Sunday, February 14, 2016

সিলেটে অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট জিম্মি রোগী ও লাশ

‘মা মারা গেছেন অনেক আগে। বাড়িতে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু গাড়ি নেই। লাশ বাড়ি নিয়ে যেতে পারছি না। আর ওরা বাইরে থেকে গাড়ি আসতেও দিচ্ছে না।’- গতকাল দুপুরে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মায়ের লাশের পাশে বসে এ কথা জানান সুনামগঞ্জের মাসুক পারভেজ। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তার মা। এরপর লাশ ওয়ার্ড থেকে জরুরি বিভাগের সামনে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু কোনো অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় এভাবেই লাশ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে তাকে। মাসুকই নয়, এভাবে গতকাল লাশ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন অনেকেই। শুধু লাশ নয় গুরুতর রোগীর বেলায়ও ঘটেছে এমনটি। ট্রলিতে স্যালাইন নিয়ে বসে আছেন অনেক রোগী। বাইরের খোলা জায়গায় রোগীরা ট্রলিতে বসে আছেন। এমন চিত্র দেখে হতবাক হয়েছেন অনেকেই। মাঝে মাঝে রোগীর স্বজনরা ক্ষোভ দেখালেও পরিবহন শ্রমিকদের শক্ত অবস্থানের কারণে অসহায় ছিল প্রশাসন। অ্যাম্বুলেন্স পরিবহন শ্রমিকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছিলেন লাশ, রোগী এমনকি স্বজনরাও। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ওই হাসপাতালের রোগী ও লাশ নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সচালকদের বাণিজ্যের অন্ত ছিল না। হাসপাতাল এলাকা অন্তত ২০টি কোম্পানির শতাধিক অ্যাম্বুলেন্স দখলে রেখেছিল। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে গোটা চত্বরই দখলে ছিল অ্যাম্বুলেন্সের। কখনো কখনো রোগী ও লাশ নিয়ে জরুরি বিভাগের সামনে টানাটানি শুরু হয়। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কয়েক দিন আগে হাসপাতালের অভ্যন্তরে সব ধরনের প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স পার্কিং নিষিদ্ধ করে দেয়। এরপর থেকে হাসপাতাল চত্বরে কোনো অ্যাম্বুলেন্স ছিল না। এদিকে, হাসপাতাল এলাকা থেকে বিতারিত হওয়ার পর অ্যাম্বুলেন্সচালকরা আশ্রয় নেন মেডিকেল রোডে। সেখানেও পুলিশ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যানজট কমাতে পুলিশ তাদেরও সড়ক থেকে তাড়িয়ে দেয়। এ অবস্থায় বেকায়দায় পড়েন অ্যাম্বুলেন্সচালকরা। তারা গতকাল সকাল থেকে হাসপাতাল এলাকায় অবস্থান নিয়ে ধর্মঘট শুরু করেন। তাদের অবস্থানের কারণে বাইরে থেকে কোনো যানবাহন ভেতরে ঢুকতে পারছিল না। রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, হাসপাতাল ফটকে জরুরি রোগী নিয়ে এসে গাড়ি ঢোকাতে পারেননি অনেকেই। ফলে বাধ্য হয়েই তারা রোগী নিয়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চলে যান। আর ভেতরে যারা ছিলেন তারা জিম্মি হয়ে পড়েন। হাসপাতালের টলিতে লাশ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন সুনামগঞ্জের অনুকূল রায়। অনুকূল রায় জানান, ‘ভোরে আমার মা মারা গেছেন। মায়ের লাশ বাড়ি নেয়ার জন্য কোনো মাইক্রোবাস পাচ্ছি না। মাইক্রোবাস ধর্মঘট থাকায় লাশ নিয়ে বিপাকে পড়েছি।’ তিনি ব্যক্তি উদ্যোগে যানবাহন নিয়ে এলেও সেটি ভেতরে ঢুকতে দেয়া হয়নি। এদিকে, গতকাল দুপুরে ধর্মঘটের সমর্থনে হাসপাতাল এলাকায় সমাবেশ করেছেন মেডিকেল অ্যাম্বুলেন্স শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা। এ সময় তারা অভিযোগ করেন, পুলিশ তাদের যানবাহন সড়কে রাখতে দিচ্ছে না। এখন যানবাহনগুলো নিজ নিজ কোম্পানিতে রাখা হয়েছে। আর দূরবর্তী স্থানে অ্যাম্বুলেন্স রাখার কারণে রোগীরা সেবা পান না। তারা অভিযোগ করেন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরকারি ৬টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। কিন্তু ওইসব অ্যাম্বুলেন্স রোগীদের ব্যবহার করতে দেয়া হয় না। এর ফলে রোগীদের প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্সের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। সমাবেশ শেষে মাইক্রোবাস (অ্যাম্বুলেন্স) শ্রমিক ইউনিয়ন মেডিকেল কলেজ শাখার সভাপতি আকমল হোসেন লুকু জানিয়েছেন, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মেডিকেলের ভেতর থেকে মাইক্রোবাস (অ্যাম্বুলেন্স) পার্কিং বাতিল করে। এতে লাশ বহনকারী কোন মাইক্রোবাস (অ্যাম্বুলেন্স) মেডিকেলের ভেতর পার্কিং করতে পারছে না। বাইরে রাখলে পুলিশ বাধা দেয়। এ কারণে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট কর্মসূচি পালন করছেন। তিনি বলেন, মেডিকেল কলেজে মাইক্রোবাস (অ্যাম্বুলেন্স) পার্কিং করে না দেয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চলবে। এদিকে, রোগীদের স্বজনদের অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখার ঘটনায় দুপুরে মেডিকেল এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। এ সময় সেখানে ছুটে যান কোতোয়ালি থানার ওসি সোহেল আহমদ। তিনি ধর্মঘটী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানান, ‘আপনারা গাড়ি চালাবেন কি না সেটি আপনাদের বিষয়। কিন্তু লাশবাহী ও রোগীবাহী গাড়িতে বাধা দেয়া বেআইনি।’ সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইব্রাহিম খলিল জানিয়েছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যে আদেশ দিয়েছে সেটি তারা পালন করবেন। এর ব্যত্যয় ঘটবে না। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সচালকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন রোগীরা। তারা হাসপাতালের অভ্যন্তরে থাকা রোগীদের যাতায়াতে বাধা দিতে পারেন না।

No comments:

Post a Comment