Wednesday, December 9, 2015

ইসির নির্দেশনা উপেক্ষা নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্প

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্দেশ উপেক্ষা করে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ৭ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। গতকাল একনেকের বৈঠকে ১০টি প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। অনুমোদিত প্রকল্পের মধ্যে ৭টি প্রকল্প পৌর নির্বাচন এলাকার আওতাধীন। এসব প্রকল্প স্থগিত রাখতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। মঙ্গলবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বৈঠকে এসব প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, উন্নয়ন বন্ধ রেখে নির্বাচন নয়। নির্বাচন একটি চলমান প্রকল্প। সারা বছরই নির্বাচন হয়। তাই বলে দেশের উন্নয়ন বন্ধ রাখা যাবে না। নির্বাচনও চলবে উন্নয়নও চলবে। প্রকল্প স্থগিত রাখতে নির্বাচন কমিশনের চিঠির পরেও একনেকে প্রকল্প অনুমোদন দেয়ার বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, সভায় যে ১০টি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে এগুলো কোনো সুনির্দিষ্ট পৌরসভার জন্য নয়। অনুমোদিত প্রকল্পগুলো সব জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্প। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, এর পরেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হবে। সারা দেশেইতো ইউনিয়ন পরিষদ আছে, তাই বলে কি উন্নয়ন থেমে থাকবে? ভোটের পাশাপাশি উন্নয়নও চলবে বলে জানান তিনি। এ প্রসঙ্গে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন না দেয়ার ব্যাপারে আইন আছে, বিধি আছে। এটা সকল মন্ত্রণালয়কে মানতে হবে। এখন কেউ যদি নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ না মানে তবে কমিশনের হাতে একটা অস্ত্র আছে। সেটা হচ্ছে ওই সব এলাকায় নির্বাচন বন্ধ রাখা। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো শেষ হলে তারপর সেখানে নির্বাচন করা। এ বিষয়ে গতকাল নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনারও বিষয়টি এড়িয়ে যান। গত সোমবার নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ রাখতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়ে চিঠি দেয় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তফসিল ঘোষণার দিন থেকে ফলাফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থ ছাড় না দিতে চিঠিতে অনুরোধ করা হয়। নির্বাচন কমিশন সচিলবালয়ের উপ-সচিব স্বাক্ষরিত চিঠি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর পাঠানো হয়েছিল। চিঠিতে বলা হয়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিন থেকে ফলাফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকায় কোনো ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া যাবে না। পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর বা অন্য কোনো পদাধিকারী সংশ্লিষ্ট এলাকায় উন্নয়নমূলক কোনো প্রকল্প অনুমোদন বা ইতিপূর্বে অনুমোদিত কোনো প্রকল্পে অর্থছাড় বা প্রদান করতে পারবেন না। এ বিষয়ে সোমবার ইসির একজন উপ-সচিব জানান, প্রকল্পের অনুমোদন না দিতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে সকালে মৌখিকভাবে নিষেধ করা হয়েছে। তারপরও ফরমালি চিঠি দিয়ে নিষেধ করা হয়েছে। চিঠিতে নির্বাচনী এলাকায় এ ধরনের প্রকল্প সংক্রান্ত কার্যক্রম স্থগিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে সব ধরনের উন্নয়নমূলক প্রকল্প অনুমোদন, অর্থছাড় বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। কারণ, নির্বাচনকালীন সময়ে এসব উন্নয়নমূলক কাজ হলে নির্বাচন প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। গত ২রা ডিসেম্বর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও দুর্যোগ ব্যবস্থা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে সব ধরনের প্রকল্প বন্ধ রাখতেও চিঠি দেয় ইসি। নির্বাচনী আচরণ বিধিমালাতে বলা হয়েছে, নির্বাচন পূর্ব সময়ে কোন সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রাজস্ব বা উন্নয়ন তহবিলভুক্ত কোন প্রকল্পের অনুমোদন, ঘোষণা বা ভিত্তিপ্রস্তর, স্থাপন কিংবা ফলক উন্মোচন করা যাবে না। বিধিতে আরও বলা হয়েছে, কোনো সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সরকারি বা আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের তহবিল হতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কোনো প্রকার অনুদান ঘোষণা বা বরাদ্দ কিংবা ছাড় দিতে পারবে না। গতকাল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সিঙ্গেল মুরিং টার্মিনালসহ ১০ প্রকল্প অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে ৭টি প্রকল্প এলাকায় পৌরসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৭ হাজার ২৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১,৯১৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ৬০২ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে ব্যয় হবে ৪,৭৫৫ লাখ টাকা। গতকাল এনইসি সম্মেলন কক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে ব্রিফ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ সময় পরিকল্পনা সচিব মোহাম্মদ সফিকুল আযম, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। প্রকল্পগুলো হচ্ছে- ইন্সটলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং উইথ ডাবল পাইপ লাইন প্রকল্প, এটি বান্তবায়নে ব্যয় হবে ৪,৯৩৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা; পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্রিড নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্প, এর ব্যয় ১,৪২৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা; চট্টগ্রাম, মংলা, আইসিডি কমলাপুর এবং বেনাপোল কাস্টম হাউজের জন্য কন্টেইনার স্ক্যানার ক্রয় প্রকল্প, এর ব্যয় হবে ১১৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা; বাকেরগঞ্জ-পাদ্রীশিবপুর-কাঠলতলি-সুবিদখালী-বরগুনা সড়ক প্রশস্তকরণ ও মজবুতকরণ প্রকল্প, এতে ব্যয় হবে ১৪৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা; বরিশাল সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন সড়ক প্রশস্তকরণসহ উন্নয়ন ও ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্প, এর ব্যয় ৮৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা; যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, এর ব্যয় ২৮১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা; স্কিলস ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রকল্প, এর ব্যয় ১৬২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা; সমন্বিত কৃষি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কুমিল্লা জেলার লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ি এলাকার জনগণের জীবন-জীবিকার মানোন্নয়ন প্রকল্প, এতে ব্যয় হবে ৫৩ কোটি টাকা; সমবায়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার উন্নয়ন প্রকল্প, এতে ব্যয় হবে ৩৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা; পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় মিশ্র ফল চাষ প্রকল্প, এতে ব্যয় হবে ৩৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা।অ্যাকশন নেয়া হচ্ছে: সিইসি পৌর নির্বাচনে প্রার্থীদের বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে গতকাল সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা ইতিমধ্যে অনেকগুলো ব্যবস্থা নিয়েছি। এমপিদের নির্বাচনী প্রচারণায় না যেতে বলেছি। যারা গেছেন তাদের শোকজও করেছি। অ্যাকশন তো নিচ্ছি। এর আগে বিকাল চারটায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খানের নেতৃত্বে সিইসির সঙ্গে দেখা করেন বিএনপির ৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল। তারা সিইসির কাছে বেশ কিছু অভিযোগ ও লিখিত প্রস্তাব দেন। পরে মঈন খান সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, মনোনয়নপত্র দাখিলের শুরু থেকে বিভিন্নভাবে বিএনপির নেতাকর্মীরা বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। অনেকে প্রার্থী হতে পারেননি। নেতাকর্মীদের আটক করা হচ্ছে। এমন হলে তো নির্বাচনে সমসুযোগ থাকে না। বিএনপির অভিযোগের প্রেক্ষিতে কাজী রকিবউদ্দিন বলেন, তারা (বিএনপি) অভিযোগ করেছেন, অনেক জায়গায় মনোনয়নত্র দাখিল করতে পারেননি। আমরা বলেছি, যারা মনোনয়নপত্র দাখিল করতে চেয়েছেন এবং সাহায্য চেয়েছেন তাদের সাহায্য করেছি। সে উদাহরণও দেয়া হয়েছে, দাগনভূঞায় একজন প্রার্থী সাহায্য চেয়েছিলেন তাকে সাহায্য করা হয়েছে। উনাদের প্রার্থীরা কোনো ধরনের সমস্যায় পড়লে ব্যবস্থা নেব। তিনি বলেন, তাদের আমরা আশ্বস্ত করেছি, আপনাদেরও বলছি, আইন মোতাবেক সুষ্ঠু নির্বাচন করবো। কর্মকর্তাদের সবাইকে আইন মোতাবেক সিদ্ধান্ত দিতে বলেছি। সিইসি বলেন, আগেও বলেছি, পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে, কারোর মনোনয়নপত্র বাতিল হলে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। আদালতেও যেতে পারবেন। কিন্তু করার বিষয় নয়। সিইসি বলেন, সবাইকে সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা দিয়েছি, সব কিছু আইন অনুযায়ী হবে। আইনের ব্যত্যয় ঘটবে না। আশা করছি, সব সুন্দর ভাবে হবে।  উল্লেখ্য, আগামী ৩০শে ডিসেম্বর ২৩৫টি পৌরসভায় ভোটগ্রহণ শুরু হবে। ১৩ই ডিসেম্বর প্রত্যাহারের শেষ দিন। প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে ১৪ই ডিসেম্বর।

No comments:

Post a Comment