বেশ কিছুদিন ধরে চাচার সঙ্গে দেখা হয় না। টেলিফোনে কথা হলেও সৌজন্যমূলক
আলাপের বেশি যেতে পারি না। এর একটা কারণ আছে। ক’দিন আগে আমি আমার
মুরগিওয়ালাকে নির্দেশ দিচ্ছিলাম, গলায় ছুরি চালানোর আগে আল্লাহু আকবর বলতে।
ওর পুরো চামড়াটা ছাড়িয়ে নিতে হবে। কলজেটা হাত দিয়ে ছিঁড়বে না, ছুরি দিয়ে
কেটে তুলে নেবে ইত্যাদি। হঠাৎ পেছন থেকে এসে আমার স্ত্রী আমার ওপর ঝাঁপিয়ে
পড়লেন। আমার হাত থেকে টেলিফোনের রিসিভার কেড়ে নিয়ে ক্রাডলে রাখলেন। আমি
হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ব্যাপারটা কি? তিনি বললেন, এসব কি কথা বলছ? মানে? তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কার সঙ্গে কথা বলছ? মুরগিওয়ালার সঙ্গে। কিন্তু তোমার কথার মধ্যে মুরগির নামগন্ধ নেই। মুরগিওয়ালার সঙ্গে কথা বলতে মুরগির নাম উল্লেখ করতে হবে নাকি? ওর সঙ্গে তো আমার অন্য বিষয়ে কথা হয় না। আমার
স্ত্রী সরোষে বললেন, গলায় ছুরি চালানো, চামড়া ছড়িয়ে নেয়া কলজে ছেঁড়া এসব
কি? তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? টেলিফোনে কথা বলতে হলে সমঝে বলতে হয়। ব্যাপারটা
বুঝতে পারলাম। সেদিনের পর থেকে কারো সঙ্গে ফোনে কথা বলতে হলে ‘সমঝে’ কথা
বলি। পারতপক্ষে কারো সঙ্গে টেলিফোনে তেমন কথাই বলি না। যাহোক, চাচার
সঙ্গে দেখা হলো বেশ কয়েকদিন পরে। তার শরীর ভালো যাচ্ছে না, সেটা আগেই
জেনেছিলাম। সম্ভবত সেকারণেই তিনি দীর্ঘ অসাক্ষাতের ব্যাপারে কোনো কথা বললেন
না। তবে আমাকে কাছে পেয়ে বেশ খুশি হলেন। বললেন, তুমি ছাড়া আর কারো সঙ্গে
তেমন আলাপ জমে না। আজ এসে ভালো করেছ। অনেক কথা মনে জমা হয়ে আছে। আমারও অনেক বিষয় শেয়ার করার আছে। আমি বললাম। তাহলে আগে তোমার কথা বলো। চাচা! আমি ভেবেছিলাম বেগম খালেদা জিয়া দেশে এলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। তোমার এমন ভাবনার কারণ?
উনি বিদেশে বসে দেশের ভেতরে বিদেশীদেরকে হত্যা করাচ্ছেন। এমন একটা কথা খুব রটনা করা হয়েছিল। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, এ বিষয়ে নাকি প্রমাণও আছে। পরে অবশ্য মাননীয় সড়ক যোগাযোগমন্ত্রী জানালেন, না। তাকে আটক করা হবে না। চাচা সহাস্যে বললেন, ওসব পলিটিক্যাল কথা। বর্তমান সরকার অতো মীন মাইন্ডেড নয়। তবে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তাকে যদি কারাগারে পাঠাতে হয়, তাহলে ভিন্ন কথা। অনেকগুলো মামলাই তো ঝুলছে তার নামে। তা ছাড়া, বিএনপির রাজনীতি এখন শেষ। এ কথার মানে বুঝতে পারলাম না। এবারের পৌর নির্বাচনে খালেদা জিয়ার বিএনপি আর অংশ নিতে পারবে না। কেন? ওরা ক্যান্ডিডেট পাবে কোথায়? জেলায় ও উপজেলায় বিএনপির প্রায় সবাই দশটা বিশটা মামলার আসামি। যারা নির্বাচনে দাঁড়াবার পাঁয়তারা করছিল, তারা সবাই পলাতক। এভাবে সারা দেশে বিএনপির লোকজনকে ধরে ধরে জেলে পাঠানো কি ঠিক? বিএনপির কেউ তো নির্বাচনই করতে পারবে না। সরকার রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করার একটা প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে। যারা বোমাবাজি করে, আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ায়, দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়, তাদেরকে রাজনীতি থেকে ছাঁটাই করাই সঙ্গত। একটা দেশের উন্নয়নের জন্য যা করা দরকার, সরকার তাই-ই করছে। রাজনীতি বাদ দিয়ে উন্নয়ন? যা বোঝ না, তা নিয়ে কথা বলা উচিত নয়। চাচা উষ্মা প্রকাশ করলেন। কিন্তু চাচা! বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হলে তা কি গ্রহণযোগ্য হবে?
কার কাছে গ্রহণযোগ্য? এতো জাতীয় নির্বাচন নয় যে বিদেশিদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। তা ছাড়া খালেদা জিয়ার বিএনপি এখন আর কোনো ফ্যাক্টর নয়। ঘুণে ধরা বিএনপি বাদ দিলে কোনো ক্ষতি হবে না। তাহলে দেশে তো একটা রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হবে। মোটেই না। খালেদা জিয়ার বিএনপি না থাকলেও তৃণমূল বিএনপিতো আছে।
তৃণমূল বিএনপি!হ্যাঁ। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা তৃণমূল বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দেশে এখন আর কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে তৃণমূল বিএনপির ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের একটু সহযোগিতা দরকার। কি রকম সহযোগিতা? ওরা নির্বাচনী প্রতীক হিসাবে ধানের শীষ চেয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে তৃণমূলকে ঐ প্রতীকটি দেয়া। তাহলে মূল বিএনপি? ওদেরকেএখন আর মূল বলা যাবে না। তৃণমূলই এখন মূল। খালেদা জিয়ার বিএনপিকে এখন গমের শীষ প্রতীক দেয়া যেতে পারে। গম তো পাকিস্তানিদের খাদ্য। সুতরাং তারা নিশ্চয়ই আপত্তি করবে না। চাচার কথার ব্যাপারে আমার অনেক কিছু বলার ছিল। বিএনপিকে অনেক সময়ই টুকরো করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একবার বিএনএফ করা হলো। কিন্তু কোনো উদ্যোগই তেমন ফলপ্রসূ হতে পারেনি। ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা অতীতে বার তিনেক নতুন দল করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তেমন সুবিধা করে উঠতে পারেননি। দল ভাঙার ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের ইন্ধন না থাকলে সফলকাম হওয়া যায় না। ব্যারিস্টার সাহেব কতটা কি করতে পারবেন, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ওপর তো জনগণের আস্থা নেই।
আস্থা নেই মানেটা কি? শতকরা পঞ্চাশ ভাগের বেশি ভোট পড়লেই বুঝতে হবে নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা আছে বলেই লোকে ভোট দিতে গিয়েছে। কিন্তু ওদের ব্যাপারে তোমার আস্থাহীনতা কেন? নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা ইসির উচিত ছিল। কিন্তু তারা তা করেনি। ওটা কোনো ব্যাপারই না। এসব আলাপ আলোচনা করে কোনো লাভ হয় না। সে জন্য ইসি সময় নষ্ট করতে চায়নি। চাচা! পত্রিকায় দেখলাম নির্বাচন কমিশন তাদের নিজস্ব লোক বাদ দিয়ে মাঠ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসর বানিয়ে নির্বাচন করাতে চায়।
এতো খুব ভালো কথা। চাচা সহাস্যে বললেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও ইউএনওরা রিটার্নিং অফিসার হলে ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচনও তারা সুষ্ঠুভাবে করতে পারবে। একটা রিহার্সেল তো দরকার। তাতে তোমার অসুবিধা কি?
ঐসব মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ক্ষমতাসীন মন্ত্রী ও এমপিদের পছন্দের মানুষ। সেভাবেই তাদের নিয়োগ দেয়া হয়। এখন যদি তাদের ওপর নির্বাচনের দায়িত্ব পড়ে তাহলে তারা ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারবে না। অর্থাৎ তাদের পক্ষে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন সম্ভব হবে না। তোমার মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে। চাচা আমার মুখের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বললেন, নিরপেক্ষতার প্রয়োজনটা কি? তুমি কি বলতে চাও মন্ত্রী ও এমপিরা নিরপেক্ষ মোটেই নয়। এবারের নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপিদের আশীর্বাদে যারা নির্বাচিত হবেন, তারাও নিরপেক্ষ হবেন না। কারণ, তারা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। রাজনৈতিক দলের ব্যানারে নির্বাচন সেজন্যই করা হচ্ছে। ভেবে দেখ মন্ত্রী-সাংসদদের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তিরা নির্বাচিত হলে দেশের উন্নয়ন কত ত্বরান্বিত হবে। তুমি তো সবসময় উল্টো করে দেখ। তাই উল্টো দিক থেকে সমালোচনা করো। আমি যে নির্বাচনকারী কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতার কথা বলেছি, চাচা এ বিষয়টি ধরতে পারেননি বা উপেক্ষা করে গেছেন। তবে তার বক্তব্যে যে বিষয়টা বুঝতে পারলাম, তা হচ্ছে মন্ত্রী, এমপি বা ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তিরাই আসন্ন নির্বাচনে জয়যুক্ত হতে যাচ্ছেন। সম্ভবত এতে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ হওয়ার তেমন প্রয়োজন নেই। নির্বাচন কমিশন নিজেদের অফিসার বাদ দিয়ে মাঠ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার নিয়োগে কোনো আপত্তি করেনি। বরং কমিশনের সচিব বিষয়টির সাফাই গাইছেন। ফলে এ বিষয়ে আমার আর কিছু বলার নেই। আমি যখন চাচার বাসা থেকে চলে আসবো ভেবে উঠি উঠি করছিলাম, ঠিক তখনই আবির্ভূত হলেন ম্যাজিক আলী। অনেক দিন পরে তাকে দেখে বসে পড়তে হলো। ম্যাজিক আলী আমাকে ও চাচাকে দুটো কার্ড বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, আসবেন কিন্তু। কি ব্যাপার? চাচা জিজ্ঞাসা করলেন।
আমার ছেলের বিয়ে আগামীকাল। বিয়েতে আপনাদের আসতেই হবে। আগামীকাল ছেলের বিয়ে! আর আজ আপনি দাওয়াত দিচ্ছেন? আমি বললাম। কি করবো স্যার! হাতে মোটেই সময় পাওয়া গেল না। যা করার এখনই করতে হবে। ভেবেছিলাম একজন মন্ত্রী বা এমপির মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ে দেব। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজির পরও জুটি মেলাতে পারলাম না। শেষ পর্যন্ত জেলা পর্যায়ের একজন রাজনৈতিক নেতার মেয়েই কপালে জুটল। মেয়েটা অবশ্য বেশ মোটা আর দেখতে আবলুস কাঠের রং। ম্যাজিক আলী বললেন। সে কি! একটু দেখে শুনে বিয়ে দিলেই তো হতো। এতে তাড়াহুড়ার কি আছে? চাচা জানতে চাইলেন। সময় এক্কেবারে নেই। আগামী ৩০শে ডিসেম্বর পৌরসভার নির্বাচন।
পৌরসভার নির্বাচনের সঙ্গে আপনার ছেলের বিয়ের সম্পর্ক কি? সম্পর্ক অবশ্যই আছে। তবে ছেলের বিয়ের সঙ্গে নয়। আমার সঙ্গে। আপনার সঙ্গে সম্পর্ক! কিছুই তো বুঝতে পারলাম না। আমি বললাম। বলছি স্যার! ম্যাজিক আলী টেবিলের ওপর থেকে এক গ্লাস পানি টেনে নিয়ে ঢক ঢক করে গলায় ঢেলে দিলেন। তারপর সুস্থির হয়ে বললেন, আমি এবার নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছি। নির্বাচন! আপনি? আমি সবিস্ময়ে বললাম। সে জন্যই তো ছেলের বিয়েটা হুড়মুড় করে দিতে হচ্ছে। ছেলের বিয়ের সঙ্গে নির্বাচনের সম্পর্ক কি, তা কিন্তু এখনো বুঝত পারলাম না। এবার ইলেকশনে কেউ প্রার্থী হতে চাইলে রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন পেতে হবে। দল একজনের বেশি কাউকে নোমিনেশন দেবে না। হার্ড কম্পিটিশন। ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী বা এমপির আত্মীয় হলে নমিনেশন পেতে সুবিধা হবে। আমি ছেলের বিয়ে দিয়ে তাদের সঙ্গে আত্মীয়তা পাতাতে চাইছিলাম। কিন্তু কপালে তেমনটি জুটল না। অবশেষে জেলা পর্যায়ের একজন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাকে পাকড়াও করলাম। মেয়েটা যদিও- সেই রাজনৈতিক নেতা কি আপনার মনোনয়ন এনে দিতে পারবেন? এর গ্যারান্টি কি? গ্যারান্টি অবশ্যই আছে। বিয়ের আগেই তিনি আমাকে বেয়াই সাহেব বেয়াই সাহেব বলে ডাকতে শুরু করেছেন। কিন্তু তিনি যদি আপনার মনোয়ন এনে দিতে না পারেন? পারবেন না কেন? ম্যাজিক আলী বললেন, তিনি একজন এমপির বিয়াই। সেই সুবাদে আমিও এমপি সাহেবের বিয়াই হয়ে গেলাম।
এমপি সাহেব কি পারবেন আপনাকে পার্টির মনোনয়ন এনে দিতে? অবশ্যই পারবেন। ম্যাজিক আলী উৎফুল্ল হয়ে বললেন, এমপি সাহেব আবার একজন মন্ত্রীর বেয়াই। সুতরাং আমার মনোনয়ন পেতে কোনো সমস্যা নেই। একটু থেমে ম্যাজিক আলী বললেন, আমি কখনো কাঁচা কাজ করি না স্যার! আত্মীয়তার লাইনটা খুঁজে বের করে তবেই তো ঐ রকম মোটা আর কালো বৌমাকে ঘরে আনতে রাজি হয়েছি।
উনি বিদেশে বসে দেশের ভেতরে বিদেশীদেরকে হত্যা করাচ্ছেন। এমন একটা কথা খুব রটনা করা হয়েছিল। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, এ বিষয়ে নাকি প্রমাণও আছে। পরে অবশ্য মাননীয় সড়ক যোগাযোগমন্ত্রী জানালেন, না। তাকে আটক করা হবে না। চাচা সহাস্যে বললেন, ওসব পলিটিক্যাল কথা। বর্তমান সরকার অতো মীন মাইন্ডেড নয়। তবে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তাকে যদি কারাগারে পাঠাতে হয়, তাহলে ভিন্ন কথা। অনেকগুলো মামলাই তো ঝুলছে তার নামে। তা ছাড়া, বিএনপির রাজনীতি এখন শেষ। এ কথার মানে বুঝতে পারলাম না। এবারের পৌর নির্বাচনে খালেদা জিয়ার বিএনপি আর অংশ নিতে পারবে না। কেন? ওরা ক্যান্ডিডেট পাবে কোথায়? জেলায় ও উপজেলায় বিএনপির প্রায় সবাই দশটা বিশটা মামলার আসামি। যারা নির্বাচনে দাঁড়াবার পাঁয়তারা করছিল, তারা সবাই পলাতক। এভাবে সারা দেশে বিএনপির লোকজনকে ধরে ধরে জেলে পাঠানো কি ঠিক? বিএনপির কেউ তো নির্বাচনই করতে পারবে না। সরকার রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করার একটা প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে। যারা বোমাবাজি করে, আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ায়, দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়, তাদেরকে রাজনীতি থেকে ছাঁটাই করাই সঙ্গত। একটা দেশের উন্নয়নের জন্য যা করা দরকার, সরকার তাই-ই করছে। রাজনীতি বাদ দিয়ে উন্নয়ন? যা বোঝ না, তা নিয়ে কথা বলা উচিত নয়। চাচা উষ্মা প্রকাশ করলেন। কিন্তু চাচা! বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হলে তা কি গ্রহণযোগ্য হবে?
কার কাছে গ্রহণযোগ্য? এতো জাতীয় নির্বাচন নয় যে বিদেশিদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। তা ছাড়া খালেদা জিয়ার বিএনপি এখন আর কোনো ফ্যাক্টর নয়। ঘুণে ধরা বিএনপি বাদ দিলে কোনো ক্ষতি হবে না। তাহলে দেশে তো একটা রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হবে। মোটেই না। খালেদা জিয়ার বিএনপি না থাকলেও তৃণমূল বিএনপিতো আছে।
তৃণমূল বিএনপি!হ্যাঁ। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা তৃণমূল বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দেশে এখন আর কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে তৃণমূল বিএনপির ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের একটু সহযোগিতা দরকার। কি রকম সহযোগিতা? ওরা নির্বাচনী প্রতীক হিসাবে ধানের শীষ চেয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে তৃণমূলকে ঐ প্রতীকটি দেয়া। তাহলে মূল বিএনপি? ওদেরকেএখন আর মূল বলা যাবে না। তৃণমূলই এখন মূল। খালেদা জিয়ার বিএনপিকে এখন গমের শীষ প্রতীক দেয়া যেতে পারে। গম তো পাকিস্তানিদের খাদ্য। সুতরাং তারা নিশ্চয়ই আপত্তি করবে না। চাচার কথার ব্যাপারে আমার অনেক কিছু বলার ছিল। বিএনপিকে অনেক সময়ই টুকরো করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একবার বিএনএফ করা হলো। কিন্তু কোনো উদ্যোগই তেমন ফলপ্রসূ হতে পারেনি। ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা অতীতে বার তিনেক নতুন দল করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তেমন সুবিধা করে উঠতে পারেননি। দল ভাঙার ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের ইন্ধন না থাকলে সফলকাম হওয়া যায় না। ব্যারিস্টার সাহেব কতটা কি করতে পারবেন, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ওপর তো জনগণের আস্থা নেই।
আস্থা নেই মানেটা কি? শতকরা পঞ্চাশ ভাগের বেশি ভোট পড়লেই বুঝতে হবে নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা আছে বলেই লোকে ভোট দিতে গিয়েছে। কিন্তু ওদের ব্যাপারে তোমার আস্থাহীনতা কেন? নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা ইসির উচিত ছিল। কিন্তু তারা তা করেনি। ওটা কোনো ব্যাপারই না। এসব আলাপ আলোচনা করে কোনো লাভ হয় না। সে জন্য ইসি সময় নষ্ট করতে চায়নি। চাচা! পত্রিকায় দেখলাম নির্বাচন কমিশন তাদের নিজস্ব লোক বাদ দিয়ে মাঠ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসর বানিয়ে নির্বাচন করাতে চায়।
এতো খুব ভালো কথা। চাচা সহাস্যে বললেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও ইউএনওরা রিটার্নিং অফিসার হলে ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচনও তারা সুষ্ঠুভাবে করতে পারবে। একটা রিহার্সেল তো দরকার। তাতে তোমার অসুবিধা কি?
ঐসব মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ক্ষমতাসীন মন্ত্রী ও এমপিদের পছন্দের মানুষ। সেভাবেই তাদের নিয়োগ দেয়া হয়। এখন যদি তাদের ওপর নির্বাচনের দায়িত্ব পড়ে তাহলে তারা ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারবে না। অর্থাৎ তাদের পক্ষে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন সম্ভব হবে না। তোমার মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে। চাচা আমার মুখের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বললেন, নিরপেক্ষতার প্রয়োজনটা কি? তুমি কি বলতে চাও মন্ত্রী ও এমপিরা নিরপেক্ষ মোটেই নয়। এবারের নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপিদের আশীর্বাদে যারা নির্বাচিত হবেন, তারাও নিরপেক্ষ হবেন না। কারণ, তারা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। রাজনৈতিক দলের ব্যানারে নির্বাচন সেজন্যই করা হচ্ছে। ভেবে দেখ মন্ত্রী-সাংসদদের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তিরা নির্বাচিত হলে দেশের উন্নয়ন কত ত্বরান্বিত হবে। তুমি তো সবসময় উল্টো করে দেখ। তাই উল্টো দিক থেকে সমালোচনা করো। আমি যে নির্বাচনকারী কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতার কথা বলেছি, চাচা এ বিষয়টি ধরতে পারেননি বা উপেক্ষা করে গেছেন। তবে তার বক্তব্যে যে বিষয়টা বুঝতে পারলাম, তা হচ্ছে মন্ত্রী, এমপি বা ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তিরাই আসন্ন নির্বাচনে জয়যুক্ত হতে যাচ্ছেন। সম্ভবত এতে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ হওয়ার তেমন প্রয়োজন নেই। নির্বাচন কমিশন নিজেদের অফিসার বাদ দিয়ে মাঠ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার নিয়োগে কোনো আপত্তি করেনি। বরং কমিশনের সচিব বিষয়টির সাফাই গাইছেন। ফলে এ বিষয়ে আমার আর কিছু বলার নেই। আমি যখন চাচার বাসা থেকে চলে আসবো ভেবে উঠি উঠি করছিলাম, ঠিক তখনই আবির্ভূত হলেন ম্যাজিক আলী। অনেক দিন পরে তাকে দেখে বসে পড়তে হলো। ম্যাজিক আলী আমাকে ও চাচাকে দুটো কার্ড বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, আসবেন কিন্তু। কি ব্যাপার? চাচা জিজ্ঞাসা করলেন।
আমার ছেলের বিয়ে আগামীকাল। বিয়েতে আপনাদের আসতেই হবে। আগামীকাল ছেলের বিয়ে! আর আজ আপনি দাওয়াত দিচ্ছেন? আমি বললাম। কি করবো স্যার! হাতে মোটেই সময় পাওয়া গেল না। যা করার এখনই করতে হবে। ভেবেছিলাম একজন মন্ত্রী বা এমপির মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ে দেব। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজির পরও জুটি মেলাতে পারলাম না। শেষ পর্যন্ত জেলা পর্যায়ের একজন রাজনৈতিক নেতার মেয়েই কপালে জুটল। মেয়েটা অবশ্য বেশ মোটা আর দেখতে আবলুস কাঠের রং। ম্যাজিক আলী বললেন। সে কি! একটু দেখে শুনে বিয়ে দিলেই তো হতো। এতে তাড়াহুড়ার কি আছে? চাচা জানতে চাইলেন। সময় এক্কেবারে নেই। আগামী ৩০শে ডিসেম্বর পৌরসভার নির্বাচন।
পৌরসভার নির্বাচনের সঙ্গে আপনার ছেলের বিয়ের সম্পর্ক কি? সম্পর্ক অবশ্যই আছে। তবে ছেলের বিয়ের সঙ্গে নয়। আমার সঙ্গে। আপনার সঙ্গে সম্পর্ক! কিছুই তো বুঝতে পারলাম না। আমি বললাম। বলছি স্যার! ম্যাজিক আলী টেবিলের ওপর থেকে এক গ্লাস পানি টেনে নিয়ে ঢক ঢক করে গলায় ঢেলে দিলেন। তারপর সুস্থির হয়ে বললেন, আমি এবার নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছি। নির্বাচন! আপনি? আমি সবিস্ময়ে বললাম। সে জন্যই তো ছেলের বিয়েটা হুড়মুড় করে দিতে হচ্ছে। ছেলের বিয়ের সঙ্গে নির্বাচনের সম্পর্ক কি, তা কিন্তু এখনো বুঝত পারলাম না। এবার ইলেকশনে কেউ প্রার্থী হতে চাইলে রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন পেতে হবে। দল একজনের বেশি কাউকে নোমিনেশন দেবে না। হার্ড কম্পিটিশন। ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী বা এমপির আত্মীয় হলে নমিনেশন পেতে সুবিধা হবে। আমি ছেলের বিয়ে দিয়ে তাদের সঙ্গে আত্মীয়তা পাতাতে চাইছিলাম। কিন্তু কপালে তেমনটি জুটল না। অবশেষে জেলা পর্যায়ের একজন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাকে পাকড়াও করলাম। মেয়েটা যদিও- সেই রাজনৈতিক নেতা কি আপনার মনোনয়ন এনে দিতে পারবেন? এর গ্যারান্টি কি? গ্যারান্টি অবশ্যই আছে। বিয়ের আগেই তিনি আমাকে বেয়াই সাহেব বেয়াই সাহেব বলে ডাকতে শুরু করেছেন। কিন্তু তিনি যদি আপনার মনোয়ন এনে দিতে না পারেন? পারবেন না কেন? ম্যাজিক আলী বললেন, তিনি একজন এমপির বিয়াই। সেই সুবাদে আমিও এমপি সাহেবের বিয়াই হয়ে গেলাম।
এমপি সাহেব কি পারবেন আপনাকে পার্টির মনোনয়ন এনে দিতে? অবশ্যই পারবেন। ম্যাজিক আলী উৎফুল্ল হয়ে বললেন, এমপি সাহেব আবার একজন মন্ত্রীর বেয়াই। সুতরাং আমার মনোনয়ন পেতে কোনো সমস্যা নেই। একটু থেমে ম্যাজিক আলী বললেন, আমি কখনো কাঁচা কাজ করি না স্যার! আত্মীয়তার লাইনটা খুঁজে বের করে তবেই তো ঐ রকম মোটা আর কালো বৌমাকে ঘরে আনতে রাজি হয়েছি।

No comments:
Post a Comment