জাসদ নেতা কাজী আরেফসহ ৫ নেতা হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ৩ আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে গতকাল রাত ১১টার পর পর্যায়ক্রমে ৩ ঘাতক আনোয়ার হোসেন, হাবিবুর রহমান হাবি ও রাশেদুল ইসলাম ঝন্টুকে ফাঁসির মঞ্চে উঠিয়ে রশিতে ঝুলিয়ে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। সে সময় জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সিভিল সার্জনের প্রতিনিধিসহ কারাগারের সব দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা মঞ্চের পাশে উপস্থিত ছিলেন। ফাঁসির আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাত ১২টার পর পরই জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কারাগার ত্যাগ করেন। এরপর লাশের গোসল ও কাফন সম্পন্ন করে রাতেই লাশগুলো কারা ফটকের প্রধান গেট খুলে কারাগারের বাইরে আনা হয়। সে সময় সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও সদস্যরা কড়া প্রহরায় ছিলেন। এর কিছুক্ষণ পর লাশ তিনটি পুলিশ ও র্যাবের প্রহরায় তিনটি অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। পরে লাশবাহী তিনটি অ্যাম্বুলেন্স রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে এগিয়ে চলে কুষ্টিয়ার দিকে। এর আগে গতকাল বিকালে হাবি ও ঝন্টুর স্বজনরা কারাগারে আসামিদের সঙ্গে শেষ বারের মতো দেখা করেন। তারা প্রায় ১ ঘণ্টার বেশি সময় কারাগারের ভেতর ছিলেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার দিকে তারা আসামিদের সঙ্গে শেষ বারের মতো কথাবার্তা বলে প্রধান কারা ফটকের বাইরে বেরিয়ে আসেন। এ সময় ঝন্টুর ভাইপো ইদ্রিস আলী চিৎকার করে বলেন, তার চাচা নিরপরাধ। সে জাসদের একজন কর্মী ও সমর্থক। কাজী আরেফের জনসভায় সে বক্তৃতা শুনতে গিয়েছিল। সে দিনমজুরের কাজ করতো। প্রকৃত খুনিদের রক্ষা করতে গিয়ে পুলিশ ও দলের নেতাকর্মীরা তাকেসহ অপর আসামিদের ফাঁসিয়ে দিয়েছে। এটা অন্যায়। আমরা এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করছি। আল্লাহর কাছে বিচার দিয়ে যাচ্ছি। তিনিই সেরা বিচারক। এর পরপরই পুলিশ তাদেরকে তাড়িয়ে ইজিবাইকে তুলে দেন। চোখের পানি মুছতে মুছতে স্বজনরা কারা ফটক ত্যাগ করেন। এর পর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে কারাগারের ভেতর প্রবেশ করেন কোতোয়ালী থানার ওসি শেখ আক্কাস আলীসহ তিনজন পুলিশ কর্মকর্তা। এর কিছুক্ষণ করে জেল মসজিদের ইমাম রমজান আলীকে সঙ্গে নিয়ে একজন কারারক্ষী প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। কারাসূত্রে জানা যায়, ইমাম রমজান আলী ৩ ফাঁসির আসামিকে অজু করিয়ে এশার নামাজ আদায় করান। এরপর তিনি তাদেরকে তওবা পাঠ করান। রাত ৮টার দিকে কারা কর্তৃপক্ষ ৩ আসামিকে খাবার দিলেও তারা তা গ্রহণ করেননি। সূত্রটি জানায় সন্ধ্যার পর থেকে ৩ আসামিকে বিমর্ষ দেখাচ্ছে। হাবিকে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে দেখেছে পাশের লোকেরা। সব রকমের আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাত ১১টার পর ফাঁসির কাস্টডি থেকে তিনজনকে পর্যায়ক্রমে বের করে আনে কারা রক্ষীরা। পরে তাদেরকে পর্যায়ক্রমে ফাঁসির মঞ্চে ওঠানো হয়। তার পর সিরিয়ালে তাদের ফাঁসি কার্যকর করে কারাকর্তৃপক্ষ। অবসান ঘটে একটি রক্তাক্ত ইতিহাসের একাংশের। ১৯৯৯ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার কালীদাসপুর প্রাইমারি স্কুল মাঠে দলীয় জনসভার মঞ্চে ব্রাশ ফায়ার চালিয়ে জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী আরেফ আহম্মেদসহ ৫ জাসদ নেতাকে হত্যা করে এসব খুনিরা। নিহত অপর ৪ জন হলেন কুষ্টিয়া জেলা জাসদের সভাপতি লোকমান হোসেন, সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. ইয়াকুব আলী, স্থানীয় জাসদ নেতা ইসরাইল হোসেন ও সমশের মণ্ডল। প্রকাশ্যে একজন জাতীয় বীরকে জনসভার মধ্যে ব্রাশ ফায়ারে হত্যার সেই ঘটনাটি দেশে-বিদেশে ঝড় তুলেছিল। দৈনিক মানবজমিনসহ দেশের প্রিন্ট মিডিয়াগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সেসব সংবাদ প্রকাশ করেছিল। ঘটনার পর দিন ১৭ই ফেব্রুয়ারি দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইছাহক আলী বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ ১৯৯৯ সালের ২৫শে এপ্রিল কাজী আরেফ হত্যা মামলার প্রথম চার্জশিট দাখিল করে। তাতে ২১ জনকে আসামি করা হয়। এই হত্যা মামলার বর্ধিত তদন্তের সম্পূরক চার্জশিট আকস্মিকভাবে আদালতে দাখিল করে সিআইডি। সম্পূরক চার্জশিটে বলা হয় যে, নুরুজ্জামান নাল্টু ওরফে লাল্টু এবং বশিরউদ্দিন কচি হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী। সম্পূরক চার্জশিটে অতিরিক্ত ৮ জনকে আসামি করা হয়। ফলে বর্ধিত চার্জশিটে মোট আসামির সংখ্যা ছিল ২৯ জন ও সাক্ষী ৫৭ জন। চার্জশিট অনুযায়ী যারা সরাসরি গুলিবর্ষণ করে তারা হলো ঝন্টু, এলাচ, আনোয়ার, বাশার, জাহান, টিক্কা, হাবি, ওলি, আকুব্বর ও লাবলু। এদের বিরুদ্ধে ৩২৬/৩০৭/৩০২/১২০ (ঘ)/৩৪ ধারার দণ্ডবিধিতে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। আর হত্যার পরিকল্পনাকারী হিসেবে নুরুজ্জামান লাল্টু, বশির উদ্দিন কচি, মান্নান মোল্লা, বাচ্চু মোল্লা, পচা মোল্যা, মোহিতসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ১২০ (ঘ)/৩৪ ধারার দণ্ডবিধিতে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছিল। ২৫শে এপ্রিল কাজী আরেফ হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিলের পর ৩ মে চার্জশিটভুক্ত এলাচ মণ্ডল গ্রেপ্তার হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালের ২৬শে মে গারেস ও ১ জুলাই জালাল গ্রেপ্তার হয়। ২৩শে জুলাই কুষ্টিয়ার পুলিশ লাইনে অস্ত্র জমা দিয়ে চার্জশিটভুক্ত ১১ জন আসামি আত্মসমর্পণ করে। এরা হলো মান্নান মোল্ল্যা, আলফাজ, মাহতাব, বশিরউদ্দিন কচি, মজিদ, ফরো, মোহিত, আজগর, রফা, সহিদ ও তছির। ২৯শে জুলাই এই মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি কয়রাডাঙ্গার লান্টু, ঝন্টু ও আনোয়ার চুয়াডাঙ্গা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এ নিয়ে মোট ১৭ জন পুলিশি হেফাজতে আসে। চার্জশিটভুক্ত বাকি চারজন হাবুল মোল্ল্যা, নূরুল মিলিটারি, রওশন ও বারেক তখনো আত্মসমর্পণ করেনি। ঢাকায় জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে লান্টু ও বশিরউদ্দিন কচিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সিআইডি ঝন্টু, আনোয়ারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। মামলার নথিপত্র ১৯৯৯ সালে ৭ ডিসেম্বর নিম্ন আদালত থেকে কুষ্টিয়ার জেলা ও জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়। হত্যাকাণ্ডের ৫ বছর পর ২০০৪ সালের ৩০শে আগস্ট কুষ্টিয়া জেলা জজ আদালত এ হত্যা মামলায় ১০ জনের ফাঁসি ও ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেন। পরে আসামিরা হাইকোর্টে আপিল করলে দীর্ঘদিন মামলাটি ফাইল বন্দি ছিল। শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালের ৫ই আগস্ট ১ জন ফাঁসির আসামি ও ১২ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত’র শাস্তি মওকুফ করে রায় দেন উচ্চ আদালত। মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত ৪ আসামি তখন পুলিশি হেফাজতে ছিলেন। বাকি ৫ জন অদ্যাবধি পলাতক। উচ্চ আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে সরকার পক্ষ সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলে ২০১১ সালের ৭ আগস্ট হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রেখে রায় দেন এ্যাপিলেট ডিভিশন। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ আদেশ দেন। রিভিউ আবেদনের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মমতাজ উদ্দিন ফকির এবং আসামি পক্ষে অ্যাড. খন্দকার মাহবুব হোসেন। এরপর মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত ৪ আসামির মধ্যে ইলিয়াছ নামের একজন আসামি অসুস্থতাজনিত কারণে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারেই মৃত্যুবরণ করেন। বাকি ৩ আসামি রিভিউ আবেদন করলে ২০১৪-এর ১৯ নভেম্বর তা খারিজ করে দেন সুপ্রিম কোর্ট। এর পর শুরু হয় ক্ষণ গণনা। একপর্যায়ে উচ্চ আদালতের রায়সহ ফাঁসি কার্যকরের সব রকমের কাগজপত্র পৌঁছায় যশোর কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে। সব রকমের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে গতকাল দিনগত রাত ১১টার পর পর্যায়ক্রমে রশিতে ঝুলিয়ে ৩ জনের ফাঁসি কার্যকর করে যশোর কারা কর্তৃপক্ষ।
Friday, January 8, 2016
৩ আসামির ফাঁসি by নূর ইসলাম
সূত্র ও লেখক @Source and Writer:
Exclusive,
আইন আদালত ও বিচার,
মানবজমিন,
যশোর
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment