Monday, August 10, 2015

উন্নয়নবঞ্চিত শত বছরের আদিবাসী গ্রাম by হরি কিশোর চাকমা

আজ ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য আদিবাসীদের উন্নয়ন নিশ্চিত করা। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে দিবসটি উৎসবের আমেজে উদ্যাপিত হচ্ছে। তবে রাঙামাটির বরকল উপজেলার সুবলং ইউনিয়নের কতরখেইয়ে মারমাপাড়ার বাসিন্দাদের মনে সেই আমেজ নেই। নিত্যদিনের বেঁচে থাকার রসদ জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পাড়াবাসীকে। শতবর্ষী এই পাড়ার লোকজন নিরাপদ পানি, যোগাযোগ, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছেন আজও।
পাড়াবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের আয়ের প্রধান উৎস জুমচাষ। তবে জুমচাষ থেকে যে ফসল পাওয়া যায় তা দিয়ে অধিকাংশ পরিবারের বার্ষিক খাবারের সংস্থান হয় না। ফলে লোকজনকে অন্য এলাকায় গিয়ে দিনমজুরি করতে হয়।
থুইচা চিং মারমা (৩৩), সুশান্ত চাকমাসহ (৩৫) পাড়াবাসী জানান, তাঁদের পাড়ায় অর্ধশতাধিক পরিবারের বসবাস। নিরাপদ পানি, চিকিৎসাসেবা কিছুই পান না তাঁরা। এমনকি পাড়ার পাশে অবস্থিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও ২০ বছর আগে স্থানান্তর করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
৪ আগস্ট সরেজমিনে দেখা গেছে, পাড়াটির চারদিকে পাহাড়। মাঝখানে সমতল জায়গায় অর্ধশতাধিক পরিবারের বসবাস। পাড়ার মাঝখান দিয়ে চলে গেছে কতরখেইয়ে ছড়া। ওই পাহাড়ি ছড়াই পাড়াবাসীর একমাত্র পানির উৎস।
পাড়াপ্রধান (কারবারি) মনচ প্রু মারমা জানান, ছড়ায় বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢল নামে। ওই সময় পাড়াটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। পাহাড়ি ঢলের কারণে ছড়া পারাপার করা সম্ভব না। অথচ ছোট একটি সেতু থাকলে সে কষ্ট থেকে বাঁচা যেত। অপর দিকে শুষ্ক মৌসুমে ছড়া শুকিয়ে পানির অভাব দেখা দেয়। তখন ঘোলা-নোংরা পানি পান করে অনেকেই পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হন। পাড়ার ৮ থেকে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। চিকিৎসার জন্য যেতে হেঁটে যেতে হয় জুরাছড়ি উপজেলার বনযোগীছড়া ইউনিয়ন সদরে।
এই পাড়ার সঙ্গে আশপাশের জনপদের সড়ক যোগাযোগ নেই। শিশুরা বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। কেউ কেউ বনযোগীছড়া ইউনিয়ন সদরের বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। খুব সকালে বিদ্যালয়ের উদ্দেশে হেঁটে রওনা দেয় তারা। বিদ্যালয় ছুটি হলে ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়। তবে পাড়ায় এখন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। সেখানে প্রাথমিক পর্যায়ের আগের স্তরের শিশুরা পড়তে যায়। তবে আশপাশে বিদ্যালয় না থাকায় অনেকের লেখাপড়া সেখানেই থেমে যায়। এ জন্য এলাকায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান তাঁরা। পাড়ার সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ বাসিন্দা অংচালা মারমা (৮৫) জানান, তাঁর জন্ম ওই পাড়ায়। পূর্বপুরুষেরা কীভাবে ওই এলাকায় গেছেন তা তাঁর জানা নেই। তিনি জানান, পাড়াটি আগে কিছুটা নিচু এলাকায় ছিল। তখন পাড়ার দেড় শতাধিক পরিবার ছিল। ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ হওয়ার পর সরকারি লোকজন মাপজোক করে সেটা পানিতে তলিয়ে যাবে বলে জানান। তখন পাড়ার মুরব্বিরা সিদ্ধান্ত নেন বান্দরবান চলে যাবেন। বাঁধের পানি আসা শুরু হলে কোনো ক্ষতিপূরণ না নিয়ে সবাই একসঙ্গে বান্দরবান চলে যান। কিন্তু নাড়ির টানে তাঁদের ১২ পরিবার আবার ওই স্থানে ফিরে আসেন। তাঁদের পূর্বপুরুষেরা সরকারি কর্মকর্তা, অফিস–আদালত ও জনপ্রতিনিধিদের যোগাযোগ করেননি কখনো। তাই এলাকায় শত বছরেও কোনো উন্নয়ন হয়নি।
সুবলং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তরুণ জ্যোতি চাকমা বলেন, গ্রামটি খুবই পুরোনো। তবে দুর্গম এলাকা হওয়ায় উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। তিনি বলেন, মাটি পাথুরে হওয়ায় সেখানে নলকূপ বসানো যায়নি। সম্প্রতি এলজিএসপি (স্থানীয় সরকার সহায়তা প্রকল্প) থেকে পাইপের মাধ্যমে পাড়ায় পাহাড়ের ঝরনার পানি সরবরাহের প্রকল্প পাওয়া গেছে। বর্ষা শেষ হলে প্রকল্পটির কাজ শুরু হবে। এ ছাড়া ওই পাড়ার লোকজনকে কীভাবে উন্নয়নের সুবিধা দেওয়া যায় তা নিয়ে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে।

No comments:

Post a Comment