Thursday, February 25, 2016

এটিএম কার্ড জালিয়াতির টাকা হুন্ডির মাধ্যমে ব্রিটেনে পাঠাতেন পিটার by শহিদুল ইসলাম রাজী

কয়েক ভাগে ভাগ হতো জালিয়াতির টাকা ; মাসে দুই লাখ টাকা বাসা ভাড়া দিতেন ওই বিদেশী প্রতারক
এটিএম কার্ড জালিয়াতির টাকার একটি ভাগ হুন্ডির মাধ্যমে ব্রিটেনে বাসরত ফরিদ নাবিরের কাছে পাঠাতেন বিদেশী প্রতারক থমাস পিটার। কয়েক ভাগে ভাগ হতো কার্ড জালিয়াতির টাকা। জালিয়াতির টাকায়ই বাংলাদেশে বসে আনন্দ-ফুর্তি করতেন পিটার। প্রথমে দেশে এসে ছয় মাস রাজধানীর একটি হোটেলে বাস করেন তিনি। এরপর ওই হোটেলের এক নারীর সাথে লিভ টুগেদারের পরে বিয়ে করে সন্তানের বাবাও হন এই প্রতারক। প্রতি মাসে তার হাত খরচ ছিল ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে মাসে দুই লাখ টাকা শুধু বাসা ভাড়াই দিতেন থমাস পিটার। আর এসব টাকাই তিনি আয় করতেন ডিজিটাল ব্যাংক জালিয়াতির মাধ্যমে। পিটারকে জিজ্ঞাসাবাদের পর এসব তথ্য জানতে পেরেছেন মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া গেছে, যারা এই জালিয়াতি চক্রের কাছে ‘পস মেশিন’ সরবরাহ করতেন।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, এটিএম কার্ড জালিয়াতির ঘটনায় আরো দুই বিদেশী ইউক্রেনের এন্ডারসন ও রোমানিয়ার রোমিও জড়িত। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর পুলিশের তৎপরতা শুরু হলে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি নিজ দেশে পালিয়ে যান রোমিও এবং পরদিন ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিয়ে যান এন্ডারসন। এ চক্রটি এর আগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও অভিন্ন উপায়ে জালিয়াতির ঘটনা ঘটিয়েছে। কার্ড জালিয়াতির মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ফরিদ নাবির, যার গ্রামের বাড়ি সিলেটের পীরমহল্লায়।
তিনি বলেন, এত দিন শুধু এটিএম কার্ডের মাধ্যমেই জালিয়াতি করেনি এই চক্র। পয়েন্ট অব সেলস (পস) মেশিনের মাধ্যমে জালিয়াতি করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে চক্রটি। পস মেশিনের মাধ্যমে ঠিক কত টাকা চুরি করেছে এই চক্র সেটি নির্ধারণ করতে কাজ চলছে। ব্যাংকের এটিএম কার্ড ব্যবহার করে এ পর্যন্ত কত টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্র তার সঠিক হিসাব এখনো বের করা সম্ভব হয়নি।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা সূত্র জানায়, ‘পস মেশিন’ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং মধ্যস্থতাকারীকে ভাগ দেয়াসহ কয়েকটি ভাগে এ জালিয়াতির টাকা ভাগবাটোয়ারা করা হতো। ওই সব ভাগের টাকা দেয়ার পর বাকি টাকা থমাস পিটার পেতেন। পিটার তার ভাগের টাকার একটি অংশ হুন্ডির মাধ্যমে ব্রিটেনে বসবাসরত ফরিদ নাবিরের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। এ ছাড়া দেশী-বিদেশী গ্রাহকদের ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের যাবতীয় গোপন তথ্য পিটারকে সরবরাহ করতেন মাকসুদ, শাহীন ও রেফাত। এর ভিত্তিতে কোন কার্ড তৈরি করত পিটার ও তার সহযোগীরা। কোনো সমস্যা মনে করলে তার অন্যতম সহযোগী এন্ডারসন ও রোমিওর সহায়তা নিতেন তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিসি (মিডিয়া) মারুফ হোসেন সরদার বলেন, এটিএম কার্ড জালিয়াতি নিয়ে তদন্ত চলছে। গ্রেফতারকৃত বিদেশী নাগরিকসহ চারজন রিমান্ডে রয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসছে। যাদের নাম আসছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছুই বলা যাচ্ছে না।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, পিওটর এক বছরের বিজনেস ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। ইউরোপে শ্রম রফতানি করার কথা থাকলেও তিনি জড়িয়ে পড়েন এটিএম কার্ড জালিয়াতিতে। বাংলাদেশী মেয়েকে বিয়ে করে সংসার পাতেন গুলশান এলাকায়। এই দম্পতির একটি সন্তানও রয়েছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি শাজাহান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, গ্রেফতারকৃত বিদেশী নাগরিকসহ অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ওঠে আসছে।
গত ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড ও সিটি ব্যাংকের গ্রাহকদের অর্থ লোপাটের ঘটনা ঘটে। এটিএম বুথে স্ক্যামিং ডিভাইস বসিয়ে এই তিনটি ব্যাংকের ৩৬ জন গ্রাহকের প্রায় ২০ লাখ ৬০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। এ ঘটনায় গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ইউসিবি কর্তৃপ বনানী থানায় মামলা করে। এরপর এজাহারের সাথে সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজও জমা দেয়া হয়। এ ছাড়া সিটি ব্যাংক কর্তৃপও পল্লবী থানায় একটি মামলা করে। বিষয়টির তদন্তে মাঠে নামে গোয়েন্দারা। পরে গত ২১ ফেব্রুয়ারি রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশান এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিদেশী নাগরিক পিওটর সিজোফেন মাজুরেক ওরফে থমাস পিটারসহ চারজনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেফতারকৃত অন্যরা হলেনÑ সিটি ব্যাংকের কার্ড ডিভিশনের তিন কর্মকর্তা মকসেদ আল মাকসুদ, রেজাউল করিম শাহিন ও রেফাজ আহমেদ রনি। সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাদের গ্রেফতার করে গোয়েন্দারা। চারজনের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি সোমবার ঢাকার আদালতে পাঠায় পুলিশ। মহানগর হাকিম মাজহারুল ইসলাম শুনানি শেষে ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

No comments:

Post a Comment