মন্ত্রীর ডিও লেটারে তদবির * কেবিন ক্রু ১০-১৫ লাখ, ট্রাফিক সহকারী পদে ৫ লাখ টাকা * বিজ্ঞপ্তিতে নিয়োগবিধি অনুসরণ করা হয়নি
বাংলাদেশ
বিমানের ৩ শাখায় নিয়োগ নিয়ে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কেবিন ক্রু,
জুনিয়র ট্রাফিক সহকারী নিয়োগ ঘিরে সক্রিয় একটি সিন্ডিকেট। কেবিন ক্রু পদে
নিয়োগে গড়ে ১০ থেকে ১৫ লাখ এবং জুনিয়র ট্রাফিক সহকারী নিয়োগে গড়ে ৫ লাখ
টাকার ঘুষ বাণিজ্যের গুঞ্জন আছে। নির্দিষ্ট প্রার্থীদের নিয়োগ দেয়ার জন্য
বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে মন্ত্রীর প্যাডে নামের তালিকা পাঠানোর অভিযোগও আছে।
বিমানের বিদেশী এমডি, দুই পরিচালক এবং কোম্পানি সচিব নিয়োগে প্রশ্নবিদ্ধ
হয়েছে সংশ্লিষ্ট কমিটির কর্মকাণ্ড।
এছাড়া খণ্ডকালীন (ক্যাজুয়েল) নিয়োগ দিয়ে দুই বছর ধরে কাজ করানো হচ্ছে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীর বয়সসীমা, ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা, কোটাভিত্তিক পদের বিষয় উল্লেখ করা হয়নি। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়। দু’শ কেবিন ক্রু এবং ১৫০ জন জুনিয়র ট্রাফিক সহকারী নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় জুনিয়র ট্রাফিক সহকারী পদে ৬৬ জনকে নিয়োগে অনুমোদন দেয়। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে অনিয়মগুলোর বৈধতা আদায়ের কাজে সহায়তা করেছেন বিমানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়ের একটি সিন্ডিকেট। এসব অনিয়মের কারণে কেবিন ক্রু পদে বঞ্চিতরা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। জুনিয়র ট্রাফিক সহকারীরা উকিল নোটিশ দিয়েছেন বিমান কর্তৃপক্ষকে।
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, বিমানের সব নিয়োগ বিমান ম্যানেজমেন্ট করে থাকে। এখানে মন্ত্রণালয়ের কোনো হস্তক্ষেপ নেই। কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির খবরও তিনি শোনেননি। মামলার খবরও জানেন না। নিয়োগ চলাকালীন মন্ত্রণালয় থেকে আপনার (মন্ত্রীর) প্যাড ব্যবহার করে বিমানের কাছে লিস্ট পাঠানোর অভিযোগ আছে। এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিয়োগ নিয়ে আমি কোনো লিস্ট বিমান ম্যানেজমেন্টকে কখনোই দেইনি। বিমান চেয়ারম্যানকেও এ সংক্রান্ত কোনো ডিও (আধা সরকারিপত্র) দেইনি।
বিমান সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের তদবিরে কেবিন ক্রু পদে ২শ’র মধ্যে কমপক্ষে ৫০ জন প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিয়োগ পাওয়া প্রার্থীদের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিমান মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত কমিটি বিমানের বিদেশী এমডি, দুই পরিচালক এবং কোম্পানি সচিব নিয়োগ দেয়। এই নিয়োগও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
কেবিন ক্রু নিয়োগ নিয়ে হাইকোর্টে মামলা করেছে নিয়োগবঞ্চিত একাধিক প্রার্থী। মামলায় বলা হয়েছে, যথাযথভাবে সরকারের নিয়োগবিধি মানা হয়নি। প্রথম নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীর বয়স উল্লেখ করা হয়নি। উল্লেখ করা হয়নি শিক্ষাগত যোগ্যতা। মানা হয়নি পোষ্য কোটা, মুক্তিযোদ্ধা ও ট্রাইবাল কোটা। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ২০১৪ সালের হজ ফ্লাইট পরিচালনার জন্য সাময়িকভাবে ক্যাজুয়াল ভিত্তিতে কিছু জনবল নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগকৃত ওইসব জনবল এখনও বিমানে কর্মরত আছেন। খণ্ডকালীন নিয়োগপ্রাপ্তদের চাকরির মেয়াদ তিন মাস পরপর নবায়ন করে তাদের দিয়ে কাজ চালিয়ে নেয়া হচ্ছে। এ মামলায় কেবিন ক্রু সংক্রান্ত এ মামলায় আসামি করা হয়েছে সম্প্রতি অবসরে যাওয়া বিমানের ভারপ্রাপ্ত এমডি মোসাদ্দিক আহম্মেদ, পরিচালক প্রশাসন, পরিচালক কাস্টমার সার্ভিস, জেনারেল ম্যানেজার কাস্টমার সার্ভিস, চিফ মেডিকেল অফিসারসহ ১০ জনকে। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন আছে বলে বিমানের লিগ্যাল শাখার একজন কর্মকর্তা জানান। এ ছাড়া জুনিয়র ট্রাফিক সহকারী নিয়োগের ঘটনায় বিমানকে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছে নিয়োগবঞ্চিত গোলাম মোস্তফা নামে এক প্রার্থী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কেবিন ক্রু জানান, ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে তারা চাকরি নিয়েছেন। বিমানের একজন পরিচালকের নেতৃত্বে বলাকাসংলগ্ন একটি তারকা হোটেলের রুমে কেবিন ক্রুদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। এতে সহায়তা করেছেন পলাশ ও তার স্ত্রী নুরজাহান নামের প্রভাবশালী দম্পতি। ওই সাক্ষাৎকারটি ছিল মূলত কে কত বেশি ঘুষ দিতে পারবে তা নিয়ে। সে অনুযায়ী পরে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হতো ওই পরিচালকের কক্ষে। কাজেই নথিপত্রে তাদের খণ্ডকালীন চাকরি দেয়া হলেও সহজে বাদ দিতে পারবে না বলে তারা (নিয়োগপ্রাপ্তরা) মনে করেন।
সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে জুনিয়র ট্রাফিক সহকারী পদে নিয়োগের জন্য ১৫০ পদের বিপরীতে ২৫ হাজার আবেদন জমা হয়। এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষায় ৪৮৮ জন উত্তীর্ণ হয়। এ থেকে মৌখিক পরীক্ষায় ২১১ জনকে পাস করানো হয়। বিমান কর্তৃপক্ষ নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আনার পর বিমান মন্ত্রণালয় ৬৬টি পদ অনুমোদন দেয়। এ সুযোগে বিমান ও মন্ত্রণালয়ের ওই সিন্ডিকেট পরবর্তী সময়ে ২১১ জন প্রার্থীর মধ্য থেকে সিরিয়াল ভেঙে প্রথম দফায় ৬৬ জনকে নিয়োগ দেয়ার জন্য চিঠি দেয়। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী সিন্ডিকেটকে সন্তুষ্ট করতে না পারায় সবাইকে যোগদান করতে দেয়নি সিন্ডিকেট। নানা টালবাহানায় মাত্র ২৬ জনকে চাকরিতে যোগদানের সুযোগ করে দেয়া হয়। কোটা পূর্ণ না হওয়ায় এবং ট্রাফিক বিভাগে প্রকট জনবল সংকটের কারণে পরে আবারও নিয়ম ভেঙে আরও ৩০ জনকে ডাকা হয়। কিন্তু সেখান থেকেও মাত্র ১৫ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। জানা গেছে, দু’দফায় মাত্র ৪১ জন যোগদান করে। এখনও বাকি আছে ২৫ জন। নিয়মানুযায়ী ২১১ জনের ভেতর থেকে এই ২৫ জনকে নিয়োগ দেয়ার কথা। কিন্তু তা মানা হচ্ছে না। ২৫টি পদে নিয়োগের জন্য নতুন করে বিজ্ঞপ্তি দেয়ার পাঁয়তারা চলছে।
ওই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একাধিক প্রার্থী জানান, তারা এখনও আশায় আছেন যে কোনো সময় বিমান তাদের ডাকতে পারে। নিয়োগ পাওয়ার আশায় এখনও দিন গুনছেন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ১২৭ নম্বর সিরিয়ালের প্রার্থী গোলাম মোস্তফা। গত বুধবার যুগান্তর কার্যালয়ে এসে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন গোলাম মোস্তফা। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী এখনও ২৫ জন প্রার্থী নিয়োগ পেতে পারেন। তিনি বলেন, বিমান পরিচালনা পেশায় তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে। তিনি একজন উচ্চ শিক্ষিত যুবক। দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউনাইটেড এয়ারে চাকরি করেছেন। বিমানের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেয়ায় ইউনাইটেড থেকেও তার চাকরি চলে গেছে। ইতিমধ্যে তার সরকারি চাকরির বয়স চলে গেছে। এ অবস্থায় যদি বিমানের চাকরিটি না হয় তবে আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না।
বিমানের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক উইং কমান্ডার (অব.) এম আসাদুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, এসব নিয়োগ চলাকালীন তিনি এমডির দায়িত্বে ছিলেন না। তবে শুনেছেন কেবিন ক্রু নিয়োগ নিয়ে বঞ্চিতরা মামলা দায়ের করেছেন। এ ছাড়া জুনিয়র ট্রাফিক সহকারী নিয়োগের বিষয়ে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেহেতু মামলা হয়েছে তাই দুর্নীতি হয়েছে কিনা সেটা আদালতের বিচারাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, সব ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিমান জিরো টলারেন্স দেখাবে। দুর্নীতিবাজদের যেমন ছাড় দেয়া হবে না। কোনো দুর্নীতিকেও প্রশ্রয় দেবে না বিমান।
এদিকে পরপর দু’দফায় বিমানে বিদেশী এমডি নিয়োগ নিয়েও বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে বিমানে। ২০ লাখ টাকার বেশি বেতন দিয়ে পরপর দু’দফায় দু’জন ব্রিটিশ নাগরিককে বিমানের এমডি নিয়োগ দেয়া হলেও তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দুই এমডিই এক বছরের মাথায় বিমান থেকে বিদায় নিয়েছেন। প্রথম দফায় নিয়োগকৃত কেবিন জন স্টিল কিছুটা ভালো করলেও দ্বিতীয় দফায় নিয়োগকৃত কাইল হেউডের নিয়োগ নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। এই নিয়োগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন বিমান মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা। মূলত তার নেতৃত্বেই দ্বিতীয় দফায় নিয়োগ দেয়া হয়েছিল একজন অদক্ষ এমডিকে। কাইল হেউডের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কিন্তু এসব না দেখেই কাইলকে নিয়োগ দেয়া হয় ২২ লাখ টাকা বেতনে। যা বিমানের ইতিহাসে নজিরবিহীন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কাইলের নিয়োগ নিয়ে অনুসন্ধান করলেই বড় ধরনের নিয়োগ বাণিজ্যের তথ্য বেরিয়ে আসবে।
ট্রাফিক হেলপার ও কেবিন ক্রু নিয়োগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিমানের সাবেক পরিচালক (প্রশাসন) রাজপতি সরকার যুগান্তরকে জানান, তার আমলে নিয়োগ নিয়ে কোনো দুর্নীতি হয়নি। তবে তিনি শুনেছেন, বলাকাসংলগ্ন একটি হোটেলে সোনা চোরাচালান মামলার গডফাদার পলাশ কেবিন ক্রু পরীক্ষায় অংশ নেয়া পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে নিয়োগ পাইয়ে দেয়ার আশ্বাস দিত। এই খবর শুনে তিনি অনুসন্ধান করে বেশ কিছু প্রার্থীর নাম জানতে পারেন। পরে তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দিয়ে দেন। অপরদিকে জুনিয়র ট্রাফিক সহকারী নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সে সময় ৬৬ জনকে নিয়োগ দেয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ ছিল। কিন্তু আগ্রহী প্রার্থী না পাওয়ায় দু’দফায় ৪১ জনকে নিয়োগ দেন তারা। এসব নিয়োগে কোনো দুর্নীতি হয়নি বলেও জানান সাবেক এ পরিচালক (প্রশাসন)। এ প্রসঙ্গে বিমানের লিগ্যাল শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, এখনও ওই প্যানেল থেকে নিয়োগ দেয়া সম্ভব। যারা জুনিয়র ট্রাফিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতকার্য হয়েছিল তাদের এখন সরকারি চাকরির বয়স চলে গেলেও নিয়োগ পেতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
এছাড়া খণ্ডকালীন (ক্যাজুয়েল) নিয়োগ দিয়ে দুই বছর ধরে কাজ করানো হচ্ছে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীর বয়সসীমা, ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা, কোটাভিত্তিক পদের বিষয় উল্লেখ করা হয়নি। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়। দু’শ কেবিন ক্রু এবং ১৫০ জন জুনিয়র ট্রাফিক সহকারী নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় জুনিয়র ট্রাফিক সহকারী পদে ৬৬ জনকে নিয়োগে অনুমোদন দেয়। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে অনিয়মগুলোর বৈধতা আদায়ের কাজে সহায়তা করেছেন বিমানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়ের একটি সিন্ডিকেট। এসব অনিয়মের কারণে কেবিন ক্রু পদে বঞ্চিতরা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। জুনিয়র ট্রাফিক সহকারীরা উকিল নোটিশ দিয়েছেন বিমান কর্তৃপক্ষকে।
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, বিমানের সব নিয়োগ বিমান ম্যানেজমেন্ট করে থাকে। এখানে মন্ত্রণালয়ের কোনো হস্তক্ষেপ নেই। কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির খবরও তিনি শোনেননি। মামলার খবরও জানেন না। নিয়োগ চলাকালীন মন্ত্রণালয় থেকে আপনার (মন্ত্রীর) প্যাড ব্যবহার করে বিমানের কাছে লিস্ট পাঠানোর অভিযোগ আছে। এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিয়োগ নিয়ে আমি কোনো লিস্ট বিমান ম্যানেজমেন্টকে কখনোই দেইনি। বিমান চেয়ারম্যানকেও এ সংক্রান্ত কোনো ডিও (আধা সরকারিপত্র) দেইনি।
বিমান সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের তদবিরে কেবিন ক্রু পদে ২শ’র মধ্যে কমপক্ষে ৫০ জন প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিয়োগ পাওয়া প্রার্থীদের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিমান মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত কমিটি বিমানের বিদেশী এমডি, দুই পরিচালক এবং কোম্পানি সচিব নিয়োগ দেয়। এই নিয়োগও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
কেবিন ক্রু নিয়োগ নিয়ে হাইকোর্টে মামলা করেছে নিয়োগবঞ্চিত একাধিক প্রার্থী। মামলায় বলা হয়েছে, যথাযথভাবে সরকারের নিয়োগবিধি মানা হয়নি। প্রথম নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীর বয়স উল্লেখ করা হয়নি। উল্লেখ করা হয়নি শিক্ষাগত যোগ্যতা। মানা হয়নি পোষ্য কোটা, মুক্তিযোদ্ধা ও ট্রাইবাল কোটা। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ২০১৪ সালের হজ ফ্লাইট পরিচালনার জন্য সাময়িকভাবে ক্যাজুয়াল ভিত্তিতে কিছু জনবল নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগকৃত ওইসব জনবল এখনও বিমানে কর্মরত আছেন। খণ্ডকালীন নিয়োগপ্রাপ্তদের চাকরির মেয়াদ তিন মাস পরপর নবায়ন করে তাদের দিয়ে কাজ চালিয়ে নেয়া হচ্ছে। এ মামলায় কেবিন ক্রু সংক্রান্ত এ মামলায় আসামি করা হয়েছে সম্প্রতি অবসরে যাওয়া বিমানের ভারপ্রাপ্ত এমডি মোসাদ্দিক আহম্মেদ, পরিচালক প্রশাসন, পরিচালক কাস্টমার সার্ভিস, জেনারেল ম্যানেজার কাস্টমার সার্ভিস, চিফ মেডিকেল অফিসারসহ ১০ জনকে। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন আছে বলে বিমানের লিগ্যাল শাখার একজন কর্মকর্তা জানান। এ ছাড়া জুনিয়র ট্রাফিক সহকারী নিয়োগের ঘটনায় বিমানকে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছে নিয়োগবঞ্চিত গোলাম মোস্তফা নামে এক প্রার্থী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কেবিন ক্রু জানান, ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে তারা চাকরি নিয়েছেন। বিমানের একজন পরিচালকের নেতৃত্বে বলাকাসংলগ্ন একটি তারকা হোটেলের রুমে কেবিন ক্রুদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। এতে সহায়তা করেছেন পলাশ ও তার স্ত্রী নুরজাহান নামের প্রভাবশালী দম্পতি। ওই সাক্ষাৎকারটি ছিল মূলত কে কত বেশি ঘুষ দিতে পারবে তা নিয়ে। সে অনুযায়ী পরে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হতো ওই পরিচালকের কক্ষে। কাজেই নথিপত্রে তাদের খণ্ডকালীন চাকরি দেয়া হলেও সহজে বাদ দিতে পারবে না বলে তারা (নিয়োগপ্রাপ্তরা) মনে করেন।
সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে জুনিয়র ট্রাফিক সহকারী পদে নিয়োগের জন্য ১৫০ পদের বিপরীতে ২৫ হাজার আবেদন জমা হয়। এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষায় ৪৮৮ জন উত্তীর্ণ হয়। এ থেকে মৌখিক পরীক্ষায় ২১১ জনকে পাস করানো হয়। বিমান কর্তৃপক্ষ নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আনার পর বিমান মন্ত্রণালয় ৬৬টি পদ অনুমোদন দেয়। এ সুযোগে বিমান ও মন্ত্রণালয়ের ওই সিন্ডিকেট পরবর্তী সময়ে ২১১ জন প্রার্থীর মধ্য থেকে সিরিয়াল ভেঙে প্রথম দফায় ৬৬ জনকে নিয়োগ দেয়ার জন্য চিঠি দেয়। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী সিন্ডিকেটকে সন্তুষ্ট করতে না পারায় সবাইকে যোগদান করতে দেয়নি সিন্ডিকেট। নানা টালবাহানায় মাত্র ২৬ জনকে চাকরিতে যোগদানের সুযোগ করে দেয়া হয়। কোটা পূর্ণ না হওয়ায় এবং ট্রাফিক বিভাগে প্রকট জনবল সংকটের কারণে পরে আবারও নিয়ম ভেঙে আরও ৩০ জনকে ডাকা হয়। কিন্তু সেখান থেকেও মাত্র ১৫ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। জানা গেছে, দু’দফায় মাত্র ৪১ জন যোগদান করে। এখনও বাকি আছে ২৫ জন। নিয়মানুযায়ী ২১১ জনের ভেতর থেকে এই ২৫ জনকে নিয়োগ দেয়ার কথা। কিন্তু তা মানা হচ্ছে না। ২৫টি পদে নিয়োগের জন্য নতুন করে বিজ্ঞপ্তি দেয়ার পাঁয়তারা চলছে।
ওই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একাধিক প্রার্থী জানান, তারা এখনও আশায় আছেন যে কোনো সময় বিমান তাদের ডাকতে পারে। নিয়োগ পাওয়ার আশায় এখনও দিন গুনছেন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ১২৭ নম্বর সিরিয়ালের প্রার্থী গোলাম মোস্তফা। গত বুধবার যুগান্তর কার্যালয়ে এসে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন গোলাম মোস্তফা। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী এখনও ২৫ জন প্রার্থী নিয়োগ পেতে পারেন। তিনি বলেন, বিমান পরিচালনা পেশায় তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে। তিনি একজন উচ্চ শিক্ষিত যুবক। দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউনাইটেড এয়ারে চাকরি করেছেন। বিমানের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেয়ায় ইউনাইটেড থেকেও তার চাকরি চলে গেছে। ইতিমধ্যে তার সরকারি চাকরির বয়স চলে গেছে। এ অবস্থায় যদি বিমানের চাকরিটি না হয় তবে আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না।
বিমানের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক উইং কমান্ডার (অব.) এম আসাদুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, এসব নিয়োগ চলাকালীন তিনি এমডির দায়িত্বে ছিলেন না। তবে শুনেছেন কেবিন ক্রু নিয়োগ নিয়ে বঞ্চিতরা মামলা দায়ের করেছেন। এ ছাড়া জুনিয়র ট্রাফিক সহকারী নিয়োগের বিষয়ে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেহেতু মামলা হয়েছে তাই দুর্নীতি হয়েছে কিনা সেটা আদালতের বিচারাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, সব ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিমান জিরো টলারেন্স দেখাবে। দুর্নীতিবাজদের যেমন ছাড় দেয়া হবে না। কোনো দুর্নীতিকেও প্রশ্রয় দেবে না বিমান।
এদিকে পরপর দু’দফায় বিমানে বিদেশী এমডি নিয়োগ নিয়েও বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে বিমানে। ২০ লাখ টাকার বেশি বেতন দিয়ে পরপর দু’দফায় দু’জন ব্রিটিশ নাগরিককে বিমানের এমডি নিয়োগ দেয়া হলেও তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দুই এমডিই এক বছরের মাথায় বিমান থেকে বিদায় নিয়েছেন। প্রথম দফায় নিয়োগকৃত কেবিন জন স্টিল কিছুটা ভালো করলেও দ্বিতীয় দফায় নিয়োগকৃত কাইল হেউডের নিয়োগ নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। এই নিয়োগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন বিমান মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা। মূলত তার নেতৃত্বেই দ্বিতীয় দফায় নিয়োগ দেয়া হয়েছিল একজন অদক্ষ এমডিকে। কাইল হেউডের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কিন্তু এসব না দেখেই কাইলকে নিয়োগ দেয়া হয় ২২ লাখ টাকা বেতনে। যা বিমানের ইতিহাসে নজিরবিহীন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কাইলের নিয়োগ নিয়ে অনুসন্ধান করলেই বড় ধরনের নিয়োগ বাণিজ্যের তথ্য বেরিয়ে আসবে।
ট্রাফিক হেলপার ও কেবিন ক্রু নিয়োগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিমানের সাবেক পরিচালক (প্রশাসন) রাজপতি সরকার যুগান্তরকে জানান, তার আমলে নিয়োগ নিয়ে কোনো দুর্নীতি হয়নি। তবে তিনি শুনেছেন, বলাকাসংলগ্ন একটি হোটেলে সোনা চোরাচালান মামলার গডফাদার পলাশ কেবিন ক্রু পরীক্ষায় অংশ নেয়া পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে নিয়োগ পাইয়ে দেয়ার আশ্বাস দিত। এই খবর শুনে তিনি অনুসন্ধান করে বেশ কিছু প্রার্থীর নাম জানতে পারেন। পরে তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দিয়ে দেন। অপরদিকে জুনিয়র ট্রাফিক সহকারী নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সে সময় ৬৬ জনকে নিয়োগ দেয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ ছিল। কিন্তু আগ্রহী প্রার্থী না পাওয়ায় দু’দফায় ৪১ জনকে নিয়োগ দেন তারা। এসব নিয়োগে কোনো দুর্নীতি হয়নি বলেও জানান সাবেক এ পরিচালক (প্রশাসন)। এ প্রসঙ্গে বিমানের লিগ্যাল শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, এখনও ওই প্যানেল থেকে নিয়োগ দেয়া সম্ভব। যারা জুনিয়র ট্রাফিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতকার্য হয়েছিল তাদের এখন সরকারি চাকরির বয়স চলে গেলেও নিয়োগ পেতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

No comments:
Post a Comment