Wednesday, February 10, 2016

অবসরের দেড় বছর পর রায় পরিবর্তন ফৌজদারি অপরাধ

সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী বলেছেন, আমি মনে করি না যে অবসরের পর রায় লেখা বেআইনি। তবে অবসরের পর রায় বা আদেশ পরিবর্তন করা যাবে না। দেড় বছর পরে কেউ যদি রাতের অন্ধকারে রায় বা আদেশের অংশবিশেষ পরিবর্তন করে লেখেন তবে তা হবে ফৌজদারি অপরাধ। আদেশের অংশ পরিবর্তন করতে হলে রিভিউ করতে হবে। এ কারণেই হয়ত প্রধান বিচারপতি বলেছেন ,অবসরের পর রায় লেখা বেআইনি। অবসরের পর রায় লেখা যাবে কি যাবে না সে বিষয়ে একটা রুল (বিধান) থাকা দরকার। আশা করি প্রধান বিচারপতি এটা করে দেবেন।
গতকাল সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিরাজমান পরিস্থিতি’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। প্রসঙ্গত অবসরের ১৬ মাস পর ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায়ে পরিবর্তন আনেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক।
গতকালের আলোচনায় মাহমুদুল আমিন চৌধুরী আরও বলেন, বিচার বিভাগ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। এই বিচারবিভাগ খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। এটি ধ্বংস হয়ে যাক আমরা তা চাই না। তবে বিচার বিভাগ সম্পর্কে যখন ভাল কিছু শুনি তখন মনটা ভরে যায়। তিনি বলেন, অটোক্রেটিক সরকার থাকলে তার কথামত চলতে হয়। তার কথামত আইন হয়। সবকিছু হয় তার সুবিধামত। আর গণতান্ত্রিক সরকারে তা নয়। জনগণের সুবিধার জন্য আইন হয়। সবকিছু হয়। সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত নাগরিকত্ব আইনের বিষয়ে তিনি বলেন, এমন আইনের খসড়া সংসদে পাশের অপেক্ষায় রয়েছে। এবিষয়ে পত্রিকায় যে সংবাদ দেখেছি তা খুবই বিপদজনক। এই আইন হলে যে কোন নাগরিকের নাগরিকত্ব কেড়ে নিতে পারবে সরকার। এ আইনে আছে একজন ব্যক্তি রাজাকার প্রমানিত হলে তার সম্পদ তার সন্তানেরা পাবে না। বাবার শাস্তি কি ছেলে ভোগ করবে? এটা হয় কি করে? ফৌজদারি আইনে তো একজনের শাস্তি আরেকজন ভোগ করতে পারে না। গণতান্ত্রিক সরকারে এসব থাকার কথা নয়। জনগণের জন্য আইন হওয়ার কথা। এ বিষয়ে আমাদের দেখা উচিত আমরা কোথায় যাচ্ছি? প্রকাশ্য আদালতে রায় ঘোষণা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রকাশ্য আদালতে রায় দিতে হবে। কেউ কেউ দেননা। হয়ত তিনি রায় লিখতে পারেননা বলেই দেননা। এখন নাকি রুল দেওয়া নিয়ে সিনিয়র জুনিয়র মারামারি হয়। বিতর্ক হয়। সিনিয়র এজলাস থেকে নেমে যান। এটা খুবই দুঃখজনক। লজ্জাকর। এজন্য দায়ী আইনজীবীরা। কারণ আইনজীবীদের দায়িত্ব আদালতকে সহযোগিতা করা। আইনজীবীদের দায়িত্ব নয় কারও শাস্তির ব্যবস্থা করা, কাউকে খালাস করিয়ে দেওয়া। রাষ্ট্র বা আসামিপক্ষের আইনজীবীর দায়িত্ব ন্যায়বিচার প্রতিষ্টার জন্য আদালতকে সহায়তা করা।
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক প্রসঙ্গে সাবেক এই প্রধান বিচারপতি বলেন, তিনি এখন প্রেসকনফারেন্স করেন। এ বিষয়ে সংসদেও আলোচনা হয়। অথচ এই সংসদেই একজন নেতা তাকে বলেছিলেন স্যাডিস্ট। তাহলে একজন স্যাডিস্টকে আপিল বিভাগে নেওয়া হলে কিভাবে? এখন তো প্রমাণিত হলো আসলেই তিনি স্যাডিস্ট। জুডিশিয়ারি বাঁচাতে হলে অনেক কিছু দেখতে হবে।
বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী আরও বলেন, এখন তো শুনি একেকজনের কাছে এক দেড়শো মামলা রয়েছে রায় লেখার অপেক্ষায়। এটা দুঃখজনক। একেকজনের কাছে এই বিপুল পরিমাণ রায় লেখার অপেক্ষায় থাকার কারণে বিচার বিভাগ ও সুপ্রিমকোর্টের সর্বনাশ হয়েছে। এ রায় লেখা পড়ে থাকার জন্য দোষ আইনজীবীদের। আইনজীবীদের ঐক্যবদ্ধভাবে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। বিচার বিভাগকে বাঁচাতে হবে। কিন্তু আইনজীবীরা তা করছেন না। আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, আপনারা রাজনীতি করবেন কিন্তু তা আদালতের বাইরে। আদালত অঙ্গণে আপনাদের পরিচয় আপনারা আইনজীবী। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আপনারা কাজ করবেন। জুডিশিয়ারি বাচাতে হলে আপনাদের ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করতে হবে।
বিচার বিভাগের সংস্কারে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার গৃহীত পদক্ষেপকে সমর্থন দিতে আইনজীবীদের প্রতি আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগকে সঠিক রাস্তায় নিয়ে যেতে চেষ্টা করছেন। আপনাদের উচিত তাকে সহযোগিতা করা। বিচার বিভাগ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আপনারা বিচার বিভাগকে বাঁচান। দেশ রক্ষা করুন। দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করুন।
হাইকোর্টের  অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের প্রশ্ন যখন আসবে তখন আইনজীবীদেরকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ঐক্যবদ্ধ থাকলে সবকিছুই অর্জন করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, আমি বারের সম্পাদক ছিলাম তখন বারের সদস্য ছিল আড়াই হাজার। এরপর ১৫ বছর জজিয়তি করেছি। এখন বারের সদস্য সাড়ে ৬ হাজার। এটা উৎসাহজনক। তিনি বলেন, এই সুপ্রিম কোর্টে আপনারা (আইনজীবী) আছেন, থাকবেন। আপনারাই ন্যায় বিচার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মশাল তুলে ধরবেন। আর এর জন্য শর্ত একটাই আইনজীবীদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বিচারপতি নজরুল বলেন, ১৫ বছর যখন হাইকোর্টেও বিচারক ছিলাম তখন কেউ কখনও অন্যায় অনুরোধ নিয়ে আমার সামনে আসেননি। কারণ জানেন অনুরোধ করলে উল্টো ফল হবে। বিচারক নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যে নিমগাছ থেকে ফজলি আম আশা করা বাতুলতা মাত্র। ফজলি গাছ রোপণ করেন তাহলে ফজলি আমই পাবেন। আইনজীবীদের উদ্দেশ তিনি বলেন,উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই নীতিমালা করার জন্য আপনাদের সোচ্চার হতে হবে।
ড. শাহদীন মালিক বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুদৃঢ় না আর বিরাজমান পরিস্থিতি বিব্রতকর। আইনজীবী ও বিচারকদের ব্যর্থতার কারণে জনগণ বিচারের জন্য বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে।

No comments:

Post a Comment