Tuesday, December 8, 2015

অ্যাকশন নেই ইসির

 প্রতিশ্রুতি-আশ্বাসে নিরপেক্ষতার কথা বললেও মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না নির্বাচন কমিশন। আচরণবিধির লঙ্ঘন হলেও জোরালো কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না স্থানীয় কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তারা পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন বলেও অভিযোগ উঠছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পক্ষ থেকে। প্রার্থীদের মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শেষে নির্বাচন কমিশনের  মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ না থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনে ইতিমধ্যে অভিযোগ দিয়েছেন বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে। নির্বাচন কমিশনের কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, আগের নির্বাচনগুলোতে মাঠপর্যায় থেকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য সরবরাহ করা হতো। কিন্তু এবার কোনো তথ্যই সঠিক সময়ে পাওয়া যাচ্ছে না। রিটার্নিং অফিসারদের সঙ্গে ইসি সচিবালয়ের সমন্বয়হীনতার কারণে নানা বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। মনোনয়নপত্র বাছাই গত রোববার শেষ হলেও বিভিন্ন পৌরসভা থেকে দলভিত্তিক প্রার্থীদের তথ্য আসেনি নির্বাচন কমিশনে। মূলত, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদাসীনতার কারণে এমনটি হচ্ছে বলে তারা মনে করছেন। গতকাল ছিল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের প্রথম দিন। এর আগে গত শনি ও রোববার প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই ও বাছাই করা হয়। ২৩৪ পৌরসভায় মেয়র পদে বাতিল করা হয়েছে ১৬৬ জনের মনোনয়নপত্র। এ ছাড়া সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৫৭১ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ১৫৬ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র কর্মকর্তারা বলছেন, এত পরিমাণে প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের ঘটনা অস্বাভাবিক। এর আগে স্থানীয় নির্বাচনে এতসংখ্যক প্রার্র্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়নি। মূলত, মাঠপর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব লোকবল থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নির্বাচনী দায়িত্ব দেয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন তারা। তবে মাঠপর্যায়ে কোনোপ্রকার বিশৃঙ্খলা হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ। গতকাল ইসি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, সিনিয়র কর্মকর্তাদের অভাবে প্রশাসনের লোকজনকে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ২৩৪ পৌরসভায় ১৭৩ জন প্রশাসনের ক্যাডারের কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। এদের মধ্যে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) রয়েছেন। বাকি ৬১ জন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা। মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ বলেন, সিনিয়র কর্মকর্তার সংখ্যা কম। এ ছাড়া ৮৫ কর্মকর্তার নামে মামলা চলছে। কাজেই আমরা প্রশাসন কর্মকর্তাদের দিয়ে নির্বাচন করছি, এ ধরনের অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি বলেন, পৌরসভা নির্বাচন এবার প্রথম হচ্ছে না। এবারই প্রথম নির্বাচনে ইসির ৬১ কর্মকর্তাকে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আগের নির্বাচনগুলোতে ইসির কর্মকর্তাকে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়নি। তা ছাড়া প্রত্যেকটি পৌরসভায় ইসির কর্মকর্তাদের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি দাবি করেছেন, ১৮ পৌরসভায় জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের মনোনয়ন দাখিল করতে দেয়া হয়নি। গতকাল রংপুরে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এরশাদ অভিযোগ করে বলেন, আমি বলেছি, যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের কথা মানুষ ভুলে যাবে। এ বিষয়ে মানুষের মনে সন্দেহ আছে, আমার মনেও আছে। এরই মধ্যে তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি। ১৮ জায়গায় আমাদের প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র দাখিল করতে দেয়া হয়নি। তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে, এখনও হুমকি দেয়া হচ্ছে। এদিকে ফেনীর ৩ পৌরসভার ৪৮ ওয়ার্ডের মধ্যে ৩৩টি ওয়ার্ডে মাত্র একজন করে প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ফলে তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কাউন্সিলর নির্বাচিত হতে চলেছেন। এ ছাড়া মেয়র পদে বিএনপির প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেয়ায় ফেনী ও পরশুরাম পৌরসভায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে চলেছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত দুই মেয়র প্রার্থী। ফেনীর এ ঘটনাকেও অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন নির্বাচন কমিশনের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, ফেনীর তিন পৌরসভায় নির্বাচন কমিশন চাইলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারতো। সেখানে প্রশাসনের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ থাকায় বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সাহস পাননি। নির্বাচন কমিশন চাইলে যে কোনো পৌরসভায় ভোটগ্রহণ স্থগিত করতে পারে। তবে কোনোপ্রকার অভিযোগ না থাকায় ফেনীর ঘটনায় নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নিতে পারেনি বলে দাবি করেছেন নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চাঁদপুর ও ফেনী থেকে আমাদের কাছে কোনো ধরেনের আপত্তি-অভিযোগ আসেনি। তবে প্রাথমিকভাবে সার্বিক বিষয়গুলো রিটার্নিং কর্মকর্তারা দেখেন। তবে কেউ যদি রিটার্নিং কর্মকর্তার আদেশে সংক্ষুব্ধ হন তাহলে তারা জেলা প্রশাসকের কাছে আপিল করার সুযোগ পাবেন। এ অভিযোগ ইসিতে এলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। মনোনয়নপত্রে দেয়া তথ্য নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা পরিবর্তন করেছেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে বিএনপির প্রার্থীদের পক্ষ থেকে। চাঁদপুরের ছেংগারচর পৌরসভার বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী সারোয়ারুল আবেদীন অভিযোগ করেছেন, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে তিনি এসএসসি ও এইচএসসির সনদ সংযুক্ত করে দিয়েছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তরের কেউ সেটা সরিয়ে ফেলে এখন বলছেন মনোনয়নপত্রটি অসম্পূর্ণ। তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এ রকম বেশ কয়েকটি অভিযোগ এসেছে বিএনপির পক্ষ থেকে। কয়েকটি পৌরসভায় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একাধিক প্রার্থী দেয়া হয়েছে, তার পরও তাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়নি বলে অভিযোগ আছে। ইসি সূত্র জানায়, খুলনার পাইকগাছায় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ৩ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। বরগুনার বেতাগীতে ২ জন এবং মাগুরায় ২ মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার শাহনেওয়াজ বলেন, এ বিষয়ে আমাদের কাছে এমন কোনো তথ্য নেই। কোনো দল যদি একাধিক প্রার্থী দেয় অবশ্যই তাদের প্রার্থিতা বাতিল হবে। এদিকে তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের ফলাফল ঘোষণার সময় পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকার কোনোপ্রকার উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের নিয়ম না থাকলেও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় তা মানছে না। এ ক্ষেত্রেও নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ না থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। আজ শেরেবাংলা নগরের এনইসি মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেক বৈঠকের কথা রয়েছে। সেখানে ৭টি প্রকল্প অনুমোদনের কথা রয়েছে। যেগুলোর অধিকাংশই নির্বাচনী এলাকায় অবস্থিত। তবে গতকাল শেষ মুহূর্তে এসব প্রকল্প অনুমোদন না দেয়ার জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবে ইসি: শাহনেওয়াজমনোনয়নপত্র বাছাইয়ে কোনো প্রকার অনিয়মের অভিযোগ পায়নি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ ধরনের কোনো অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ। গতকাল নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান। চাঁদপুর ও ফেনীতে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় বিরোধী প্রার্থীর কাগজপত্র খুলে বা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে বলে অনেকে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু ইসি এ বিষয়ে কোনো ভূমিকা পালন করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, চাঁদপুর ও ফেনী থেকে আমাদের কাছে কোনো ধরনের আপত্তি-অভিযোগ আসেনি। তবে প্রাথমিকভাবে সার্বিক বিষয়গুলো রিটার্নিং কর্মকর্তারা দেখেন। তবে কেউ যদি রিটার্নিং কর্মকর্তার আদেশে সংক্ষুব্ধ হন তাহলে তারা জেলা প্রশাসকের কাছে আপিল করার সুযোগ পাবেন। এ অভিযোগ ইসিতে এলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কয়েকটি পৌরসভায় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একাধিক প্রার্থী দেয়া হয়েছে তারপরও তাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়নি। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার শাহনেওয়াজ বলেন, এ বিষয়ে আমাদের কাছে এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। কোনো দল যদি একাধিক প্রার্থী দেয় অবশ্যই তাদের প্রার্থিতা বাতিল হবে। সিনিয়র কর্মকর্তার অভাবে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে দাবি করে মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ বলেন, সিনিয়র কর্মকর্তার সংখ্যা কম। আবার টোটাল অফিসারেরও স্বল্পতা রয়েছে। এছাড়া, ৮৫ জন কর্মকর্তার নামে মামলা চলছে। কাজেই আমরা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দিয়ে নির্বাচন করছি, এ ধরনের অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি বলেন,  পৌরসভা নির্বাচন এবার প্রথম হচ্ছে না। এবারই প্রথম নির্বাচনে ইসির ৬১ জন কর্মকর্তাকে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আগের নির্বাচনগুলোতে ইসির কর্মকর্তাকে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়নি। তাছাড়া প্রত্যেকটি পৌরসভায় ইসির কর্মকর্তাদের সহকারী রিটার্নিং হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নির্বাচন প্রভাবিত হবে কিনা জানতে চাইলে শাহনেওয়াজ বলেন, অতীতে সরকারে লোক দিয়ে অর্থাৎ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দিয়ে নির্বাচন করানো হয়েছে। সেসব নির্বাচন সুন্দর হয়েছে। সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরদের প্রতীকের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতীক দেয়া হয় কাউকে চিহ্নিত করার জন্য কাউকে আঘাত করার বা অসম্মান করার জন্য নয়। তবে এতে যদি নারী প্রার্থীরা ক্ষুব্ধ হন, এগুলো পরবর্তীতে দেখবো। সময় স্বল্পতার ও ব্যস্ততার কারণে প্রতীকগুলো নিয়ে আমরা বসতে পারিনি। এবারের পৌরসভা নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলা আসনের কাউন্সিলর পদের প্রার্থীদের আঙ্গুর, গ্যাসের চুলা, চকোলেট, চুড়ি, পুতুল, ফ্রক, ভ্যানিটি ব্যাগ, মৌমাছি ও হারমোনিয়াম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

No comments:

Post a Comment