Thursday, August 6, 2015

শিশুদের সঙ্গে এসব কী হচ্ছে, প্রশ্ন মুশফিকের by রানা আব্বাস

শিশুটি হয়তো জানে না কে ইনি। হয়তো জানে না সেলফিই বা কী।
তবে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকার কষ্টকর দিনগুলোর মধ্যে
অন্য রকম একটা মুহূর্ত কাটল তার। ছবি: শামসুল হক
সুস্থ থাকলে শিশুটি এ সময় কী করত? হয়তো খেলনা নিয়ে খেলত, ঘরময় ছুটে বেড়াত। কিন্তু ভীষণ অসুস্থ হওয়ায় হাসপাতালের বিছানা আপাতত তার ঠিকানা। পাশে চিন্তিত মুখে মায়ের দীর্ঘ অপেক্ষা। বিষণ্ন এ মুহূর্তে এক টুকরো আনন্দের উপলক্ষ হয়ে হঠাৎই ঢাকা শিশু হাসপাতালের ছয় নম্বর ওয়ার্ডে হাজির মুশফিকুর রহিম; যিনি বহুবার আনন্দের উপলক্ষ এনে দিয়েছেন দেশকে।
শিশুটি মুশফিককে চেনেনি। অতি নিকটজন বাদে দূরের কাউকে চেনার বয়সও তার হয়নি। তবে মুশফিকের হাতের খেলনাটি ঠিকই চিনেছে। যেন ওটার জন্যই অপেক্ষা করছিল এতক্ষণ। খেলনা পেতেই ছোট্ট মুখটায় ঝুলে পড়ল এক টুকরো হাসি। আপ্লুত হলেন মুশফিকও। টেস্ট অধিনায়কে মুখে বিকশিত হলো সেই ট্রেডমার্ক হাসি! হাসপাতালের চিরায়ত ভারী, থমথমে পরিবেশটা মুহূর্তের জন্য হয়ে উঠল অপার্থিব, আনন্দময়। এক্স ক্যাডেটস ফোরামের আয়োজনে সকাল সাড়ে এগোরোটায় ঢাকা শিশু হাসপাতালে শিশুদের খেলনা দেওয়ার এক ব্যতিক্রমী কর্মসূচিতে দেখা মেলে অনিন্দ্য এ সুন্দর দৃশ্যের।
অসুস্থ শিশু, একটি খেলনা পেয়ে কত আনন্দিত! অথচ দেশের এমন কত শিশু প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার। হত্যা করা হচ্ছে নির্মমভাবে। সিলেটের রাজন, খুলনার রাকিব... প্রতিদিনই একের পর এক শিশুর নির্মমতার শিকারের খবর আসছে। কী বীভত্স, বর্বর সব হত্যাকাণ্ড! মানুষ কেন এত হিংস্র হয়? রাজন-রাকিবদের জন্য মনটা কাঁদে মুশফিকের। রাজন হত্যাকাণ্ডের পরই প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ফেসবুকে নিজের অফিশিয়াল পেজে লিখেছিলেন, ‘একটি নিষ্পাপ শিশুকে নির্যাতন করে মেরে ফেলার মতো বড় অপরাধ মনে হয় আর নেই। শিশু নির্যাতনকে না বলুন’।
কদিনের ব্যবধানে আবারও শিশু হত্যা। পত্রিকা খুললেই কেবল শিশু হত্যার খবর। মনটা যেন বিষাদে ভরে ওঠে মুশফিকের। এ সব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সবার জন্য বিরাট ‘সতর্কবার্তা’ অভিহিত করে অপরাধীদের শাস্তি দাবি করলেন বাংলাদেশ দলের টেস্ট অধিনায়ক, ‘অসুস্থ শিশু একটা খেলনা পেয়ে কী খুশি! এমন শিশুকে হত্যা তো দূর থাক, নির্যাতন করাও বিরাট অপরাধ। আশা করি, সবাই যার যার জায়গা থেকে বিষয়টি উপলব্ধি করবেন। শিশুদের ওপর নির্যাতনের মতো খারাপ কিছু আর হতে পারে না। সংশ্লিষ্টদের এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ থাকবে। এটা খুবই জরুরি। যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ড করতে মানুষ ভয় পায়। শিশুরা দেশের ভবিষ্যতে। তাদের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা আমাদের কর্তব্য।’
বিশ্বের অনেক খেলোয়াড় আছেন, যাঁরা নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সাধারণত পরিচালিত হয় খেলোয়াড়দের নিজ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে। মুশফিকেরও ইচ্ছে আছে এ ধরনের ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার, ‘এটা যথাযথভাবেই করতে চাই। খুব শিগগির জানতে পারবেন। শিশু, তরুণ, প্রবীণ সবার জন্যই কিছু করতে চাই। সমাজে যাদের এমন সামর্থ্য আছে, আশা করি সবাই এগিয়ে আসবেন।’
যারা এ দারুণ উদ্যোগটি নিয়েছে, সেই এক্স ক্যাডেটস ফোরামের সামাজিক দায়বদ্ধতা দলের প্রধান ফিদা হক জানালেন, সারা দেশেই ছড়িয়ে দিতে চান এ কর্মসূচি। নিজেদের কর্মপ্রক্রিয়া সম্পর্কে ফিদা ব্যাখ্যা দিলেন এভাবে, ‘সারা দেশেই আমরা এটা করছি। বাচ্চাদের অনেক খেলনা কিনে দিয়েছেন, যেগুলো এখন অব্যাহত। রাখার জায়গা নেই বাসায়। সেগুলো সংগ্রহ করে শিশুদের দিতে চাই। ঢাকা শিশু হাসপাতালে ৬০০ শিশুকে আমরা খেলনা দিচ্ছি। তা-ই নয়, দেশের অনেক সুবিধাবঞ্চিত, অসুস্থ শিশুদের মুখে একটু হাসি ফোটাতে আমরা খেলনা দিচ্ছি। এরই মধ্যে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কয়েকটি স্কুলেও দেওয়া হয়েছে। ঢাকার বাইরেও দেওয়া হবে।’
মুশফিকের উপহার পেয়ে যারপরনাই খুশি শিশুরা। শিশুদের মুখের এ হাসিটা দেখা যে ভীষণ আনন্দের, তা কী বুঝবে হিংস্র শ্বাপদতুল্য মানুষগুলো; যারা রাজন-রাকিবদের জীবন কেড়ে নেয় নির্মমভাবে!

No comments:

Post a Comment