Tuesday, December 8, 2015

বিদ্রোহীরা এখনও মাঠে

ভোটের মাঠ ছাড়েননি আওয়ামী লীগ-বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা। মেয়র পদে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের একটি অংশের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তবে বড় অংশটি এখনও রয়ে গেছে ময়দানে । অনঢ় অবস্থানে রয়েছেন তারা। বিএনপির প্রায় শতাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী এখনও রয়ে গেছেন নির্বাচনে। যদিও দলটির নেতারা আশা করছেন, বিদ্রোহীরা সরে যাবেন।দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গেলে বহিষ্কারের হুমকি দেয়া হলেও মাঠে অনড় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। কেন্দ্রীয় নেতাদের আহ্বান, অনুরোধ, আর হুঁশিয়ারি কিছুই পরোয়া করছেন না তারা। এদিকে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীদের সঙ্গে আলাপ আলোচনার দায়িত্বপ্রাপ্ত দলটির শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, তাদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নির্বাচনী মাঠ থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। দায়িত্বশীল নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী গত দু’দিনে বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতা শুরু করার পর ইতিমধ্যে কয়েকজন প্রার্থী নির্বাচন থেকে তাদের সরিয়েও নিয়েছেন। ১৩ই ডিসেম্বরের মধ্যে বাকিরাও  নিজেদের প্রত্যাহার করে নেবেন বলে আশা তাদের। দলীয় সূত্র ও জেলা পৌরসভা পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্তত অর্ধশত পৌরসভায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা সরবেই নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। সদম্ভেই তারা নিজ নিজ এলাকায় নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এদের অনেকেই বলছেন, আওয়ামী লীগ ঘোষিত ১৩ই ডিসেম্বরের মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আলটিমেটামের পরও তারা তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন না। যত বাধাই আসুক, যে যাই বলুক করুক তারা নির্বাচনী মাঠে থাকবেন। এমন পরিস্থিতিতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। কিছু কিছু পৌরসভায় বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় দল মনোনীত প্রার্থীর বিজয়ী হওয়ার বিষয়ে অশনি সঙ্কেত পাচ্ছেন তারা। তবে, নেতারা আশা করছেন দলের শৃঙ্খলার স্বার্থে দু’-একদিনের মধ্যে অথবা ১৩ই ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের নাম প্রত্যাহার করে নেবেন। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, স্থানীয়ভাবে তাদের (বিদ্রোহী) সঙ্গে যেমন আলোচনা হচ্ছে তেমনি কেন্দ্রীয়ভাবেও যোগযোগ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেকেই নাম প্রত্যাহার শুরু করেছেন। আশা করি দু’-একদিনের মধ্যেই বাকিরাও নিজেদের প্রত্যাহার করে নেবেন। আর যারা তা করবেন না তাদের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গে অভিযোগে ব্যবস্থা নেয়া হবে।   এদিকে বেশকিছু পৌরসভায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে ও স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু না হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনই কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন তারা। গোপালগঞ্জ পৌরসভার বর্তমান মেয়র ও জেলা শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক রেজাউল হক সিকদার রাজু এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক মুশফিকুর রহমান লিটন বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। আওয়ামী লীগের ঘাটি বলে পরিচিত এ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হলেন- উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি কাজী লিয়াকত আলী লেকু। স্বতন্ত্র প্রার্থী মুশফিকুর রহমান লিটন মানবজমিনকে বলেন, নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ আমার সঙ্গে এখনো যোগযোগ করেননি। আর যোগাযোগ করলেও কোন কাজ হবে না। এখানে ৯০ ভাগ মানুষ আমার সঙ্গে আছে। যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয় তাহলে আমি স্বতন্ত্র হয়েই ইনশাআল্লাহ জয়লাভ করবো। এদিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ফোরকান বিশ্বাস বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা লীগের সভাপতি শেখ আহাম্মদ মীর্জা।  কিশোরগঞ্জের সাতটি পৌরসভার মধ্যে তিনটিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা অনানুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারনায় নেমে পড়েছেন। জেলার হোসেনপুর পৌরসভাতেই আওয়ামী লীগের তিনজন বিদ্রোহী প্রার্থী এখন পর্যন্ত নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। এছাড়া করিমগঞ্জ, ও বাজিতপুরেও একজন করে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা কেন্দ্র থেকে মনোনীত প্রার্থীদের অস্বস্তিতে ফেলেছেন। ফলে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে দুশ্চিন্তা কাজ করছে জেলা ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মনে। করিমগঞ্জ পৌরসভায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী কামরুল ইসলাম চৌধুরী মামুনের বিপরীতে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক ও বর্তমান মেয়র হাজি আবদুল কাইয়ুম ইতিমধ্যে নির্বাচনী মাঠ সরগরম করে তুলছেন। জানতে চাইলে হাজি আবদুল কাইয়ুম মানবজমিনকে বলেন, আমি মনোনয়ন না পাওয়ায় হাজার হাজার মানুষ কষ্ট পেয়েছে। তাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য আমি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে থাকবেন জানিয়ে এই মেয়র প্রার্থী বলেন, ইতিমধ্যে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা আমার সঙ্গে যোগযোগ করেছেন। কিন্তু নির্বাচনে আমি লড়বোই। জনগণ যদি তাদের ভোট সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে প্রয়োগ করতে পারে তাহলে জয়ের ক্ষেত্রে আমি শতভাগ আশাবাদী। আর যদি দল আমার বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় এবং আমি যদি নির্বাচিত হই তাহলে দল আবার আমাকে গ্রহণ করবে বলে আমার বিশ্বাস। এদিকে জেলার বাজিতপুর পৌরসভায় কেন্দ্রের মনোনীত প্রার্থী আনোয়ার হোসেন আশরাফের বিপরীতে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মো. শওকত আকবরও নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। হোসেনপুর পৌরসভায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী আব্দুল কাইয়ুম খোকন। এখানে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী হয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করবেন আওয়ামী লীগ সমর্থক ও ঠিকাদার সৈয়দ হোসেন হাছু, সাবেক ভিপি রাইসুল হাসান কেনেডি ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবদুুল কাদরি স্বপন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী ও শীর্ষ নেতাদের হস্তক্ষেপের পরও বিদ্রোহী প্রার্থীরা তাদের সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছেন। 
নড়াইলের কালিয়া পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন কালিয়া থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক  ওয়াহিদুজ্জামান হীরা। কিন্তু তার বিপরীতে বিদ্রোহী হিসেবে দুশ্চিন্তার কারণ হয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও বর্তমান মেয়র এমদাদুল হক টুলু। কোনভাবেই নির্বাচনী তিনি মানবজমিনকে বলেন, কেন্দ্র থেকে কেউ কোন আলোচনা আমার সঙ্গে করেনি। আর সেই আশাও আমি করিনা। কারণ নির্বাচন আমি করবোই। আমিতো ইতিমধ্যে সতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জনগণের কাছে ভোট ও দোয়া চেয়ে বেড়াচ্ছি। বিদ্রোহী হলে বহিষ্কারসহ শাস্তির খড়গ নেমে আসতে পারে, এমন মন্তব্যে প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, এতে যদি আমার বিরুদ্ধে দল কোন সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হয় তাতেও আমার আপত্তি নেই। 
শরীয়তপুরের চারটি পৌরসভায় এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ৮ জন বিদ্রাহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার বিষয়ে অনড় রয়েছেন। ভেদরগঞ্জ পৌরসভায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ও বর্তমান মেয়র আবদুল মান্নান হাওলাদার। এই পৌরসভায় বিদোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা আবুল বাশার চোকদার। মানবজিমনকে তিনি বলেন, যে যেখানে যত কথাই বলুক, যাই করুক আমি নির্বাচনী মাঠে আছি এবং শেষ পর্যন্ত থাকবো। তিনি বলেন, জনগণের কথায় আমি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছি। এখন জনগণকে অগ্রাহ্য করে আমি যদি নির্বচনী মাঠ থেকে সরে দাঁড়াই তাহলে সেই জনগণ আমাকে পিটিয়ে মেরে ফেলবে। জেলার ডামুড্যা পৌরসভায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিপরীতে বিদ্রোহী হিসেবে স্বতন্ত্র পরিচয়ে নির্বাচনের জন্য প্রচার চালাচ্ছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধরাণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র রেজাউল করিম রেজা। জাজিরা পৌরসভায় দল মনোনীত প্রার্থী ইউনুস বেপারীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা রফিকুল ইসলাম ওরফে আক্কাস মুন্সী, আবুল খায়ের ফকির, উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু ফকির এবং আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে পরিচিত আলাউদ্দিন ফকির। নড়িয়া পৌরসভায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বর্তমান মেয়র হায়দার আলী মনোনয়নপত্র জমা দিলেও আওয়ামী লীগ নেতা ও বর্তমান পৌর কমিশনার শহিদুল ইসলাম বাবু রাঢ়ি এবং ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও ভিপি সিরাজুল ইসলাম চুন্নু।  এদিকে চট্টগ্রামের ১০ পৌরসভার ৬টিতে একক প্রার্থী দিলেও অন্তত ৪টিতে শক্তিশালী বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বহিষ্কার হলেও দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়েই পৌর  নির্বাচন করবেন বলে মানবজমিন-এর সঙ্গে আলাপকালে জানিয়েছেন তারা। চট্টগ্রামের বিভিন্ন পৌরসভায় দলের নাম সর্বস্ব আরও একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলেও তারা শেষ মুহূর্তে নির্বাচন থেকে সরে দাড়াতে পারেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। রাউজানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে দেবাশীষ পালিতকে। কিন্তু এখানে আওয়ামী লীগ থেকে বিদ্রোহী প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ও আনোয়ারুল ইসলাম। এবার স্থানীয় এমপি ফজলে করিমের সমর্থন পেয়েও দল থেকে মনোনয়ন পাননি সাইফুল ইসলাম চৌধুরীর পিতা শফিকুল ইসলাম চৌধুরী। তাই পুত্রকে নির্বাচনী মাঠে নামিয়েছেন তিনি। জানতে চাইলে সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমি নির্বাচন করবো। সরে দাঁড়ানোর কোন ইচ্ছে আমার নেই। শেষ পর্যন্ত দল আমাকে মূল্যায়ন করবে সে পর্যন্ত অপেক্ষা করছি। রাঙ্গুনিয়া পৌরসভায় দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক শাহজাহান সিকদার। কিন্তু দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে তার বিপরীতে নির্বাচনে লড়বেন বলে জানিয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, মনোনয়ন প্রত্যাহারের বিষয়ে এখনো কারও সঙ্গে কোন কথা হয়নি। তবে, আমি নির্বাচন করবো। অন্যদিকে সীতাকুণ্ডে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রথমে শফিউল আলমকে মনোনয়ন দেয়া হলেও একদিন পরেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বদিউল আলমকে মনোনয়ন দেয়া হয়। এতেই বিদ্রোহী হয়ে পড়েন শফিউল আলম। তিনি কিছুতেই মনোনয়ন প্রত্যাহার করবেন না বলে ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন। শফিউল আলম বলেন, আমি জনগণের সঙ্গে আছি। দল আমাকে সমর্থন দিচ্ছে। তাই জয় আমার সুনিশ্চিত। নির্বাচন করে সবার প্রত্যাশা পূরণ করবো। তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ থেকে অনেকেই নিজেদের দলীয় প্রার্থী বলে পরিচয় দিচ্ছে। তারা এখনো কেন্দ্রের কোন কাগজপত্র হাতে পাওয়ার কথা জানাতে পারেনি।
বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে উদ্বিগ্ন নয় বিএনপি
আসন্ন পৌর নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর পাশাপাশি প্রায় শতাধিক পৌরসভায় রয়েছে দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তারা। মনোনয়ন বৈধ হওয়ায় ছুটে বেড়াচ্ছেন নির্বাচনের মাঠে। সবচেয়ে বেশি বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন রাজশাহী ও ময়মনসিংহে। কোথাও কোথাও দলের মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীরা পাশে পাচ্ছেন না স্থানীয় নেতৃত্বকে। সেখানে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষেই যাচ্ছে তৃণমূলের সমর্থন। এছাড়া দলের নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় সরাসরি প্রার্থী দিতে পারেনি ২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু জোটের বাইরে গিয়ে অন্তত ২৯টি পৌরসভায় স্বতন্ত্র প্রার্থী দিয়েছে দলটি। তারপরও দল এবং জোটের বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে চিন্তিত বা উদ্বিগ্ন নয় বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং মনোনয়ন প্রত্যয়নকারী ও যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহানসহ সংশ্লিষ্ট নেতারা এমন তথ্য জানিয়েছেন। বিএনপির পৌর নির্বাচন সমন্বয় কমিটি সূত্রে জানা গেছে, মামলা বা অন্য কোন কারণে দলীয় মনোনয়ন দেয়া প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হলেও যাতে নির্বাচনের মাঠে বিএনপির প্রার্থী থাকে, সে জন্যই একাধিক প্রার্থী মাঠে রাখার কৌশল নেয়া হয়েছিল। ‘ডামি’ প্রার্থী হিসেবে অন্তত ৩০টি পৌরসভায় বিকল্পপ্রার্থীকে মনোনয়ন জমা দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল কেন্দ্রের তরফে। ওইসব পৌরসভায় মূলপ্রার্থীর মনোনয়ন চূড়ান্তভাবে বাতিল হলে স্বতন্ত্র হিসেবে ডামি প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছিল। জেলা নেতৃত্বের কাছে একটি চিঠিও দিয়েছেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ফলে এখন তারা দলের নির্দেশনা পেলেই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেবেন। এর বাইরে যারা বিদ্রোহী থাকবেন তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। বিএনপি নেতারা বিশ্বাস করেন, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাবে না বিদ্রোহী প্রার্থীরা। এক্ষেত্রে সমঝোতার পথে হাঁটবে বিএনপি। বিএনপির নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদ্রোহী প্রার্থীর চেয়ে এখন মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীদের নিয়েই বেশি ভাবছেন তারা। পৌর মেয়র পদে বিএনপি মনোনীত ১২ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন রিটার্নিং অফিসার। যার সবকটিই একেবারে বানানো বা ঠুনকো অজুহাতে। যাদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে তারা প্রত্যেকেই আপিল করেছেন। তাদের বেশির ভাগই প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই মুহূর্তে বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জই হচ্ছে, বাতিল হওয়া প্রার্থীদের প্রার্থিতা নিশ্চিত করা। কারণ এমন কিছু পৌরসভায় প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে যেখানে দলের বিকল্প বা বিদ্রোহী প্রার্থীও নেই। মাদারীপুরের কালকিনি পৌরসভায় বিএনপিসহ কোন শরিক দলের প্রার্থীও নেই। তবে বিএনপি নেতারা মনে করেন, আসন্ন পৌর নির্বাচনে প্রাথমিকভাবে একটি দুশ্চিন্তা কেটে গেছে। আশঙ্কা ছিল, দল মনোনীত প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের সংখ্যা আরও বেশি হবে। কারণ নির্বাচন কমিশনের নতুন নিয়ম এবং সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি মিলিয়ে তেমন আশঙ্কাই তৈরি হয়েছিল বিএনপিতে। তবে বাতিল হওয়ার সংখ্যা সে অনুপাতে কম। আশঙ্কার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কিছু পৌরসভায় বিকল্পপ্রার্থীও রাখা হয়েছিল। দল মনোনীত প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ হওয়ায় বিকল্পপ্রার্থী হিসেবে দলের বার্তা পাওয়া নেতারা এখন মনোনয়নপত্র প্রত্যহার করে নেবেন। সামনের দিনের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- সমস্ত প্রতিকূলতাকে ডিঙ্গিয়ে বেশির ভাগ পৌরসভায় দল মনোনীত প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করার মাধ্যমে নিজেদের জনপ্রিয়তার প্রমাণ দেয়া।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলের অন্যতম পৌর নির্বাচন সমন্বয়ক গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আমাদের বিশ্বাস বেশির ভাগ পৌরসভায় আমাদের দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা দলীয় সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেবেন। এ ব্যাপারে আমরা আলোচনা করছি। যেখানে যার সঙ্গেই আলাপ হচ্ছে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি। একই বিষয়ে দলের যুগ্ম মহাসচিব ও পৌর নির্বাচনে দলের মনোনয়ন প্রত্যয়নকারী মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে চিন্তিত বা উদ্বিগ্ন নয় বিএনপি। কারণ আসন্ন পৌর নির্বাচনে দলের পক্ষ থেকে নানামুখী বিচার-বিশ্লেষণ করে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকা প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। যারা মনোনয়ন পাননি তারা কোনভাবেই অযোগ্য নন। মনোনীত প্রার্থীরা বাইরে দলের যেসব নেতা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বিএনপির রাজনীতিতে তাদের প্রত্যেকেরই কম-বেশি অবদান রয়েছে। এ বিষয়টি দলের শীর্ষ নেতৃত্বও ওয়াকিবহাল। তিনি বলেন, বিদ্রোহী হিসেবে মনোনয়ন জমা দেয়া বিএনপি নেতাদের অনেকের মনে হয়তো ক্ষোভ-দুঃখ আছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের কাছে বার্তা দেয়া হয়েছে। আমরা তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করব। বিদ্রোহী প্রার্থী যারা হয়েছেন তারা প্রত্যেকেই কিন্তু জাতীয়তাবাদী আদর্শের সুতোয় ঐক্যবদ্ধ। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব বিশ্বাস করে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং চেয়ারপারসনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে তারা প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবেন। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যয়নকারী বলেন, আমাদের বিশ্বাস বহিষ্কার বা কোন ধরনের সাংগঠনিক শাস্তির সিদ্ধান্ত নিতে হবে না। ফলে আমরা এ বিষয়ে চিন্তিত বা উদ্বিগ্ন নই।
আসন্ন পৌরনির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা হলেন- সিলেট বিভাগের: হবিগঞ্জে আমিনুর রশিদ এমরান, ইসলাম তরফদার তনু; শায়েস্তাগঞ্জে মো. আবদুল মজিদ; চট্টগ্রাম বিভাগের: কুমিল্লার হোমনায় মো. হানিফ মিয়া, আলমগীর সরকার; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় জয়নাল আবেদীন আবদু, চাঁদপুরের কচুয়ায় মো. এমএম সফিকুল ইসলাম রুবেল, গাজী শাহীন, জহির মো. আতাউর রহমান শামীম; চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে মো. মঞ্জিল হোসেন ও তার ভাই ছাত্রদল নেতা মো. ইমান হোসেন; ঢাকা বিভাগের: কিশোরগঞ্জ সদরে হাজি ইসরাইল মিয়া; হোসেনপুরে রতন মৃধা; নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবোয় মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম চৌধুরী; সোনারগাঁও পৌরসভায় সাইদুর রহমান মোল্লা; নরসিংদীর মনোহরদীতে আবদুল খালেক; ময়মনসিংহ বিভাগের: ময়মনসিংহের ভালুকায় আলহাজ হাতেম আলী খান; আলহাজ মফিজ উদ্দিন সরকার, আলহাজ উমর ফারুক মাস্টার; নেত্রকোনার দুর্গাপুরে মো. আতাউর রহমান ফরিদ; ঈশ্বরগঞ্জে ফিরোজ আহম্মেদ ভুলু, শামসুল হাকিম বকুল; মুক্তাগাছায় মুর্শিদুজ্জামান খান সাইফুল; খুলনা বিভাগের: কুষ্টিয়া সদরে বশিরুল আলম চাঁদ, যশোরের অভয়নগরে রবিউল হোসেন ও মশিয়ার রহমান; যশোরের কেশবপুরে আলমগীর কবির; রাজশাহী বিভাগ: নাটোরের বড়াইগ্রামে অ্যাডভোকেট শরিফুল হক মুক্তা; সিংড়ায় দাউদার মাহমুদ, এমএ মালেক রানা; গোপালপুরে আবদুল্লাহ আল মামুন কচি, মঞ্জুরুল ইসলাম বিমল, পাবনার সুজানগরে কামাল হোসেন বিশ্বাস; সাঁথিয়ায় সাইফুল ইসলাম ও আশিক ইকবাল রাসেল; জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে আলমগীর চৌধুরী বাদশা; বগুড়ার নন্দিগ্রামে একেএম ফজলুল হক কাশেম; ধুনটে এজিএম বাদশা ও আল আমিন তরফদার, সারিয়াকান্দিতে আবদুল হামিদ সরদার ও আবদুর রশীদ ফরাজি, গাবতলীতে আবদুল জলিল পাইকার, রাজশাহীর চারঘাটে কায়েম উদ্দিন, গোলাম কিবরিয়া বিপ্লব, নওহাটায় আফজাল হোসেন, রফিকুল ইসলাম রফিক, মুন্ডুমালায় মোজাম্মেল হক, আহসানুল হক স্বপন ও অধ্যাপক লুৎফর রহমান, আড়ানীতে মতিউর রহমান মতি ও মাসুদ পারভেজ কলিন্স, দুর্গাপুরে হাসানুজ্জামান সান্টু, পুঠিয়ায় হাসিবুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, জিএম হিরা বাচ্চু, তানোরে বর্তমান মেয়র ফিরোজ সরকার, ভবানীগঞ্জে শাহীনুর রহমান শাহীন, কাটাখালীতে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম ও গোদাগাড়ীতে গোলাম কিবরিয়া রুলু, মনিরুল ইসলাম বাবু; রংপুর বিভাগ: দিনাজপুরের বীরগঞ্জে আসাদুল ইসলাম দুলাল; বিরামপুরে হুমায়ুন কবির এবং বরিশাল বিভাগের: বরগুনার বেতাগীতে কামরুজ্জামান মিলন। এদিকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে চাঁপাইনবাবগঞ্জের চার পৌরসভায় প্রার্থী হয়েছেন জামায়াত সমর্থিত ৫ স্বতন্ত্র প্রার্থী।

No comments:

Post a Comment