স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র চলতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন
প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী। তিনি
বলেন, আমি কোনো গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাস করি না। কারণ কোথায় কোন জমি
দখল হচ্ছে, কোথায় কি সমস্যা হচ্ছে এটা গণমাধ্যম প্রকাশ না করলে আমরা এতটা
জানতে পারতাম না। গতকাল শনিবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের
(টিআইবি) কার্যালয়ে এক আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে ‘গণমাধ্যম ও সুশাসন’
শীর্ষক আলোচনা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার-২০১৫ বিতরণ অনুষ্ঠানের
আয়োজন করে প্রতিষ্ঠানটি। গওহর রিজভী বলেন, গত দশ বছরে অনুসন্ধানী
রিপোর্টিংয়ের অসাধারণ মান বেড়েছে। অনেক অনুসন্ধানী রিপোর্ট হওয়ার কারণে
দুর্নীতি কমাতে পেরেছে সরকার। যে রিপোর্ট না হলে হয়তো ক্ষমতাসীন দলের
সংশ্লিষ্ট লোকেরা দুর্নীতি করতে পারতো। গওহর রিজভী বলেন, গণমাধ্যম যে
অনেকটা স্বাধীন হয়েছে সরকার এই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। এখানে হাত দেয়া যাবে
না- এটাও সরকার জানে। বর্তমান সময়ে এসে কোনো সংবাদ প্রকাশে কোনো সরকারই
বাধা দিতে পারে না। সরকার যদি কোন গণমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে
নিজের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেয় তাতে কিছু যায় আসে না। কারণ বেসরকারি খাত থেকে
এত বেশি বিজ্ঞাপন আসে যে সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ হলেও কিছু আসে যায় না।
এছাড়া, একটি টেলিভিশন বন্ধ করে দিয়েছে তাতে কিছু যায় আসে না। কারণ আরও
অনেকগুলো টেলিভিশন রয়েছে। ফেসবুক ও ইন্টারনেট রয়েছে। এসব গণমাধ্যম নানা
উপায়ে সে সংবাদ জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়। তিনি বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা
শুধুমাত্র সরকারের দিক থেকেই বাধাগ্রস্ত হয় না। এক্ষেত্রে সম্পাদকদের ওপর
মিডিয়ার কর্পোরেট মালিকদের খবরদারির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার সময় এসেছে। ‘সভাপতির
বক্তব্যে ড. আকবর আলি খান বলেন, অনেক দুর্বলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের
গণমাধ্যমের যে অর্জন তা গর্ব করার মতো। বিশেষ করে বিশ্বে সুশাসনের দিক থেকে
বাংলাদেশের অবস্থান অনেক নিচের দিকে হলেও এদেশের গণমাধ্যমের অর্জন
প্রশংসনীয়। দেশের সব ক্ষেত্রে দুর্নীতি অনেক পুরাতন ব্যাপার। বাংলাদেশ এমন
একটা দেশ যেখানে দুর্নীতি না করলে কাজ হয় না। শুধু বেআইনি কাজেই ঘুষ খায়
না। আইনি কাজেও ঘুষ খায়। নিচ থেকে উপর পর্যন্ত দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও
আমরা সবাই চাই কালকের মধ্যেই দুর্নীতি দূর হয়ে যাক। কিন্তু এটা সম্ভব না।
তিনি বলেন, এখানে পদ্ধতিগতভাবে দুর্নীতি করলে তার কোনো বিচার হয় না। হলেও
যতটা হয় তাতে কেউ দুর্নীতি করতে ভয় পায় না। তিনি বলেন, টিআইবি সরকারের
শত্রু নয়, বন্ধু। তবে অনেকেই ব্যক্তিগত স্বার্থে টিআইবিকে অন্য চোখে দেখে।
সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকতায়
অতিমাত্রায় রাজনীতিকরণ হয়ে গেছে। এবিএম মূসা বলেছিলেন, একটি পুকুরের মধ্যে
অনেকগুলো কুমির ছেড়ে দিয়ে বলা হলো এমাথা থেকে অপর মাথা পর্যন্ত সাঁতার
কাটতে হবে। তবে কারও গায়ে বা লেজের সঙ্গেও স্পর্শ লাগা যাবে না। এই কুমির
দলের মতো অবস্থা হয়ে গেছে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা। এর মধ্যেও আমরা কাজ করে
যাচ্ছি। অনেকে সফলতাও অর্জন করছি। তিনি বলেন, মিডিয়ায় সুশাসন আছে কিনা সেটা
আমি বলবো না। তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ চলছে। অনুষ্ঠানে ড.
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “অনেক চ্যালেঞ্জ থাকার পরও আমাদের দেশের গণমাধ্যম
ঝুঁকি নিয়ে ভালো কাজ করে যাচ্ছে। গণমাধ্যম সরকারের সহযোগী ও সহযোদ্ধা
হিসেবেই কাজ করে থাকে। তাই গণমাধ্যম যেমন সরকারের ইতিবাচক তথ্য প্রচার
করবে, তেমনি সরকারের সমালোচনাও করবে। এই সমালোচনা সরকারকে ইতিবাচকভাবেই
গ্রহণ করতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “টিআইবি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার
প্রদান করায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় কিছুটা হলেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।” মুক্ত
আলোচনায় অংশ নিয়ে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, অনেক
রিপোর্ট হয়, তথ্য বের হয়ে আসে। কিন্তু তার কোন ফলোআপ হয় না। বহুল আলোচিত
কালো বিড়ালের রিপোর্ট প্রকাশিত হলো। তার আর কোন ফলোআপ নেই। টাকাগুলো কে
দিলো, ড্রাইভারই বা কেন ধরিয়ে দিলো। দেশবাসী জানতে চাইলেও এটা নিয়ে কেউ
রিপোর্ট করে না। করতে পারে না। তিনি আরও বলেন, সমপ্রতি একুশে টেলিভিশনের
মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে। শুনেছি নিলাম হয়েছে। কিন্তু নিলাম হলে পত্রিকায়
দেয়া হয়। আমরা কেউই জানতে পারলাম না। আমিও কিছু টাকা যোগাড় করেছিলাম। হয়তো
কোন অজানা পত্রিকায় দেয়া হয়েছিল। যে কারণে জানতে পারিনি। অনুষ্ঠানে
টিআইবি’র পক্ষ থেকে তিনটি ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায়
পুরস্কার দেয়া হয়। এর মধ্যে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিবেদক রেজিনা ইসলামকে
পুরস্কার দেয়া হয় ‘বিদেশি বন্ধু ও সংগঠনকে মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা
ক্রেস্টের স্বর্ণের ১২ আনাই মিছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনের জন্য। এছাড়া পানি
উন্নয়ন বোর্ডের দুর্নীতি শীর্ষক প্রতিবেদনের জন্য পুরস্কার পান চ্যানেল
২৪-এর প্রতিবেদক জিএম মুস্তাফিজুর রহমান ও ক্যামেরাপারসন জাহাঙ্গীর আলম
রতন। ‘১০ দিনে বিবিএ পাস’ শীর্ষক প্রতিবেদনের জন্য পুরস্কার দেয়া হয় যমুনা
টেলিভিশনের ইনভেস্টিগেশন সেল-এর সম্পাদক মিজান মালিক এবং নিজস্ব প্রতিবেদক
সাজ্জাদ পারভেজকে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট টেলিভিশনের ক্যামেরাপারসন কাজী মো.
ইসমাইল হোসেনকেও পুরস্কার দেয়া হয়।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment