Monday, August 3, 2015

লাশ হয়ে ফিরছেন রশিদ by শরিফুল হাসান

আবদুর রশিদ (৪৫)
অনেক অপেক্ষার পর বন্দীশিবির থেকে পরিবারের কাছে ফিরছেন আবদুর রশিদ (৪৫)। তবে লাশ হয়ে। চার মাস আগে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য বাড়ি ছাড়েন তিনি। উপকূলে আটকা ছিলেন আড়াই মাসেরও বেশি সময়। এতদিন অপেক্ষায় ছিল পরিবার। শেষ পর্যন্ত খবর পেয়েছেন লাশ মিলবে।
মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ মাস আগে রশিদসহ প্রায় এক হাজার মানুষ দালালদের মিথ্যা প্রলোভনে মালয়েশিয়াগামী একটি ট্রলারে উঠেছিলেন। কয়েকমাস সাগরে ভাসার পর একদিন দালালরা তাঁদের ফেলে যান। এরপর জেলেদের কাছ থেকে তেল নিয়ে তাঁরা নিজেরাই ট্রলার চালিয়ে লংকাবি উপকূলে যান। মালয়েশিয়ার পুলিশ ১১ মে সেখান থেকে ৭১৬ জন বাংলাদেশিকে আটক করে। এরপর তাঁদের নেওয়া হয় বেলা‌ন্তিক বন্দীশিবিরে। তাঁদেরই একজন ছিলেন আবদুর রশিদ। সেখান থেকে পরিচয় যাচাইয়ের পর অনেকে বাংলাদেশে স্বজনের কাছে ফিরেছেন। কিন্তু ফেরেননি রশিদ।
রশিদের ভাই আবুল কাশেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই ক্যাম্পে থাকা নরসিংদীর আরেক ছেলে এবং রশিদের বন্ধু আল আমিন তাঁদের জানান যে রশিদ ক্যাম্পে মারা গেছেন। আমরা সেই খবর পেয়ে রশিদের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য চিঠি দেই।’
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নরসিংদীর জেলা জনশক্তি ও কর্মসংস্থান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘রশিদের স্ত্রী নাছিমা বেগম তাঁর লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ৭ জুলাই ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করেন। আমরা তা দ্রুত মন্ত্রণালয়ে পাঠাই। সেখান থেকে হাইকমিশনে পাঠানো হয়। এরপর রশিদের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়’।
তবে হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে, রশিদের লাশ ফেরত পাঠানোর খরচ নিয়ে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়। এতে রশিদের মরদেহ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াটি পিছিয়ে যায়। শেষে বেসরকারি সংস্থা কারাম এশিয়া ও মালয়েশিয়ার প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠন ভালোবাসি বাংলাদেশ খরচ দিতে রাজি হয়। দুটি সংস্থাই এশিয়ার অভিবাসীদের জন্য কাজ করে।
কারাম এশিয়ার আঞ্চলিক সমন্বয়ক হারুন অর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বন্দিশিবিরে এভাবে একজন বাংলাদেশির মারা যাওয়া অমানবিক এবং দুঃখজনক। আমরা রশিদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে কেএল ফিউনারিয়াল সার্ভিস নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে তিন হাজার রিঙ্গিত দিয়েছি। এরপর হাইকমিশন ওই মরদেহ দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেয়। আজ সোমবার রাতে বিমান বাংলাদেশের মাধ্যমে তাঁর মরদেহ দেশের উদ্দেশে রওনা হবে’। অর্থাৎ আগামীকাল মঙ্গলবার রশিদের লাশ দেশে পৌঁছাবে।
আবদুর রশিদের মৃত্যুর কারণ এখনো কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। হাইকমিশন এবং পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বন্দীশিবিরের ক্যাম্পে নেওয়ার পর গত ৫ জুন মারা যান রশিদ। তাঁর মৃত্যুর কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে দীর্ঘদিন সাগরে ভেসে থাকা, ঠিকমতো খেতে না পাওয়া এবং দুর্বলতার কারণেই তিনি মারা গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় তাঁর মৃত্যুর কারণ তদন্ত করা হচ্ছে।
মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রথম সচিব (শ্রম) মুশাররত জেবিন প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ তাঁর মৃত্যুর কারণ জানতে ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য পরীক্ষা করেছে। তবে এখনো সেই প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেলে বোঝা যাবে কীভাবে তিনি মারা গেলেন।
আবদুর রশিদের বাবার নাম আফতাবউদ্দিন। বাড়ি নরসিংদী সদরের ভেলানগরে। রশিদের স্ত্রী নাছিমা বেগম। তাঁর তিন ছেলে। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দারিদ্র্যের কারণেই বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন রশিদ। আর দালালরা সেই সুযোগটাই নেয়।
রশিদের বড় ছেলে স্বপন মিয়া আজ দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা শুনেছি বাবার ডায়রিয়া হয়েছিল। কিন্তু বন্দীশিবিরে নাকি ঠিকমতো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। এমনকি স্যালাইনও দেওয়া হয়নি। অসুস্থ অবস্থায়ই আমার বাবা মারা গেছে’।
বাবা কীভাবে মালয়েশিয়া গেলেন, জানতে চাইলে স্বপন মিয়া বলেন, ‘আব্বা কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। এলাকার দালাল জমির হোসেন আব্বাকে লোভ দেখাইয়া মালয়েশিয়া নিয়ে গেছে। ২৭ মার্চ আব্বা ট্রলারে উঠছে। কিন্তু আমরা কিছুই জানতাম না। এক মাস পর জমির এসে বলে তোমার আব্বা মালয়েশিয়া গেছে। আড়াই লাখ টাকা দাও। আমরা প্রমাণ চাইলে সে বলে তোমার আব্বার মোবাইল আমার কাছে। এরপর আমরা আড়াই লাখ টাকা দেই। কিন্তু দালাল আর কোনো খোঁজ দেয় না। দুই মাস পর শুনি আব্বা ক্যাম্পে মারা গেছে। মঙ্গলবার আব্বা লাশ হয়ে ফিরবে আমাদের কাছে’।

No comments:

Post a Comment