একুশের
চেতনা বলতে আমরা সাধারণত ভাষা আন্দোলনের চেতনাকেই বুঝি এবং সেটা যেমন
রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে ঘিরে, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার দাবি অর্জন
তেমনই একইসঙ্গে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠা যেমন- রাজবন্দিদের
মুক্তি, সর্বস্তরে বাংলা প্রতিষ্ঠা, জাতীয় জীবনের সব কাজে মাতৃভাষা বাংলার
ব্যবহার নিশ্চিত করা। একটি ভাষিক জাতি রাষ্ট্রে জাতীয় জীবনের প্রতিটি
ক্ষেত্রে মাতৃভাষার নিরঙ্কুশ ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। আমরা যদি ইউরোপের
দেশগুলোকে দেখি, তাহলে লক্ষ্য করব তারা মাতৃভাষার মাধ্যমে তাদের সব কাজ
সম্পন্ন করেছে। ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন প্রতিটি দেশই তাদের
মাতৃভাষার চর্চা ও ব্যবহার করছে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে। একুশের চেতনাও ছিল
আমাদের বাঙালি জাতির জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার ও চর্চার মধ্য
দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। একুশের চেতনাই আমাদের দেশে জাতীয়তাবাদী
চেতনার স্ফুরণ ঘটায়। ষাটের দশকে জাতীয়তাবাদী ৬ দফা প্রণীত হয়েছে, ছাত্রদের
১১ দফা, ভাসানীর ১৪ দফা সব মিলিয়ে এসব দাবির মধ্যে বাঙালি জাতির অধিকার ও
আকাঙ্ক্ষাগুলোকে তুলে ধরা হয়েছিল। এগুলো একুশের চেতনারই ধারাবাহিকতা।
এসবেরই পরিণতি ১৯৭১-এ স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন। স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের
মধ্য দিয়েই আমাদের জাতীয় আকাঙ্ক্ষা পূরণ হল অর্থাৎ আমরা আমাদের ভাষিক জাতি
রাষ্ট্রটি পেয়ে গেলাম। স্বাধীন বাংলাদেশে যে সংবিধান প্রণীত হল, সেখানে
স্পষ্টভাবে বলা হল, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা’ অর্থাৎ, জাতীয়
জীবনের সর্বস্তরে, যেমন- শিক্ষার সর্বস্তরে, উচ্চ আদালতে, সিভিল কোর্টে,
হাইকোর্টে- সর্বত্র বাংলা ব্যবহার করতে হবে কিন্তু বাস্তবে গিয়ে কী দাঁড়াল?
আমরা লোকদেখানো একটা দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বাংলা মাধ্যম চালু করলাম, করে
আরও ক্ষতি করলাম সাধারণ মানুষের, নিুবিত্ত মানুষের। দেশ ইংরেজি মাধ্যমে
শিক্ষার কিন্ডারগার্টেনে ছেয়ে গেল। দুটি আলাদা শ্রেণী তৈরি হয়ে গেল- বাংলা
মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম। ইংরেজি মাধ্যমের সুবিধা অনেক, উচ্চশিক্ষায় গিয়ে
দেখা গেল বাংলা মাধ্যমের ছেলেরা ইংরেজি মাধ্যমের ছেলেদের সঙ্গে
প্রতিযোগিতায় টেকে না। এই বিভেদটা ইচ্ছা করেই সৃষ্টি করা হল, কেননা উচিত
ছিল ইংরেজি মাধ্যমকে সীমিত করা সেটা করা হয়নি। সম্প্রতি ইংরেজি ভার্সন বলে
একটা শিক্ষাব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেখা যাচ্ছে
শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলা ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। আরেকটি সত্য হচ্ছে, জীবিকার
সঙ্গে যদি ভাষার সম্পর্ক না থাকে তাহলে সে ভাষা দাঁড়ায় না। ইংরেজি
ঔপনিবেশিক শাসকের ভাষা সেটা রাজভাষা হিসেবে বহাল রেখে দেয়ায় এটা জীবিকার
সঙ্গে থেকে গেল। বাংলা জীবিকার সঙ্গে না থাকায় শুধু মুখের কথায় এবং
সাহিত্যে ঠাঁই পেল- এভাবেই ভাষাকেন্দ্রিক বিভেদ এবং বৈষম্য স্বাধীন
বাংলাদেশে আরও ভালো করেই তৈরি হল- যা কিনা রাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গে
সাংঘর্ষিক। অর্থাৎ, আমরা আমাদের শাসকশ্রেণী, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ সবাই
প্রতিদিন আমাদের সংবিধান লংঘন করছি। তা সত্ত্বেও আমাদের কোনো বোধোদয় হচ্ছে
না। শিক্ষায়তনের সর্বত্র বাংলা অনুপস্থিত। ভবিষ্যতে দেখা যাবে এমন সময় আসবে
বাংলা শুধু আমাদের মুখের বুলিতে এবং সাহিত্যে টিকে থাকবে। ব্যাপকভাবে
আমাদের জীবনাচরণে- ব্যক্তি বলো, পরিবার বলো, সমাজ বলো সবক্ষেত্রে এটা
ক্রমাগত পরাজিত হবে, পিছিয়ে যাবে, সংকুচিত হবে। এটা তো আমাদের ভাষা
আন্দোলনের কাম্য ছিল না, এ দেশের জাতীয়তাবাদী সংগ্রামেরও এটা কাম্য ছিল না-
যদিও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত,
ব্যবসায়ী শ্রেণীর শ্রেণীস্বার্থ রক্ষা করেছিল। তারা তাদের শ্রেণীস্বার্থেই
এই শ্রেণীবৈষম্য ক্রমাগত সৃষ্টি করে চলেছে। যেখানে কর্তব্য ছিল গোটা জাতিকে
শিক্ষিত করে তোলা- সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপ্লবের পর লেনিন যেখানে মাত্র ১২
বছরে সব মানুষকে শিক্ষিত করে তুলেছিলেন, সেখানে স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও
বাংলাদেশে অর্ধেক মানুষকেও সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত করে তোলা যায়নি। কারণ
আসলে সদিচ্ছার অভাব। আমরা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী নিজেদের
শ্রেণীস্বার্থটিকেই বড় করে দেখেছি। শ্রেণীস্বার্থকে পরমজ্ঞান করছি ফলে
শ্রেণীবৈষম্য ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। একটা কথা প্রায়ই বলা হয়, অর্থনীতির নানা
সূচকে বাংলাদেশ উন্নতি করছে- হ্যাঁ উন্নতি হচ্ছে ঠিকই কিন্তু সে উন্নতির
সুফল পাচ্ছে কেবল বিত্তবানরা; সাধারণ মানুষ খুবই সামান্য, নামমাত্র পাচ্ছে।
এ রকম একটি অর্থনৈতিক বৈষম্যের বাস্তবভূমিতে বর্তমান বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে
আছে। কাজেই একুশের চেতনা এখানে ভূ-লুণ্ঠিত। একুশের চেতনা সামান্য অর্জিত
হয়েছে, বাদবাকি সিংহভাগ অনার্জিত থেকে গেছে। তাই একুশের চেতনার তাৎপর্য
বেড়েছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনারও তাৎপর্য অনিবার্য রূপে অনুভূত হচ্ছে। আমি
মনে করি, বাঙালি জাতির যে বিদ্রোহী তারুণ্য পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে প্রচণ্ড
সাহসে অধিকার আদায়ের দাবিতে বিস্ফোরিত হয়েছিল, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের
ধারাবাহিকতায় স্বাধীন দেশের অভ্যুদয়ে মুক্তিযুদ্ধে শামিল হয়েছিল সেই
তারুণ্যের জাগরণ ছাড়া এই শ্রেণীবৈষম্যে বিভক্ত সমাজ পাল্টানো যাবে না।
সাধারণ মানুষের মুক্তি অর্জিত হবে না। বর্তমানে রাজনীতির যে দুরবস্থা, বাম
রাজনীতির যে বহুধা বিভক্তি- তাদের প্রতি ভরসা করা যায় না। আমার মনে হয়, আজও
সেই দ্রোহী তারুণ্যই বাঙালির ভরসার স্থল, আশার স্থল।
অনুলিখন : শুচি সৈয়দ

No comments:
Post a Comment