জাতীয় গ্রিডের সমস্যার কারণে বিদ্যুৎ
বিপর্যয়ে সবচেয়ে বিপদে পড়েছে হাসপাতালের রোগীরা। শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকা
এক বছরের ছেলে জেবল হাসানকে নিয়ে আজ শনিবার দুপুরে ফটিকছড়ি থেকে
চট্টগ্রাম নগরে আসেন শাহনাজ বেগম। বেলা দুইটায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল
কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু সকাল থেকে বিদ্যুৎ না থাকায়
শিশুটিকে নেবুলাইজ করা যাচ্ছিল না। পরে বিকেল পাঁচটার দিকে ওয়ার্ড
মাস্টারের কার্যালয়ে নিয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে তাকে নেবুলাইজ করা হয়। আজ
জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের পর বিদ্যুৎ না থাকায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ
হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে এভাবে রোগীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। জেনারেটরের
সাহায্যে সীমিত আকারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও সার্বিকভাবে চিকিৎসা
কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির সংকট দেখা দেয়। এতে
দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়ে ওয়ার্ডের শৌচাগারগুলো। বিদ্যুৎবিভ্রাটের কারণে
হাসপাতালের মতো নগরের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কার্যালয় ও পেট্রলপাম্পে
স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়। ব্যাহত হয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন।
বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথে টাকা লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়।

হাসপাতালের চিত্র
জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের পর চমেক হাসপাতালে বিদ্যুৎ চলে যায়। এর পর হাসপাতালের জেনারেটরের সাহায্যে সীমিত আকারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এ সময় বিভিন্ন ওয়ার্ডের দু-একটি বৈদ্যুতিক বাতি ছাড়া পাখা, শীতাতপনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বন্ধ থাকে। এমনকি নেবুলাইজার মেশিন চালানোর সকেটও বন্ধ রাখা হয়। বিকেল চারটায় হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টের রোগীদের নেবুলাইজ করা হচ্ছে পাশের ওয়ার্ড মাস্টারের কার্যালয়ে নিয়ে। সেখানে জেনারেটরের মাধ্যমে নেবুলাইজার মেশিন চালানোর সকেট চালু রাখা হয়।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহিদুল গনি বিকেল পাঁচটার দিকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকায় আমরা জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছি। মোটামুটিভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। অস্ত্রোপচার কক্ষ, সিসিইউ, আইসিইউ চলছে। ওয়ার্ডে লাইট জ্বলছে।’ তিনি বলেন, ‘কিছু সমস্যা তো থাকবেই। তবে আমরা তেল মজুত করে রেখেছি, যাতে বিদ্যুৎ না এলেও চালানো যায়।’
হাসপাতালের অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, গরমে রোগীদের কাহিল অবস্থা। তাদের বাতাস করছে স্বজনেরা। ওয়ার্ডে দু-একটি বৈদ্যুতিক বাতি জ্বললেও আলো পর্যাপ্ত নয়। রওশন বেগম নামে রোগীর এক স্বজন বলেন, ‘বিদ্যুৎ যাওয়ার পর হাসপাতালের বাথরুমে পানি বন্ধ হয়ে যায়। এর পর ময়লায় তা একাকার হয়ে পড়েছে।’ বিদ্যুৎ না থাকায় হাসপাতালে পানিসংকট দেখা দেয়। জরুরি ছাড়া সাধারণ অস্ত্রোপচার বন্ধ রাখা হয়।
ব্যাঘাত ঘটেনি বন্দরের কার্যক্রমে
বন্দর সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল ছিল। বন্দরের নিজস্ব জেনারেটরের মাধ্যমে চার-পাঁচ দিন টানা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব। বিপর্যয়ের পর সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় রাজস্ব বোর্ড থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেওয়া হয়, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে সন্ধ্যা সাতটায় কাস্টমের সার্ভার বন্ধ করে দেওয়া হবে। তবে সাতটার আগে বন্দর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়। ফলে বন্দরের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটেনি। এদিকে বিদ্যুতের অভাবে নগরের অনেক ফিলিং স্টেশনও বন্ধ হয়ে যায়। বড় ফিলিং স্টেশনগুলোতে জেনারেটর দিয়ে তেল বিক্রি করা হলেও অনেক স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
একই কারণে শিল্প উৎপাদনও ব্যাহত হয়। নগরের নাসিরাবাদ ও কালুরঘাট শিল্প এলাকার বিভিন্ন কারখানায় বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। কিছু কিছু কারখানায় জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন চালু রাখা হয়। একই পরিস্থিতি দেখা গেছে নগরের পোশাক কারখানাগুলোতেও। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. মাহবুবুল আলম বলেন, বিদ্যুৎসংকটের কারণে কিছু কিছু কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। টানা এভাবে বিদ্যুৎ না থাকলে বিকল্প ব্যবস্থায় কারখানা চালু রাখা কষ্টসাধ্য। বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবনও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন বাসাবাড়িতে পানির সমস্যা দেখা দেয়। বিপর্যয়ের পর চট্টগ্রামে প্রথম বিদ্যুৎ সরবরাহ হয় বিকেল পাঁচটা ৪৬ মিনিটে। নাসিরাবাদ, ষোলশহর ও বন্দর এলাকায় পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়।
No comments:
Post a Comment