদানকালে খ্যাতিমান সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন এ অভিমত ব্যক্ত করেন। অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ প্রসঙ্গে স্মারক বক্তৃতার প্রারম্ভে ড. অনুপম সেন বলেন, সত্যনিষ্ঠ, সাহসী ও নির্লোভ ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক খালেদ একজন আলোকিত ব্যক্তিত্ব। দেশের সংবিধানের অন্যতম রচয়িতা, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ হিসেবেও তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব। যুগে যুগে চট্টগ্রামের কীর্তিমান পুরুষগণ জাতিকে আলোর পথে পরিচালনায় ভূমিকা রেখে গেছেন। অধ্যাপক খালেদ মুক্তবুদ্ধি চর্চায় পথিকৃৎ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, অধ্যাপক খালেদ সকলকে সমচোখে দেখতেন। যথার্থই তিনি আমাদের অভিভাবক ছিলেন।
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব সভাপতি আলী আব্বাসের সভাপতিত্বে ও চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মহসিন চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন, দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক, কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন ও চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি এজাজ ইউসুফি। পরিবারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের সন্তান সাংবাদিক মোহাম্মদ জহির। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহ সভাপতি রাশেদ রউফ ।
ড. অনুপম সেন বলেন, সংগ্রাম ছাড়া সাম্যের বিশ্ব গড়ে উঠেনি, উঠবেও না। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, আমেরিকার সংবিধানে সবার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেখানেও কালোদের কোন অধিকার দেওয়া হয় নি। তার জন্য ১০০ বছর সংগ্রাম করতে হয়েছে। আজ শুধু আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশেই নয়, বিশ্ব জুড়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ইউরোপে আজ মানুষের হাতে টাকা নেই। ইউরোপ ও আমেরিকার দুটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে সেখানে ৪৫ শতাংশ সম্পদ মাত্র ৫ শতাংশ লোকের হাতে মুঠোবন্দী হয়ে পড়েছে। মাত্র ৫ শতাংশ লোকের আয় ও সম্পদ বেড়েছে সেখানে। ভাবা যায়, আমেরিকায় সাড়ে চার কোটি লোক দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করছে! মানুষের হাতে টাকা না থাকলে রাষ্ট্রকে ভূমিকা নিতে হবে। সেটা তারা নিচ্ছেও। আমাদের দেশেও সেটি করা যায়। রাষ্ট্রীয়ভাবে বিনিয়োগের চিন্তা করতে হবে। জানি একটা অন্ধকার সময় আমরা পার করছি। কিন্তু এটাওতো ঠিক গত সহস্রাব্দে আমরা যতোটা অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিলাম, এই সহস্রাব্দে তা অনেকখানি কেটে গেছে। আগামী ১০০ থেকে ১৫০ বছরের মধ্যে এ বিশ্ব সাম্যের বিশ্ব হয়ে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক বলেন, বর্তমান বিশ্ব জুড়ে পুঁজিবাদী যে আগ্রাসন চলছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে অসাম্য বিশ্ব কখনো গড়ে তোলা যাবে না। এক্ষেত্রে নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের সোশ্যাল বিজনেস পলিসি একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, ২০ % লোকের হাতে জিম্মি হয়ে আছে বিশ্ব অর্থনীতি। সেটি ১০০ % লোকের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। আর এক্ষেত্রে শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে যে হারে গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়ার হিড়িক পড়েছে, তা দিয়ে সাম্য ব্যবস্থা কতোটা গড়ে তোলা সম্ভব তা ভেবে দেখতে হবে। মান সম্পন্ন শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। তিনি আরো বলেন, আমাদের অনেক স্বপ্ন আছে, ভাবনা আছে। শুধু ভেবে গেলেই হবে না, আমাদের ভাবনাটাকে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থাও করতে হবে।
কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেন, নেতৃত্বের গুণাবলী সম্পন্ন নেতার সংকট চলছে দেশে। গভীর অন্তঃদৃষ্টির শূন্যতা চলছে; যে অন্তঃদৃষ্টি ছিল অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের মতো মানুষদের। অবহেলিত চট্টগ্রামের উন্নয়ন এবং এ জনপদে আলোকিত মানুষ সৃষ্টিতে তিনি যে দূরদর্শিতা দেখিয়েছেন তা অতুলনীয়। জীবৎকালে দেখিয়ে গেছেন মানবমুক্তি এবং সমাজমুক্তির লক্ষ্যে কাজ করাই সাংবাদিকদের প্রকৃষ্ট পথ। তিনি বলেন, প্রফেসর খালেদ ছিলেন বহু গুণে গুণান্বিত এক ব্যক্তিত্ব। তিনি অধ্যাপনা করেছেন, রাজনীতি করেছেন, সাংবাদিকতা করেছেন। তবে সবচেয়ে বড়ো কথা তিনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন। নিজেকে একটি অনুকরণীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৬ জুলাই সাংবাদিকতার অনন্য পথিকৃৎ চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের জন্মবার্ষিকীতে প্রথম বারের মতো স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠিত হয়। ‘গণমাধ্যম ও চট্টগ্রাম : ক্রান্তিকালের সম্ভাবনা’ শীষর্ক স্মারক বক্তৃতা দেন সাংবাদিক , প্রাবন্ধিক ও কবি আবুল মোমেন। ২০১২ সালে ‘সাংবাদিকতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং সমকালীন চালচিত্র’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতা রাখেন সাংবাদিক , সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী। ২০১৩ সালে ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উদ্ভবের পটভূমি’ শীর্ষক স্মারক বক্তব্য প্রদান করেন বাংলা একাডেমি মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান।
No comments:
Post a Comment