রাতের অন্ধকার। একটা ধু-ধু প্রান্তর। তার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক
গণিকালয়, দাউ-দাউ করে জ্বলছে। আর তার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে হাসিমুখে
ভিতরে ঢুকে গেল বারবণিতারা। বন্ধ করে দিল দরজা। কী তৈরি হল? দেশের মধ্যে
আর একখানি দেশ? দেশভাগের অকথ্য অত্যাচার এবং ভয়াবহতার মধ্যে দাঁড়িয়েও তৈরি
হওয়া অখ- এক ভূমি? যে-ভূমিতে মৃত্যু নিশ্চিত, কিন্তু লুকিয়ে আছে স্বাধীনতা
প্রাপ্তির দুর্দান্ত এক অহংকার? এটাই তো চেয়েছিল কোঠার মালকিন বেগম জান!
রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে ১১ জন বারবণিতা তৈরি করল বিদ্রোহ। সিনেমার
পর্দাজুড়ে সেই বিদ্রোহ ঘনীভূত হলো প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে। কিন্তু সৃজিত
মুখোপাধ্যায়ের এই ছবির গল্প এবং সংলাপ শুনতে যতটা ভাল, দেখতেও ততটাই ভাল
কি? প্রশ্নটা এখানেই। সেই প্রশ্ন যতটা না ‘আমরা ঠিক কতটা স্বাধীনতা
পেয়েছি’, তার চেয়েও বেশি, সৃজিত দেশভাগের যন্ত্রণা ঠিক কতটা সঞ্চারিত করতে
পারলেন দর্শকদের মধ্যে! দুর্ভাগ্য, এবার সৃজিতকে ফুল মার্কস দেয়া যাচ্ছে
না। প্রথমেই বলে নেয়া ভাল, এই ছবির চিত্রগ্রহণ এবং সম্পাদনা অনবদ্য।
সেগুলোর জন্যই ‘রাজকাহিনী’ দৃষ্টিনন্দন হয়েছে। দাঙ্গার দৃশ্যগুলিকে সৃজিত
যথাযথভাবে বেঁধেছেন। কোঠাতে এসে ঘর খালি করে দেওয়ার নোটিস, শাশ্বত-কৌশিকের
দ্বন্দ্বের দৃশ্যগুলো যথেষ্ট ভাল। আর এই ভাল-তে পরিচালককে সাহায্য করেছে
অভিনেতাদের নিজেদের নিংড়ে দেয়া অভিনয়। কিন্তু ছবির ভাল যা কিছু, তার
প্রশংসা যেমন পরিচালকের, সমালোচনার দায়ও তো তাঁরই। প্রথমত, কোনও চরিত্রই
সেভাবে (বেগম জান ছাড়া) জায়গা পায়নি, যেখানে দর্শক তাদের সঙ্গে একাত্ম হতে
পারেন। ফলে ছবির শেষে এসেও হয়তো সেইভাবে মনোঃকষ্ট জন্মায় না। আবিরের
চরিত্রটিকে অহেতুক জটিল করার কী অর্থ বোঝা গেল না, এমনকী, ঋতুপর্ণা এবং
আবিরের দৃশ্যটিকে রশোমনের স্টাইলে করতে গিয়ে ছবির সাসপেন্স গোড়াতেই নষ্ট
হয়েছে বলে মনে হয়েছে। পারফেকশনিস্ট হিসেবে পরিচালকের সুনাম থাকলেও, কেন যে
ঋতুপর্ণার কণ্ঠস্বর ওরকম বিকৃত করা হল, জানা নেই! তিনি তো সেই গলায় গান
করেন না! ফলে ঋতুপর্ণা নিজের ১০০ শতাংশ দিয়ে চেষ্টা করলেও অর্ধেক সংলাপ
বোঝা যায়নি! এমনকী, শেষের দিকে কাঞ্চনের বমির দৃশ্যটাও বেশ বাড়াবাড়ি বলেই
মনে হয়েছে। কবীরের চরিত্রে যিশু এককথায় অনবদ্য। অনেকদিন পরে দর্শক এমন
ঘেন্না করার মতো চরিত্র পেলেন। কিন্তু শুধু এগারোজন বারবণিতাকে উচ্ছেদ করতে
শতাধিক লোকের দলবল এনে গোলাবর্ষণটা ‘মশা মারতে কামান দাগার মতো’ই ঠেকল
নাকি? কোঠার ভিতর থেকেও তো সকলে আকাশের দিকেই গুলি ছুড়ছিল! এটুকু
বাস্তববাদিতা তো দর্শক সৃজিতের ছবি থেকে আশা করতেই পারেন। এই অতিনাটকীয়
ত্রুটিগুলি সৃজিতের ‘রাজকাহিনী’-কে কিছুটা মাঝারি মানেরই করেছে। শিরশিরানি
জাগানো কিছু দৃশ্য ক্ষণিকের খারাপ লাগা হয়েই থেকে গেল। ফলে সৃজিতের
ভাবনাটা বড় হলেও তার প্রতিফলন পরদায় ফুটল না! কাঁটাতারের বেড়া বাঁচাতে
‘জহরব্রত’ পালন করা যথেষ্ট কঠিন কাজ, কিন্তু সেই আত্মাহুতি যদি মানুষের মনে
আগুন জ্বালাতে না পারে, তা হলে তাকে ‘রাজকীয়’ বলা যায় কি?
সূত্র: দেশ
সূত্র: দেশ

No comments:
Post a Comment