Monday, February 8, 2016

শুধু প্রত্যাহার শাস্তি হয় না by মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু

গুরুদণ্ডের অপরাধ হলেও অনেক ক্ষেত্রে শাস্তি হয় লঘুদণ্ডের * ভুক্তভোগী কেউ পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করলে তাকে অনেক সময় জীবনভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়
‘থানার গারদে রক্তাক্ত অবস্থায় স্বামীকে ফেলে রাখা হয়েছে। এমন সংবাদ পেয়ে পাগলের মতো উত্তরা পশ্চিম থানায় ছুটে যাই। সঙ্গে ছিল আমার পাঁচ বছরের মেয়ে কাজল। কিন্তু থানার সামনে আমাদের আটকে দেয়া হয়। পরিচয় জানার পর পুলিশ সাফ জানিয়ে দেয় ভেতরে যাওয়া যাবে না। এরপর আমার স্বামীকে চিকিৎসার জন্য দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর অনুরোধ করি। কিন্তু পুলিশ আমাদের কুকুর-বিড়ালের মতো তাড়িয়ে দেয়। এভাবে রাতভর থানার সামনে অপেক্ষার পর ভোরে পুলিশ জানায়, তোর স্বামী ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেছে।’ কথাগুলো বলছিলেন, গেণ্ডারিয়ার বাসিন্দা সোমা আক্তার।
ঘটনা ২০১৪ সালে ২ মার্চ। এদিন সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরা (পশ্চিম) থানার পুলিশ তার স্বামী শাহ আলম মোল্লা সাগরকে থানায় ডেকে নিয়ে যায়। তিনি একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরদিন ভোরে তার লাশ পাওয়া যায় থানা ভবনের পেছনে। বলা হয়, সে থানা থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। অথচ অভিযোগ রয়েছে, তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে মেরে ফেলে আত্মহত্যার নাটক বানাতে ছাদ থেকে ফেলে দেয়া হয়। আর ওই ঘটনার আধাঘণ্টা আগে তার বিরুদ্ধে একটি জিডিও করা হয়।
এদিকে স্বামীকে হারিয়ে একমাত্র মেয়ে কাজল আক্তারকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সোমা। জীবন বাঁচাতে গেণ্ডারিয়া এলাকায় একটি টং দোকানে চা বিক্রি করেন। স্বামী হত্যার বিচার তো দূরের কথা জীবন চালাতেই তিনি এখন হিমশিম খাচ্ছেন।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, এ ঘটনার পর একজন প্রত্যক্ষদর্শীসহ ছয়জন পুলিশের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলেও তদন্ত রিপোর্ট যায় ওসি রফিক ও জড়িত আরও দুই পুলিশ কর্মকর্তার পক্ষে। পরবর্তীকালে তাকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হলেও পরবর্তীকালে তিনি রংপুর রেঞ্জে প্রাইজপোস্টিং পান।
রোববার কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভুক্তভোগী সোমা আক্তার এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ভাই এসব লিখে কোনো লাভ নেই। ওসি রফিকের হাত অনেক লম্বা। উল্টো তার বিরুদ্ধে লিখলে আপনার জীবনও অকালে বিদায় নিতে পারে।’
আর এমন ঘটনা শুধু একটি নয়, অসংখ্য। কিছু ঘটনা ভাগ্যক্রমে প্রকাশ হয়ে পড়লে দেশজুড়ে কিছুদিন আলোচনার ঝড় তোলে। আর একটি ঘটনা এসে আগের ঘটনাকে ছাপিয়ে চলে যায়। জানা গেছে, গত এক বছরে সারা দেশে পুলিশের বিরুদ্ধে অসদাচরণসহ গুরুতর নানান অভিযোগে ১৩৮টি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। এর মধ্যে তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট দাখিল হয়েছে মাত্র ৫৭টি। তাও আবার এসব রিপোর্টের বেশির ভাগই গেছে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের পক্ষে। বাকি তদন্ত কমিটির রিপোর্টগুলো এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। ভুক্তভোগীদের মতে, প্রভাব আর টাকার জোরে এসব তদন্ত দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে। এদিকে তদন্ত দীর্ঘায়িত হওয়ায় সুষ্ঠু বিচার পাবেন না বলে তারা আশঙ্কা করছেন। কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশ ফৌজদারি মামলার অপরাধ করলেও শুধু বিভাগীয় মামলা দিয়েই ইতি টানা হয়। কোনো ঘটনায় মিডিয়ার মাধ্যমে জানাজানি হলে প্রথমে সরকার ও পুলিশের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা অভিযুক্ত পুলিশের পক্ষে অবস্থান নেন। কিন্তু পরে পরিস্থিতি বেগতিক দেখলে তখন বলা হয়, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। পরিস্থিতি সামাল দিতে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার কিংবা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে এলে সময় নিয়ে কৌশলী তদন্ত প্রতিবেদেনের মাধ্যমে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যকে রক্ষা করা হয়। এরপর যথারীতি তিনি পোস্টিং পান। এভাবেই একেকটি নির্যাতন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনার করুণ সমাপ্তি ঘটে। আর যে ঘটনা কোনোভাবেই পাশ কাটানো সম্ভব হয় না শুধু সেক্ষেত্রে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য কিংবা সদস্যদের চাকরিচ্যুতিসহ ফৌজদারি বিচারের মুখোমুখি করা হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে গুরুদণ্ডের অপরাধ হলেও দেয়া হয় লঘুদণ্ড। এছাড়া ভুক্তভোগী কেউ পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করলে তাকে পদে পদে হেনস্থা হতে হয়। বাধ্য হয়ে তাকে যেতে হয় আদালতে। আর এভাবে মামলা করে অনেক সময় বাদীকে প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়।
২০০৬ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক একটি ম্যাচ চলাকালীন সাংবাদিকদের ওপর ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটে। এ হামলায় নেতৃত্ব দেন তৎকালীন চট্টগ্রামের ডিসি (পোর্ট) আকবর আলী খান। তিনি নিজেই প্রবীণ সাংবাদিক হাজী জহিরুল ইসলামের ওপর হামলা করেন। এ ছাড়া পুলিশ সদস্যরা আকবর আলীর নির্দেশে সাংবাদিকদের বেধড়ক লাঠিপেটা করেন। এতে হাজী জহিরুল ইসলাম ছাড়াও আহত হন সাংবাদিক অনুরূপ টিটু, শামসুল হক টেংকুসহ অনেকে। এ সময় সাংবাদিকদের ক্যামেরাও ভাংচুর করেন ওই পুলিশ সদস্যরা। পরদিন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে বয়োবৃদ্ধ সাংবাদিক জহিরের ওপর ডিসি আকবর হোসেনের মুষ্টিবদ্ধ হাতসহ তার রুদ্রমূর্তির ছবি ছাপা হলে সাধারণ মানুষ পুলিশের এমন আচরণ দেখে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। চান তদন্ত সাপেক্ষে সুষ্ঠু বিচার। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমেও খবরটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ পায়। কিন্তু কার্যত দোষীরা পার পেয়ে গেছেন।
এ ঘটনা তদন্তে তৎকালীন সময়ে দুটি কমিটি গঠন করা হয়। এর একটির প্রধান ছিলেন তথ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্ম সচিব মীর মোশাররফ হোসেন। অপরটির প্রধান তৎকালীন কুমিল্লার জেলা জজ। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোতে খোঁজ নিয়ে নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিন তদন্তের পর তথ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি ঘটনার জন্য আকবর আলীকে দায়ী করে রিপোর্ট দেয়। তবে কিছুই হয়নি পুলিশ কর্মকর্তা আলী আকবরের। উপরন্তু তৎকালীন সময়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারের তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। বর্তমানে পুলিশ সদর দফতরে বহাল তবিয়তে কর্মরত আছেন সেই পুলিশ কর্মকর্তা আকবর আলী খান। এ ব্যাপারে তার মন্তব্য জানতে চাইলে রোববার টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি কোনো কথা বলবেন না। এ সময় তিনি পুলিশ সদর দফতরের মিডিয়া শাখায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইজিপি একেএম শহীদুল হক রোববার টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, এতবড় একটি বাহিনীতে কিছু সদস্য অপরাধ করতেই পারেন। তবে পুলিশ সদর দফতর এসব ঘটনায় জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছে। কোনো সদস্যের ব্যক্তিগত অপরাধের দায় পুলিশ সদর দফতর নেবে না।
সাবেক আইজিপি আবদুল কাইয়ুম বলেন, পুলিশে অতিমাত্রায় রাজনীতিকরণের কারণেই অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারলে অপরাধপ্রবণতা কমবে।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে সিকিউরিটি সেলে প্রায় পাঁচ হাজার গুরুতর অভিযোগ জমা পড়েছে। এর বাইরে নৈতিক স্খলন ও আচরণগত সমস্যার অভিযোগ জমা পড়েছে প্রায় ৩ হাজার সদস্যের বিরুদ্ধে। তবে শাস্তি হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৩৪ জনের বিরুদ্ধে। এরমধ্যে ফৌজদারি অপরাধে ৭৪ জনকে গুরুদণ্ড এবং অন্যান্য অপরাধে লঘুদণ্ড দেয়া হয় ৯৬০ জনকে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পুলিশ সদর দফতরের সিকিউরিটি সেল ছাড়াও জেলা পর্যায়ের পুলিশ সুপারের কার্যালয়েও প্রতি মাসে শত শত অভিযোগ জমা পড়ে। এসব অভিযোগ তদন্তে কমিটিও হচ্ছে অসংখ্য। তবে বেশিরভাগ তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখছে না। অনেক তদন্ত মাঝপথে এসে আটকে যাচ্ছে, কিংবা প্রভাবশালীদের তদবিরের কারণে উল্টো অপরাধী পুলিশের পক্ষেই চলে যাচ্ছে।
গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) হিসেবে কর্মরত ছিলেন জিল্লুর রহমান। কিন্তু তিনি নিজেই এক ভয়াবহ পদোন্নতি বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। কনস্টেবল থেকে এএসআই পদে পদোন্নতি দেয়ার জন্য তিনি কোটি কোটি টাকার ঘুষ উত্তোলন করেন। এজন্য একটি বিশ্বস্ত সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। তবে বিপত্তি ঘটান তার গাড়িচালক শহিদুল ইসলাম। তিনি মোটা অংকের টাকাসহ খোদ পুলিশের কাছে ধরা পড়ে যান। বিষয়টি গণমাধ্যমে ফাঁস হলে সর্বত্র হৈচৈ পড়ে যায়। পরে উপপুলিশ কমিশনার জিল্লুর রহমান চাপের মুখে ৫০ লাখ টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন। এরপর তাকে প্রত্যাহার করা হয়। গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। কিন্তু আজও কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি।
গত এক বছরে রাজশাহীতে পুলিশের প্রায় অর্ধশত সদস্যের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ গুরুতর অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে ডিবির ৬ জন সাব-ইন্সপেক্টর ও ২৩ জন কনস্টেবলের বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণ ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, অভিযুক্তদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন গোয়েন্দা পুলিশের কনস্টেবল মজনু ও বোয়ালিয়া থানার এএসআই মজনু। অথচ এসব অভিযোগের ভিত্তিতে একমাত্র ডিবির এসআই মনোয়ার হোসেনকে র‌্যাবে বদলির সুপারিশ করা হয়। কিন্তু র‌্যাব কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে পুনরায় মনোয়ারকে আরএমপিতে ফিরিয়ে আনা হয়। শাস্তির বদলে তাকে ওই সময় ভালো স্থানে (শাহমখদুম থানায়) পোস্টিং দেয়া হয়। এসআই হারুনকেও একই অভিযোগে ডিবি থেকে বদলি করা হলেও তিনি লবিং করে শাহমখদুম থানায় পোস্টিং নিতে সক্ষম হন।
সিলেটে পৈশাচিক নির্যাতনে শিশু রাজন খুনের বহুল আলোচিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যে নামে পুলিশ। খুনিদের সঙ্গে ১২ লাখ টাকায় দফারফার অভিযোগ ওঠে জালালাবাদ থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন, সাব-ইন্সপেক্টর জাকির হোসেন ও আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে। পুলিশের গঠিত তদন্ত কমিটিও প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পায়। পরে সিলেট নগরীর জালালাবাদ থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন, সাব-ইন্সপেক্টর জাকির হোসেন ও আমিনুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আদালতে বহুল আলোচিত মামলাটির রায় হওয়ার পর অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের হয়। মামলাটি এখন বিচারাধীন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়নি।

No comments:

Post a Comment