Thursday, November 6, 2014

চট্টগ্রাম জেলার পর্যটন ও দৃষ্টিনন্দন অঞ্চলের দর্শনীয় স্থান

প্রাকৃতিক শোভায় সুশোভিত চট্রগ্রাম জেলায় রয়েছে বহু দৃষ্টিনন্দন স্থান। এসব স্থান সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু বর্ণনা .....
চট্টগ্রাম গেলে যা যা দেখে আসতে পারেন
সীতাকুণ্ড : চট্টগ্রামের মূল শহরে প্রবেশের আগেই সীতাকুণ্ড। বাসে বসেই দেখা যায় সুন্দর কিছু পাহাড়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এ জায়গাটির গুরুত্ব অনেক। রামায়ণে বর্ণিত কাহিনীর অন্যতম পটভূমি সীতাকুণ্ড। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছেও এ স্থান কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখানে রয়েছে একটি বৌদ্ধমন্দির। বৌদ্ধমন্দিরে গৌতম বৌদ্ধের পায়ের ছাপ রয়েছে। চন্দ্রনাথ মন্দিরটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ সব মানুষের পছন্দের জায়গা। এটি অবস্থিত পাহাড়চূড়ায়। বছরের ফেব্র“য়ারি মাসে সিভা চতুর্দশী উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
বারো আউলিয়ার মাজার : প্রাচীন বাংলায় এ অঞ্চলে ধর্মপ্রচারক হিসেবে আগমন ঘটে বারো ভূঁইয়ার। বারো আউলিয়ার মৃত্যুর পর তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে গড়ে ওঠে বারো আউলিয়া মাজার। মাজারটি রাস্তার পাশেই।
মিলিটারি একাডেমি : বিএমএ বা বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি অবস্থিত ভাটিয়ারিতে। সারাদেশ থেকে আসা নবীন মিলিটারি সদস্যদের এখানেই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
কৈবল্যধাম : চট্টগ্রাম শহরে হিন্দু ধর্মালম্বীদের সবচেয়ে পুরনো ও সুবিশাল তীর্থস্থান হচ্ছে কৈবল্যধাম। এটি পাহাড়তলী এলাকায় অবস্থিত।
রানী রাসমণি বিচ : প্রায় বছর তিনেক ধরে এটি জমে উঠেছে। পর্যটকরা এ স্পটটির কথা এখনও তেমন একটা জানেন না। মূলত স্থানীয় জনগণ এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষজনই এখানে অবকাশযাপন করতে আসে। কর্ণফুলী নদীর তীরে বিশাল এরিয়া নিয়ে গড়ে উঠেছে এটি। এছাড়া এখানে রয়েছে সুন্দর একটি ঝাউবন।
পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত : সমুদ্রপ্রেমীদের কাছে দ্বিতীয় কক্সবাজার হচ্ছে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত। এটি শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে। পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে পৌঁছার আগে চোখে পড়বে আনুমানিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তার দুই পাশে ঝাউগাছের সারি।
জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর : এশিয়া মহাদেশের দুটি জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরের একটি অবস্থিত চট্টগ্রামে। এটি নগরীর আগ্রাবাদে অবস্থিত। নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। এতে সংরক্ষিত রয়েছে বিভিন্ন উপজাতি জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, নানা কৃষ্টি-আচার। আরও রয়েছে ভিনদেশী সংস্কৃতির কিছু নমুনা।
ইকোপার্ক : সীতাকুণ্ড থানার চন্দ্রনাথ পাহাড়ে অবস্থিত ইকোপার্ক। ৯৯৬ একরের এ উঁচু-নিচু পাহাড়ে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ এবং নানা ধরনের পশুপাখি।
ফয়স লেক : বন্দরনগরীর অন্যতম আকর্ষণ ফয়’স লেক। তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনামলে রেলকর্মীদের পানির চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে এলাকাটি। কেউ কেউ এটিকে প্রাকৃতিক লেক ভেবে ভুল করে। আসলে এটি কৃত্রিম লেক। স্থাপিত হয়েছে ১৯২৭ সালে। পানির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কালক্রমে এটি হয়ে ওঠে বিনোদনকেন্দ্র। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে গেছে নাতিদীর্ঘ লেক, লেকের এপারে-ওপারে সৌন্দর্য নিয়ে গর্বিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড় এ দৃশ্য সহজেই মুগ্ধ করার মতো।
ফয়স লেকের মূল প্রবেশ গেটের বিপরীত দিকেই রয়েছে ইউএসটিসি তথা ইউনিভার্সিটি অব সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, চুয়েট ইঞ্জিনিয়ার ইউনিভার্সিটি। এগুলো ফেলে জাকির হোসেন রোড ধরে মিনিট দুয়েক হাঁটলেই চট্টগ্রাম টেলিভিশন ভবন। ওই তিনটি প্রতিষ্ঠানই গড়ে উঠেছে পাহাড়ের ওপর যা  নজরকাড়ার মতো।
এগুলো হাতের ডানদিকে। সিটিভি ছাড়িয়ে সামান্য একটু এগোলেই একাত্তরের বৃহৎ বধ্যভূমি। বধ্যভূমি বর্তমানে বাউন্ডারি করা রয়েছে। বধ্যভূমির পরই ওয়ারলেস নামক একটি জায়গা। এখানে রয়েছে ভেটেরিনারি ইউনিভার্সিটি, সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত হাঁস-মুরগির খামার। এগুলো ছাড়িয়ে একটু দূরেই বিএডিসি তথা বাংলাদেশ এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন। মিনিট দশেক হাঁটার পর চোখে পড়বে নয়নাভিরাম পাহাড়শ্রেণী। এটা ফয়’স লেকের বাউন্ডারি করা পাহাড়েরই অবশিষ্ট অংশ। পার্থক্য হচ্ছে, এখানে উঠতে টিকিট কাটতে হবে না! স্থানীয় জনগণের আন্তরিকতাও মুগ্ধ করবে। একটু সামনে পাহাড়তলী ডিগ্রি কলেজ। সম্পূর্ণ কলেজ এবং সুবিশাল ক্যাম্পাস সবই পাহাড়ে। ঝাউতলা থেকে রিকশায় ১০ টাকা ভাড়া পাহাড়তলী পোস্ট অফিস এবং রেলওয়ে স্কুল। এগুলোর সামনেই প্রীতিলতা মনুমেন্ট। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্রগণ্য সৈনিক মাস্টারদা সূর্যসেনের সহকর্মী বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।
এখানে, ইউরোপীয়ান ক্লাবে অবস্থিত অস্ত্রাগার লুণ্ঠন শেষে ধরা পড়ে যান বীরকন্যা প্রীতিলতা। একটি সরু নালায় পা হড়কে পড়ে যান প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। তারপর ধরা পড়েন ব্রিটিশদের হাতে। কালের সাক্ষী হিসেবে সেই নালাটি আজও টিকে আছে। তার পাশেই আছে রেলওয়ে জাদুঘর। এটি পাহাড়ের ওপর একটি বাংলোয় অবস্থিত। এ জাদুঘরে ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে রেলওয়ে তথা রেলগাড়ির দীর্ঘ ইতিহাস।
শহীদ জিয়া জাদুঘর : এমএ আজিজ স্টেডিয়ামের বিপরীত দিকে একটি শিশুপার্ক। শিশুপার্ক ছাড়িয়ে লালখান বাজার যাওয়ার পথ ধরে সামান্য হাঁটলেই রাস্তার ডানদিকে শহীদ জিয়া জাদুঘর। টিকিট কেটে জাদুঘরে ঢুকতে হয়। সার্কিট হাউসের যে ঘরটিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হন। সেই ঘরের স্মৃতিচিহ্নসহ জিয়াউর রহমান ব্যবহƒত নানা জিনিসপত্র এবং তার বেশকিছু দুর্লভ ছবি রয়েছে এখানে। রয়েছে চট্টগ্রাম কালুরঘাটে খালকাটা কর্মসূচিতে নেতৃত্বদানরত অবস্থায় শহীদ জিয়ার একটি ভাস্কর্য।
বাটালি পাহাড় : টাইগার পাস এবং লালখান বাজারের মাঝামাঝি অবস্থান বাটালি পাহাড়ের। বোদ্ধা ব্যক্তিরা বলে থাকেন, চট্টগ্রামের প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে অবশ্যই টাইগার পাস আসতে হবে এবং বাটালি পাহাড়ে উঠতে হবে। বাটালি পাহাড়ে রয়েছে হরেক রকম গাছপালা। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য পাহাড় কেটে সুবিন্যস্তভাবে তৈরি করা সিঁড়ি। বাটালি পাহাড় থেকে পুরো চট্টগ্রাম দেখা যায়। মনে হবে, পাহাড়ের কোলে গা ঘেঁষে ঘুমাচ্ছে চট্টগ্রাম।
চেরাগী পাহাড় : চেরাগী পাহাড় পত্রিকাপাড়া নামেও পরিচিত। এখানে প্রায় সব জাতীয় পত্রিকা, টিভি চ্যানেল, রেডিও চ্যানেল, ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের অফিস রয়েছে। রয়েছে স্থানীয় পত্রিকার অফিসও। চট্টগ্রামের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং প্রাচীন পত্রিকা প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে প্রকাশিত দৈনিক আজাদীর অফিস এখানেই।
তারপরই আন্দরকিল্লা। আন্দরকিল্লায় রয়েছে শাহী মসজিদ, জেএম সেন হলে গেলে দেখতে পাওয়া যাবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পুরোধাপুরুষ মাস্টারদা সূর্যসেনের আবক্ষমূর্তি।
এর একটু দুরেই চকবাজার। যেখানে দুটি দর্শনীয় স্থান হচ্ছে সুপ্রাচীন অলি খাঁ মসজিদ ও নানক গুরুদুয়ার।
লালদীঘি : লালদীঘির ময়দান নানা কারণে মানুষের কাছে বহুল পরিচিত। চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সমাবেশ স্থল এটি। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যে পরিমাণ মানুষ জমায়েত হয় তা বিস্ময়কর। এছাড়া সংগ্রাম-আন্দোলনের অন্যতম, প্রধানতম বললেও ভুল হবে না, সূতিকাগার এটি। ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলী খেলা এখানেই হয়।
ওয়ার সিমেট্টি : নগরীর প্রবর্তক মোড় পেরিয়ে বাদশা মিয়া রোডে এর অবস্থান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের একাংশ এখানে সমাহিত করা হয়েছে। ফুলের বাগান বেষ্টিত মনোরম এ স্থান স্মরণ করিয়ে দেয় সেইসব সৈন্যদের শৌর্যবীর্য ও বীরত্বগাথা। ছোট ছোট সমাধিফলক সারিবদ্ধভাবে সাজানো।
বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার : মাতৃভক্তি এবং ধর্মীয় কারণে স্মরণীয় হয়ে আছেন বায়েজিদ বোস্তামী। মাজার পুকুরে রয়েছে দানবাকৃতির অনেকগুলো কাছিম। জনশ্রতি আছে, কাছিমগুলোর বয়স কয়েক শত বছর। এছাড়াও স্থাপত্যশৈলীর অনুপম নিদর্শন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সিরাজউদ্দৌলা রোডের চন্দনপুরা হামিদিয়া তাজ মসজিদ। প্রায় তিনশ’ বছর আগে নির্মিত এ মসজিদটির সৌন্দর্য এখনও মানুষকে বিমোহিত করে।
পারকি সমুদ্রসৈকত : চট্টগ্রাম শহর থেকে বেশ দূরেই এটির অবস্থান। আনোয়ারা থানায় গড়ে ওঠা এ নয়নজুড়ানো সমুদ্রসৈকত তেমন একটা পরিচিতি পায়নি। সৈকতের পাড় ঘেঁষে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে একটি ঝাউবন। জায়গাটা সবসময় চিকচিক বালিতে ভরে থাকে বলে রসিকজনেরা বলে থাকেন বালুবনে ঝাউবন! সমুদ্রের কথা বাদ দিলেও শুধু ঝাউবনের আকর্ষণে অনেকেই ছুটে যান পারকিতে। সৈকতে সামুদ্রিক কাঁকড়ার অবাধ বিচরণ নির্মল আনন্দদান করে। রয়েছে নোঙ্গর করা জাহাজ সারি।
সন্দ্বীপ : অনেকেই ভুল করে সন্দ্বীপকে নোয়াখালী জেলার অংশ ভাবেন। আসলে এটা চট্টগ্রামেরই একটি থানা। যদিও ভাষা কৃষ্টি সংস্কৃতি অনেকটা নোয়াখালীর মতোই। জলবেষ্টিত এ সুন্দর দ্বীপের আয়তন খুব একটা বেশি নয়, তুলনামূলক জনসংখ্যাও কম। দুইভাবেই সন্দ্বীপ যাওয়া যায়।
বিপ্লব উদ্যান : ষোলশহর দুই নম্বর গেটের আকারে ছোট কিন্তু ছিমছাম পার্ক বিপ্লব উদ্যানের অবস্থান। এটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয় বিকাল চারটার পর। নগরবাসীর এবং পর্যটকদের একটুখানি নিঃশ্বাস ফেলার এবং নেয়ার বিশ্বস্ত জায়গা এটি। ফুলবাগান, কয়েক ধরনের গাছের পাশাপাশি প্রধানতম আকর্ষণ স্বাধীনতা ভাস্কর্য।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস : সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান। শিক্ষার কথা বাদ দিলে সৌন্দর্যের দিক দিয়ে এটি অদ্বিতীয়। এ সৌন্দর্যের তুলনা নেই। নৈসর্গিক সৌন্দর্যমণ্ডিত পাহাড়ের উপরে স্থাপিত এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় চারদিকেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ছোট-বড় অসংখ্য পাহাড়। পাহাড় কেটে কেটে যে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে তা যে কাউকেই মুগ্ধ করবে। দুইপাশে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা যমজ পাহাড়, মাঝখানে পাহাড়ের বুক চিরে চলে গেছে সরু রাস্তা। মনোমুগ্ধকর দৃশ্যই বটে।
এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এবং আকর্ষণ শাটল ট্রেন। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য চালু করা হয়েছে শাটল ট্রেন ব্যবস্থাটি। একমাত্র চট্টগাম ছাড়া দেশের আর কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শাটল ট্রেনের ব্যবস্থা নেই। এ শাটল ট্রেনের আড্ডা কিংবদন্তির পর্যায়ে চলে গেছে। সুযোগ হলে শাটল ট্রেনে চড়ে বিরল অভিজ্ঞতা অর্জন করা যেতে পারে। অবশ্য অছাত্রদের জন্য শাটল ট্রেনে চড়ার বিধিসম্মত কোন ব্যবস্থা নেই!ঈদের আনন্দ ও খুশির দিনে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরে বেড়াতে চট্টগ্রামে অবস্থিত বিনোদনকেন্দ্র ফয়’স লেক কনকর্ড, সী ওয়ার্ল্ড কনকর্ড ও ফয়’স লেক রিসোর্ট সেজেছে ঈদের সাজে।
অবারিত সবুজের বুক চিড়ে জেগে ওঠা বিস্ময়কর ফয়’স লেক। এই বিশ্বমানের পার্ক ফয়’স লেকে কনকর্ড রিসোর্টস এবং হানিমুন শ্যালে, যা দেশি-বিদেশি পর্যটক ও ভ্রমণপিপাসুদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। চট্টগ্রাম শহরের মাঝে শহরের বৃহত্তম এলাকা জিইসি মোড় থেকে ২ মিনিটের দূরত্বে এবং জাকির হোসেন রোডের পাশেই শহরের প্রাণকেন্দ্রে  হ্রদ-পাহাড় ও স্বচ্ছ পানির সমন্বয়ে ফয়’স লেক।
নান্দনিক স্থাপত্য, সুবিশাল পাহাড় আর লেকের সমন্বয়ে গড়ে তোলা এই পার্কে রয়েছে বিভিন্ন রাইডস; যেমন সার্কাস ট্রেন, ফ্যামিলি কোস্টার, ক্যারাওয়াল ফেরিস হুইল, রেড ড্রাই স্লাইড, ইয়েলো ড্রাই স্লাইড, বাম্পার কার, হ্যাপি ডাম্পস সার্কাস সুইং। নৌ ভ্রমণের জন্য রয়েছে আকর্ষণীয় নৌকা, প্যাডেল বোট ও ইলেকট্রিক মোটর বোট। পাহাড়ের বনাঞ্চলে ট্রাকিংয়ের জন্য রয়েছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও সুউচ্চ টাওয়ার। লাঞ্চ ও ডিনারের জন্য আধুনিক রেস্তোরাঁ ‘লেক ভিউ’। দেশি-বিদেশি খাবার ও ফাস্টফুডের জন্য বিভিন্ন ফুড ফিউস। দেশি-বিদেশি পর্যটকের ভিড়ে মুখর থাকে ফয়’স লেক। বিশেষ দিনগুলোতে কনসার্টের আয়োজন করা হয়। এখানে আপনার জন্য রয়েছে সপরিবারে, একান্তে, সদলবলে, সহকর্মীদের নিয়ে সময় কাটানোর অপূর্ব সুযোগ।
ফয়’স লেক রিসোর্ট
পাহাড়ের গা ঘেঁষে নিরিবিলি পরিবেশে অনুপম নির্মাণশৈলী, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক মান ও সেবার প্রতিশ্রুতি নিয়ে কনকর্ড গড়ে তুলেছে ফয়’স লেক রিসোর্ট। হানিমুন শ্যালে, গোল্ড ও প্লাটিনাম এই তিন ক্যাটিগরির রুম রয়েছে রিসোর্টে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, রিসোর্টে যেতে হবে স্পিডবোটে। রিসোর্ট গেস্টদের লেকে ঘুরে বেড়ানোর জন্য রয়েছে প্যাডেল বোট। রিসোর্টের ব্যালকনি থেকে উপভোগ করা যাবে স্বচ্ছ জলরাশি, সবুজ পাহাড়, ছুটে চলা হরিণ, বুনো খরগোশ, নানা রকম পাখি। রিসোর্ট সংলগ্ন রয়েছে ফ্লোটিং রেস্তোরাঁ, যেখানে বসে সারা যাবে চা-কফির আড্ডা। এখানে আপনার ভ্রমণ ও একান্ত বিশ্রামকে মোহময় করে তোলার জন্য যা যা প্রয়োজন তার সবকিছুই রয়েছে। এ অভিনব রোমাঞ্চকর সুযোগ আবিষ্কারের জন্য আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে এই রিসোর্ট, যেখানে পাখপাখালির ডাকে আপনার ঘুম ভাঙবে, স্বচ্ছ পানি, নিবিড় বনের আচ্ছাদনে একাকী দাঁড়ানো নিঃসঙ্গ পাহাড়ের বিচিত্র দিক দৃশ্যাবলি অনাবিল রোমাঞ্চের মোহ।
সী ওয়ার্ল্ড কনকর্ড
আধুনিক স্থাপত্যশৈলী,পাহাড় ও হ্রদের অপরূপ সৌন্দর্যে বিনোদনের নানা আয়োজনে ভরপুর দেশের সর্ববৃহত্ ওয়াটার পার্ক সী ওয়ার্ল্ড কনকর্ড। দর্শনার্থীদের বিনোদনের কথা লক্ষ করে কনকর্ড এন্টারটেইনমেন্ট কো. লি. মজাদার সব রাইড নিয়ে গড়ে তুলেছে সী ওয়ার্ল্ড। বিনোদনপিপাসু দর্শনার্থীদের জন্য এসব পানিভিত্তিক রাইড অত্যন্ত রোমাঞ্চকর আর চমকে পরিপূর্ণ। পানির সঙ্গে হরেক রকম উত্তেজনাকর এই রাইড সবই আধুনিক বিশ্বমানের আদলে গড়া।  ফয়’স লেকের স্বচ্ছ জলরাশির বুক চিড়ে মোটর বোটে ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিলেই সী ওয়ার্ল্ডে দেখা মিলবে দারুণ রোমাঞ্চকর, মনোমুগ্ধকর নানা আয়োজন।
সী ওয়ার্ল্ডের রাইডসের মধ্যে রয়েছে ওয়েভপুল, স্লাইড ওয়ার্ল্ড, ফ্যামিলিপুল, টিউব স্লাইডস, মাল্টি স্লাইডস, ওয়াটার ফল, ডোম স্লাইডস ও প্লে-জোন ও ড্যান্সিং জোন। দর্শনার্থীরা এখানে পাবেন সাগরের বিশাল ঢেউয়ের হাতছানি। সাগরের মতোই কৃত্রিমভাবে ঢেউ আছড়ে পড়ে। ওয়েভপুলের ঢেউ আর গানের তালে মেতে ওঠে তরুণ-তরুণীরা। পার্কের দ্বিতীয় আকর্ষণীয় রাইড হচ্ছে ড্যান্সিং জোন। এখানে কৃত্রিম বৃষ্টির পানিতে ভিজে ও গানের সঙ্গে নেচে নির্মল আনন্দ পান পর্যটকরা। দিনভর পানিমেলায় মেতে থাকার সব আয়োজন রয়েছে ওয়াটার পার্কে। ফয়’স লেক ও পাহাড়ের গা ঘেঁষে করা সী ওয়ার্ল্ডের সৌন্দর্য মুগ্ধ করে সবাইকে।
প্রতিদিন এই পার্কটি দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকবে সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। আর যে কোনো ছুটির  দিন খোলা থাকবে সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। এখানে সব ধরনের সুব্যবস্থা আছে। যেমন মহিলা ও পুরুষের জন্য আলাদা চেঞ্জ রুম, আলাদা লকারের ব্যবস্থা, অতিরিক্ত কাপড়, তোয়ালে ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থা। এছাড়াও এখানে রয়েছে বিশ্বমানের সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা, যা ভ্রমণার্থীদের দেবে জিভে পানি আনা স্বাদ। যোগাযোগ : ৮৮৩৩৭৮৬, ৯৮৯৬৪৮২, ৭৭০৭৯৪৬-৪৯, ০১৯১৩-৫৩১৩৮০, ০১৯১৩-৫৩১৪১৯, ০১৯১৩-৫৩১৩৮১। জাতির বৈচিত্র্যময় নিদর্শন নিয়ে এশিয়া মহাদেশে জাতিতত্ত্ব বিষয়ক যে ক’টি জাদুঘর রয়েছে তার মধ্যে চট্টগ্রাম জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরটিই সামগ্রিকভাবে উল্লেখযোগ্য। আমাদের দেশের আবহাওয়া ও ভূপ্রকৃতির বৈচিত্র্যময় পার্বত্য এলাকায় সুদূর অতীতকাল থেকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, আদিবাসী ও মৌলগোষ্ঠীর বিশেষ একটি অংশ নিভৃত জীবনযাপন করে আসছে। তাদের মধ্যে অনেকে আজও নিজ নিজ ঐতিহ্যগত জীবনধারা অব্যাহত রেখেছে। দেশের মূল ভূখণ্ডের অধিবাসীদের জীবনধারার সঙ্গে এর যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু দিন যতই অতিবাহিত হচ্ছে সভ্যতার পরিধি ততই দ্রুততার সঙ্গে সম্প্রসারিত হচ্ছে। তারা আরও আধুনিক হচ্ছে। এর সঙ্গে সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী বৈচিত্র্যময় জীবনধারার অনেক ঐতিহ্যই এখন বিলীনের পথে। তেমনি মূল ভূখণ্ডে বসবাসকারী বাংলাভাষী বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মানুষগুলো সেসব বৈচিত্র্যময় জীবনধারার অধিকারী প্রতিবেশীদের ঐতিহ্য সম্পর্কে পুরোপুরিভাবে জানে না। অথচ তারাও এই দেশের জাতীয়তার একটি বিশেষ অংশ। ফলে স্বাভাবিকই বিচিত্র এ জীবনধারা সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রত্যেকেরই সৃষ্টি হয়। এই দেশে বসবাসরত সেসব জনগোষ্ঠী, আদিবাসী ও মৌলগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক পরিচিতি ও সম্প্রীতি নিবিড় করে তোলার উদ্দেশ্য নিয়েই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু তুলনামূলকভাবে এর পরিধির সম্প্রসারণ না হলেও সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আরও আধুনিকায়ন ও পরিধি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। নান্দনিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশে আগ্রাবাদের বাণিজ্যিক এলাকায় স্থাপিত হয়েছে জাতিতত্ত্ব বিষয়ক এ জাদুঘরটি। জ্ঞান-বিজ্ঞানের আধুনিক জীবনব্যবস্থা জাগরণের সঙ্গে সঙ্গে এই পরিবর্তনের চাকা ক্রমেই দ্রুততর গতি লাভ করছে। ফলে আজকের অধিকাংশ জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে উল্লিখিত বহু লোকায়ত বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরটি তা সংরক্ষণে যথাযথ ভূমিকা রেখে আসছে। জাদুঘরের প্রদর্শনীতে এমন সব নিদর্শন স্থান লাভ করেছে যেগুলো সংশ্লিষ্ট জাতি, জনগোষ্ঠী, আদিবাসী ও মৌলগোষ্ঠীগুলোর একটা সামগ্রিক পরিচিতির প্রতিনিধিত্ব বহন করে। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে এখানে রয়েছে মানচিত্র, আলোকচিত্র, মডেল, কৃত্রিম পরিবেশ, দেয়ালচিত্র, সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ফলক ইত্যাদি। জাদুঘরে শুধু দেশি-বিদেশি দর্শকদের জ্ঞানানুসন্ধানের আকাক্সক্ষাই পূর্ণ করে না, সব শ্রেণীর দর্শনার্থীদের বিপুল আনন্দেরও খোরাক জোগায়। এছাড়া আয়তনের বিচারেও এই প্রতিষ্ঠানটি এশিয়া মহাদেশে অবস্থিত এ ধরনের জাদুঘরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থানের দাবিদার। জাদুঘরের প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময় জীবন বৈশিষ্ট্য। বিভিন্ন আদিবাসীর জীবনপ্রণালী সংক্রান্ত প্রদর্শনীতে রয়েছে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, খুমি, চাক, তঞ্চঙ্গ্যা, রাখাইন, লুসাই, পাংখো, মনিপুরী, খাসিয়া, বোনা, পাওন, গারো, হাজং, দালু, কোচ, সাঁওতাল, ওরাং, রাজবংশী, বাগদি ইত্যাদি আদিবাসী।
প্রদর্শিত হচ্ছে যা : জাদুঘরের প্রদর্শনীতে এ যাবৎ দেশ-বিদেশের মোট একটি জাতি, বারটি জনগোষ্ঠী এবং ছাব্বিশটি মৌলগোষ্ঠী ও আদিবাসীর বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রার বিবিধ বৈশিষ্ট্য স্থান পেয়েছে জাদুঘরে। এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দৈহিক গড়ন, প্রাকৃতিক পরিবেশ, ঘরোয়া জীবন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্য, উৎসব, নাচগান, অলংকার, ধর্মীয় কার্যাবলী, শিকার, হস্তশিল্প ইত্যাদি অন্যতম। ফলে জাদুঘরটি পরিদর্শনের মাধ্যমে বর্তমানে দেশি-বিদেশি দর্শক বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের জাতিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে একটি ধারণা অর্জন করতে পারে। যেসব জাতি, জনগোষ্ঠী, মৌলগোষ্ঠী ও আদিবাসী জাদুঘরে স্থান লাভ করেছে, বাংলাদেশের পার্বত্য জেলাগুলো (বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম) এবং চট্টগ্রামের উত্তর ও পূর্বাংশ চাকমা (চাঙমা), মারমা (মগ), ত্রিপুরা (টিপরা), কক্সবাজার ও পটুয়াখালী পার্বত্য জেলার রাইখান (রাখাইন), মৌলগোষ্ঠী ও আদিবাসী চাক (শাক), তঞ্চঙ্গ্যা (টংচঙ্গা বা দৈনাক), মুরং (ম্রো), লুসাই মিজো), পাঙ্খো (পাংখো), বম (বনযোগী), খ্যাং (খিয়াং), খুমি (কুমি); ঢাকা বিভাগের উত্তরাংশের জনগোষ্ঠী গারো, মৌলগোষ্ঠী ও আদিবাসী হাজং, কোচ, দালু, মান্দাই; উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনগোষ্ঠী মনিপুরি, খাসিয়া জনগোষ্ঠী ও আদিবাসী বোনা, কুকী; পশ্চিমাঞ্চল (রাজশাহী বিভাগ)-এর মৌলগোষ্ঠী ও আদিবাসীদের মধ্যে সাঁওতাল, বাবুবলী, রাজবংশী, ওঁরাও, পলিয়া। পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের জনগোষ্ঠী পাঠান, সিন্ধুর সিন্ধি, পাঞ্জাবের পাঞ্জাবি। আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্ত অঞ্চল (কাফিরিস্তান)-এর কাফি, সোয়াত-এর সোয়াত। ভারত অরুণাচল, মধ্যপ্রদেশ-এর আদি, ফুত্তয়া, মুরিয়া, মিজোরাম-এর মিজো। রাশিয়া কিরগিজ অঞ্চলের কিরগিজ এবং অস্ট্রেলিয়া প্রত্যন্ত অঞ্চলের মৌলগোষ্ঠী ও আদিবাসী অস্ট্রাল উল্লেখযোগ্য।
পার্বত্য জেলাগুলোর ভিন্নতর অস্তিত্ব ও অঞ্চলের নানা ধরনের বৈচিত্র্যময় মানুষ বসবাস করে আসছে, এদের মধ্যে নিুোক্ত জনগোষ্ঠী ও মৌলগোষ্ঠী প্রধান। জাদুঘরে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি পার্বত্যজেলাগুলোর ব্যবহত আচার-অনুষ্ঠান ও উৎপন্ন দ্রব্যাদির মধ্যে দেখা যায় চাকমাদের মাচাংঘর (বাঁশের উঁচু খুুঁটির উপর প্রতিষ্ঠিত মাচার উপর বাঁশের বেড়া ও খড়ের চালা দিয়ে আচ্ছাদিত ঘর) বানিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় বা ঢালে দলবদ্ধভাবে বসবাস করে। দ্রব্যাদির মধ্যে দেখা যায় : বড়গি (ঘুমানোর সময় গায়ে দেয়ার চাদর), বিচন কাপড় (বিছানার চাদর), হেংগর (বাঁশের বাঁশি), মাখলা (মাথাল), কুরুম (ছোটঝুড়ি), সাগা (জমির অধিকার চিহ্ন), কুল (ডালা), দুদুক (বাদ্যযন্ত্র), হেনী (বাঁশি), ছেন্দা (বেহালা), চামপ্রং (সারিন্দা), সেরি (মাপনী), বাল্লা (বাঁশি), ফি (বর্শা), কুরুল (কুঠার), আগল (দা), ওয়াইতি (জঙ্গল পরিষ্কার করার কাজে ব্যবহƒত দা), হাইতি (দোল), ওগই (বড় হামানদিস্তা), মেঝাং (বেতের তৈরি খাবার ছোট টেবিল) ইত্যাদি। পৃথিবীর খ্যাত ও অখ্যাত অসংখ্য জাতি, জনগোষ্ঠী, আদিবাসী ও মৌলগোষ্ঠীর নানান বৈচিত্র্যময় নিদর্শনে ভরপুর জাদুঘরটি চার দশক পেরিয়ে আসলেও আরও অধিকতর আদিবাসীদের নিদর্শনাদি সংগ্রহের জন্য প্রচেষ্টা চালাতে পারে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। কম্পিউটারসহ আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে জাদুঘরের উপকরণগুলোকে দেশের মানুষের কাছে উপস্থাপন করা যায়। আজ থেকে তিন যুগ আগের সেই সংগৃহীত নিদর্শনাদি নিয়ে আধুনিক মিউজিয়ামের সঙ্গে পাল্লা দেয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে, মোটামুটি দৃষ্টিনন্দন হতে পারে তার জন্য জাদুঘরের নিয়মিত পরিচর্যা করা উচিত। জাদুঘরটি সম্পূর্ণভাবে পিডিবির বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল, বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকলে দর্শকদের জাদুঘর পরিদর্শনে বিঘœ ঘটে। জেনারেটরের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক বিদ্যুতের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে কর্তৃপক্ষ। জাদুঘরে প্রতিদিনই সমাগম ঘটে শত শত দর্শনার্থীর। নাগরিক কোলাহলের বিমর্ষতা ছেদ করে প্রিয়জনদের নিয়ে ছুটে আসে এই জাদুঘরে; নিঃশ্বাস ফেলে স্বস্তির, উপলব্ধি ও দেখে নেয় আদিবাসী ও নানান জনগোষ্ঠীর অজানা জীবনবৈচিত্র্য। ওই সব জাতিগোষ্ঠীর দৈহিক গড়ন, ভাষা, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যাভ্যাস, ধর্ম, রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান, বিশ্বাস ও জীবনযাত্রার ধরন সম্পর্কে জানা যায় প্রদর্শনীর মাধ্যমে। কিছু কিছু সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর উদ্ভব, বিকাশ এবং পারস্পরিক জ্ঞাতিত্বের বিষয়ে একটি রূপরেখা নির্ণয় করতে পারবেন দর্শনার্থীরা। বিচিত্র জাতির এ বৈচিত্র্যময় জীবনব্যবস্থা সহজেই আকর্ষণীয়। নৃতত্ত্ব শাস্ত্রের সাংস্কৃতিক বিভিন্ন শাখা নিয়ে জাদুঘরে নিয়মিত প্রদর্শনীর ব্যবস্থা যা সব শ্রেণীর দর্শকের কাছে একটি বিশেষ বিষয়কে সহজবোধ্য এবং উপভোগ্য করে তোলে। এক তলাবিশিষ্ট এবং দক্ষিণমুখী এই জাদুঘরে বর্তমানে একটি কেন্দ্রীয় হলঘরসহ মোট চারটি গ্যালারি রয়েছে। প্রতিটি গ্যালারিতে দুটি করে জাদুঘরে মোট এগারটি কক্ষ রয়েছে। ভবনের সম্মুখভাগের মধ্যবর্তী স্থানে পাশাপাশি রয়েছে দুটি ফটক। জাদুঘরে প্রবেশ করার উদ্দেশ্যে বাম দিকের ফটকটি অতিক্রম করলে প্রথমেই পড়বে বুকিং কাউন্টার। জাদুঘরে টিকিটের হার ১০ টাকা। চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রকাশিত বিভিন্ন প্রকাশনা, জাদুঘরের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অধিবাসী, জনগোষ্ঠী ও মৌলগোষ্ঠীর অবস্থান সম্পর্কে মানচিত্রের নির্দেশনা দেখতে পাওয়া যায়। এরপর বুকিং কাউন্টার ছেড়ে সোজা উত্তর দিকে অগ্রসর হলে বাম দিকের প্রথম দরজা দিয়ে ১ নং গ্যালারিতে প্রবেশ করা যায়। সর্বপ্রথম গ্যালারি এক-এর ‘ক’ কক্ষে দেখা যায় পৃথিবীর কয়েকটি দেশের কিছুসংখ্যক জনগোষ্ঠী ও বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর লোকায়ত জীবনব্যবস্থার প্রতিনিধিত্বকারী দ্রব্যাদি ও মডেল। যাতে রয়েছে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়াসহ প্রভৃতি দেশের কয়েকটি জনগোষ্ঠীসহ মৌলগোষ্ঠীর স্বল্পসংখ্যক জাতিতাত্ত্বিক নিদর্শন। এছাড়া জার্মান প্রাচীরের কিছু ধ্বংসাবশেষ, এক এর ‘খ’ কক্ষটিতে পাকিস্তানে বসবাসকারী পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পাঠান, সোয়াতিগণের জীবনব্যবস্থার ধরন ও নিদর্শনাদি রয়েছে। গ্যালারি দুই-এর সম্মুখ ভাগের দুই ‘ক’ কক্ষটিতে গেলেই দেখতে পাবেন দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বসবাসকারী মনিপুরী, খাসিয়া ও পাঙনদের পরিচিতি। ‘খ’ কক্ষটিতে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে বসবাসকারী গারো, সাঁওতাল, রাজবংশী, ওঁরাও, ৩ নং কক্ষে রয়েছে ম্রো, ত্রিপুরা, খ্যাং, বম, চাক, পাংখোদের জীবনব্যবস্থা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ।
চার নং কক্ষের দক্ষিণ দেয়ালের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত কক্ষে রয়েছে মারমা, চাক ও চাকমা জীবনব্যবস্থার বিভিন্ন দিক, রয়েছে টেবিল আকৃতির আধার ও দুটি মাচাংঘর। কেন্দ্রীয় কক্ষের আধারগুলোতে প্রধানত দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, মৌলগোষ্ঠী ও অধিবাসীদের অলংকারাদি। উত্তর দেয়ালে রয়েছে আকর্ষণীয় ডায়োরমার সাহায্যে প্রাকৃতিক ও গৃহ পরিবেশের সান্নিধ্যে মুরং গো-হত্যা উৎসবের মডেল। এছাড়াও দেয়ালের উপরাংশে সারিবদ্ধভাবে ইতালির শিল্পী ভি. ক্যারলি চিত্রাঙ্কনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও তৎকালীন পাকিস্তানের বিভিন্ন মৌলগোষ্ঠী ও জনগোষ্ঠী দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন দৃশ্য।
ঊনবিংশ শতকের ষাটের দশকের গোড়ার দিকে জাদুঘর ভবনের প্রথম পর্বের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ওই সময় ভবনটির মধ্যবর্তী স্থানে দক্ষিণ দিক হতে প্রবেশযোগ্য ও উত্তর-দক্ষিণে লম্বা একটি হলঘর এবং এর পশ্চিম ও পূর্বাংশের প্রতিটি দিকে পাশাপাশি দুটি করে হলঘরমুখী মোট চারটি গ্যালারি নির্মিত হয়েছিল। দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের গ্যালারিটি ‘১’, উত্তর-পশ্চিমাংশের গ্যালারিটি ‘২’, উত্তর-পূর্বের গ্যালারিটি ‘৩’ এবং দক্ষিণ-পূর্বের গ্যালারিটি ‘৪’ সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত হতো। উল্লেখ্য, প্রতিটি গ্যালারিতে তখন মাত্র একটি করে কক্ষ ছিল। এই কক্ষগুলোর পরিচিতি যথাক্রমে ১ক, ২ক, ৩ক এবং ৪ক। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৭ সালে প্রথম জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর সম্প্র্রসারণের পদক্ষেপ নেয়া হলে কক্ষ ১খ, ২খ, ৩খ ও ৪খ (অর্থাৎ আরও চারটি নতুন কক্ষ) নির্মিত হয়। ১৯৮৫-৯০ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাধীনে পূর্বাংশের গ্যালারি দুটির (৩ ও ৪) প্রতিটিতে আরও একটি করে মোট দুটি কক্ষ (৩গ ও ৪গ) নির্মিত হয়। আরও দুটি কক্ষ নির্মাণ সমাপ্ত হলে জাদুঘরে পূর্ণাঙ্গতা পাবে। নব্বই দশকের শুরু থেকে জাদুঘরের প্রদর্শনী ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন শুরু হতে থাকে। ফলে কক্ষ ১ক এর কয়েকটি প্রদর্শনীতে নতুন কয়েকটি দেশের কিছু জনগোষ্ঠী ও মৌলগোষ্ঠীর বাংলাভাষীর প্রতিনিধিত্বকারী কিছু লোকায়ত নিদর্শন প্রদর্শনী শুরু হয়। তবে লক্ষণীয়, জাদুঘর ভবনটির নির্মাণকাজ আজও সম্পূর্ণরূপে সমাপ্ত হয়নি। ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জাতি, জনগোষ্ঠী, মৌলগোষ্ঠী ও আদিবাসীদের জীবনধারণের বিভিন্ন দিক প্রদর্শন করার সংস্থান করে জাদুঘরটিকে আরও তাৎপর্যময় করা তোলা প্রয়োজন।
নৃতত্ত্ববিষয়ক এ জাদুঘরটি যথাযথ পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনা আরও সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন। তথ্য-প্রযুক্তির নানা বিভাগে অন্তর্ভুক্ত হওয়াও প্রয়োজন। যা সংরক্ষণ ও উপস্থাপনে আরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। জাদুঘরটির অবস্থান চট্টগ্রাম শহরের বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদে হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই সহজ।
চট্টগ্রাম রেল বাস স্টেশন, বিমানবন্দর বা স্টেশন থেকে যে কোনও পরিবহনে অল্প সময়ে পরিদর্শনের জন্য আসা যায় জাদুঘরে।
নগর জীবনের ক্লান্তিকর এক ঘেঁয়েমি থেকে নগরবাসীকে একটু বিনোদনের ছোঁয়া দিতেফয়’স লেকের পাশে সবুজে ঘেরা বনবীথির আবেষ্টনীতে ১৯৮৯ সালে তৈরি করা হয়চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা। ৬ একর জায়গার উপর বানর, সিংহ, হরিণ ও হনুমান এই চারপ্রজাতির ১৬টি প্রাণী নিয়ে যাত্রা শুরু হয় এর।বর্তমানে এই চিড়িয়াখানায় ৭২ প্রজাতির মোট ২৮০টি প্রাণী রয়েছে। যার মধ্যে ৩০প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৮ প্রজাতির পাখি ও ৪ প্রজাতির সরীসৃপ। ২০০০ সালেএখানকার প্রাণীর সংখ্যা ছিল ২৫০টি। গত ৭ বছরে মাত্র ৩০টি নতুন প্রাণী যোগহয়েছে। এর মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হচ্ছে প্যারা হরিণ, ধনেশ, তিতির, হনুমানপ্রভৃতি।

No comments:

Post a Comment